এখনো থামেনি কল্যাণপুর পোড়াবস্তির চাঁদাবাজি, অসহায় প্রশাসনও

ঢাকার কল্যাণপুর পোড়াবস্তি এলাকায় দোকান ও বসতঘর দখল, চাঁদাবাজি, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং হামলার ঘটনা নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পরও ভোগান্তি কমেনি ভুক্তভোগীদের। উল্টো ক্ষমতাসীন বিএনপির নাম ভাঙিয়ে এখনো চলছে চাঁদাবাজি ও দখলদারি। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তা চেয়েও প্রতিকার পাওয়া যায়নি।

ওই এলাকার চাঁদাবাজি-দখলদারি-হামলার অন্তত ১৫টি ঘটনার তথ্য রয়েছে দ্য ডেইলি স্টারের কাছে। যা নিয়ে গত ১১ মে সংবাদ প্রকাশ হয়। এরপর গত ১৬ মে ও ২০ মে আরও দুই দফায় লাঞ্ছিত হতে হয়েছে ভুক্তভোগীদের। তাদেরই একজন নাসিমা আজাদ।

নাসিমার অভিযোগ, কল্যাণপুর নতুন বাজার এলাকার দেশ সময় সুপার মার্কেটে তার লিজ নেওয়া ৫৪ নম্বর দোকানটি গত ২০ মাস ধরে দখল করে রেখেছেন মো. কামাল হোসেন ওরফে কমফোর্ট কামাল। ওই দোকান থেকে তিনি প্রতি মাসে পাঁচ হাজার টাকা করে পেতেন, যা এখন কমফোর্ট কামাল আদায় করছেন। দোকানে আসতে তাকে বাধা দেওয়া ও ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে।

২০২৫ সালের ২০ অক্টোবর মিরপুর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করার পর কোনো প্রতিকার না পেয়ে ২০২৬ সালের ২ ফেব্রুয়ারি নাসিমা মামলা করেন। মামলায় কমফোর্ট কামালকে এক নম্বর আসামি করেন তিনি। দ্বিতীয় ও তৃতীয় আসামি করা হয় মিরপুর থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক এসএম রুস্তম আলী ও সদস্য সচিব আওলাদ হোসেনকে।

ওই মামলার পরিপ্রেক্ষিতে মার্কেট কমিটির গঠন করা তদন্ত কমিটি কমফোর্ট কামালের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের প্রমাণ পায়। গত ১৬ মে বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে মিরপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) অবগতিতে মার্কেট কমিটির চেয়ারম্যান মো. রফিকুল ইসলাম রাফিসহ অন্যান্য পরিচালকদের উপস্থিতিতে নাসিমাকে তার দোকান বুঝিয়ে দেওয়া হয়।

এরপর কমফোর্ট কামালের নেতৃত্বে ২০-৩০ জনের একটি দল চেয়ারম্যান রাফিকে মারধর করে। ওই সময় মিরপুর থানার উপপরিদর্শক রেজাউল ইসলাম তার টহল দল নিয়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন বলে অভিযোগ নাসিমার।

সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে মিরপুর থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক রুস্তমের নেতৃত্বে কমফোর্ট কামাল মার্কেটে ঢুকে তালা ভেঙে নাসিমার দোকানটি আবার দখল করে।

ওইদিন রাত দেড়টার দিকে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা নেন রফিকুল ইসলাম রাফি। ঘটনার পরদিন ১৭ মে মিরপুর মডেল থানায় আরও একটি অভিযোগ করেন নাসিমা।

এছাড়া, দেশ সময় সুপার মার্কেটের অন্যান্য দোকান মালিকদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে কমফোর্ট কামালের বিরুদ্ধে। যোগাযোগ করা হলে নাসিমা আজাদের দোকানের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার কথা স্বীকার করেন কমফোর্ট কামাল। তবে তিনি দাবি করেন, ২০১৭ সালে মার্কেট নির্মাণকাজ বাবদ নাসিমার স্বামীর কাছে তার ৭৫ হাজার টাকা পাওনা ছিল। বাকি সব অভিযোগ অস্বীকার করেন তিনি।

তবে নাসিমা ও মার্কেট কর্তৃপক্ষ উভয়েই কামালের দাবি ভিত্তিহীন বলে উল্লেখ করেছেন। তাদের ভাষ্য, মার্কেট নির্মাণের সঙ্গে কামালের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। কামাল নিজেকে ঢাকা উত্তর ১১ নম্বর ওয়ার্ড স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক বলে দাবি করেন বলে জানান নাসিমা।

তবে ঢাকা উত্তরের ১১ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শাকিল আহমেদ স্বপন ডেইলি স্টারকে নিশ্চিত করেছেন, ওই এলাকায় যুবদল বা স্বেচ্ছাসেবক দলের কোনো কমিটি নেই।

গত ২০ মে এসব অন্যায়ের প্রতিবাদে দেশ সময় সুপার মার্কেটের সামনে মানববন্ধন ও সংবাদ সম্মেলন করেন ভুক্তভোগীরা। ওই মানববন্ধনে সন্ত্রাসী হামলা হলে মাঝপথেই পণ্ড হয়ে যায় আয়োজন।

আজ বুধবার মুঠোফোনে নাসিমা বলেন, ‘আমার দোকানটা ৫ আগস্টের পর দখল হয়ে গেছে। আমরা আওয়ামী লীগ করি না। মার্কেটের লোকজন ও পুলিশের কাছে একাধিকবার গিয়েছি। সবাই সহানুভূতি দেখাচ্ছে। কিন্তু কাজ হচ্ছে না। আমার দোকানও ফেরত পাচ্ছি না। পুলিশও অসহায় হয়ে পড়েছে এই সন্ত্রাসীদের সামনে। তাদের সামনেই আমার দোকান আবার দখল হয়ে গেছে। ঘুরতে ঘুরতে আমি ক্লান্ত।’

১৭ মে করা অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে সোমবার মিরপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাফিজুর রহমান বলেন, ‘ওই অভিযোগটি নিয়ে মিরপুর জোনের একজন অতিরিক্ত উপকমিশনার তদন্ত করছেন। তদন্তের পর এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’

Related Articles

Latest Posts