গত ফেব্রুয়ারিতে বিপুল জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় আসে বিএনপি। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতার পর মানুষ পরিবর্তনের আশায় নতুন সরকারের দিকে তাকিয়ে ছিল। তিন মাস পর সরকার এখন প্রথম ১০০ দিন পূরণের পথে। এই সময়ের মধ্যে সরকার কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ নিয়েছে। তবে অর্থনীতি, আইনশৃঙ্খলা ও জনদুর্ভোগের মতো বড় চ্যালেঞ্জগুলো এখনো পুরোপুরি সামাল দিতে পারেনি।
ক্ষমতায় এসেই সরকার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেয়। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাড়ানো, সরকারি ব্যয়ে মিতব্যয়িতা আনা এবং বিভিন্ন খাতে স্থিতিশীলতা ফেরানোর চেষ্টা শুরু হয়। ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড বিতরণ করা হয়েছে। বিভিন্ন ধর্মের ধর্মীয় নেতাদের জন্য ভাতা চালু করা হয়েছে। গ্রামীণ উন্নয়নের অংশ হিসেবে খাল খনন কর্মসূচিও শুরু হয়েছে।
এ ছাড়া অতীতের প্রথা ভেঙে বিএনপির সংসদ সদস্যরা করমুক্ত গাড়ি সুবিধা ত্যাগ করেছেন, যা মিতব্যয়িতার প্রতীক হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রযুক্তি খাতে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতেও সরকার উদ্যোগ নিয়েছে। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ১৮০ দিনের একটি কর্মসূচি চালু হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
প্রথম মন্ত্রিসভা বৈঠকে সরকার তিনটি বিষয়কে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়—নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা। তবে এই তিন ক্ষেত্রেই এখনো দৃশ্যমান অগ্রগতি খুব একটা চোখে পড়ছে না।
নতুন সরকার দায়িত্ব নেয় এক ভঙ্গুর অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে। উচ্চ সরকারি ঋণ, দুর্বল ব্যাংকিং খাত ও বিনিয়োগ সংকট শুরু থেকেই সরকারের জন্য বড় চাপ তৈরি করেছে।
গত এক বছরে মূল্যস্ফীতি ৮ থেকে ৯ শতাংশের মধ্যে থাকলেও মার্চে কিছুটা কমে যাওয়ার পর এপ্রিলেই আবার ৯ শতাংশের ওপরে উঠে যায়। এতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।
এর মধ্যেই আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিও নতুন চাপ তৈরি করে। সরকার গঠনের দুই সপ্তাহের মাথায় যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরান সংঘাত শুরু হলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে অস্থিরতা দেখা দেয়। এতে আমদানি ব্যয় বাড়ে এবং সরকারকে দ্রুত বিকল্প ব্যবস্থা নিতে হয়।
জ্বালানি সাশ্রয়ে অফিস, ব্যাংক, শপিং মল ও বাজারের সময়সূচি কমানো হয়। পাশাপাশি বিভিন্ন দেশ থেকে এলএনজি ও জ্বালানি তেল আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু অনেক এলাকায় এখনো জ্বালানি সংকট ও সরবরাহে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।
অর্থনৈতিক তীব্র চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি সরকারকে আরও কিছু সংকটের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং স্বাস্থ্য খাতের বড় ধরনের বিপর্যয়। অবশ্য সরকারের দাবি, এসব সমস্যার বেশিরভাগই তারা উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকার এখন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়ে প্রবেশ করছে। দীর্ঘমেয়াদে সরকারের গ্রহণযোগ্যতা ধরে রাখা এখন নির্ভর করছে অর্থনীতি, জনসেবা ও নিরাপত্তা খাতে দৃশ্যমান অগ্রগতির ওপর।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বলেন, এই সরকারের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো সমন্বয়ের অভাব। প্রধানমন্ত্রী হয়তো ইতিবাচক পরিবর্তন চান, কিন্তু মন্ত্রীরা সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে কার্যকর সমন্বয় দেখাতে পারছেন না। কিছু মন্ত্রী নিজেদের দায়িত্বের বাইরেও মন্তব্য করছেন। আবার সামগ্রিকভাবে সরকারি কাজের মধ্যে কোনো সুসমন্বয় দেখা যাচ্ছে না।
তিনি আরও বলেন, হামের প্রাদুর্ভাবের মতো স্বাস্থ্য সংকট হয়তো আগের সরকারের সময় থেকেই তৈরি হয়েছিল, কিন্তু বর্তমান সরকারকে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও শ্রম খাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে। একই সঙ্গে ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতার ঘটনায় দ্রুত বিচার নিশ্চিত করাও জরুরি।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক আল মাসুদ হাসানুজ্জামান বলেন, সরকার ফ্যামিলি কার্ডের মতো কিছু জনবান্ধব উদ্যোগ নিলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করার মতো বড় চ্যালেঞ্জগুলো এখনো রয়ে গেছে।
তিনি বলেন, সরকার কাজ করছে, কিন্তু বড় কোনো কাঠামোগত পরিবর্তন এখনো দৃশ্যমান নয়। প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাগুলো আগের পুরোনো দুর্বলতা নিয়েই চলছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে আলোচিত প্রধান সংস্কারগুলো সংসদ এখনো অনুমোদন করেনি বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি সতর্ক করে বলেন, সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারকে অবশ্যই দলীয়করণ পরিহার করতে হবে। কারণ এটি সরকারের ভাবমূর্তিকে সরাসরি প্রভাবিত করে। নিরপেক্ষ ও যোগ্য ব্যক্তিরাই যেন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ পান, তা নিশ্চিত করা জরুরি।
অবশ্য বেশ কয়েকজন শীর্ষ বিএনপি নেতা ও সরকারি কর্মকর্তা জানান, এখন যে সব দুর্বলতা সামনে আসছে, তা মূলত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের বছরের পর বছর ধরে চলা অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা, ক্রমবর্ধমান ঋণ ও প্রাতিষ্ঠানিক ধ্বংসযজ্ঞের ফল।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতিগুলো পূরণের জন্য ১৮০ দিনের একটি বিশেষ কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। এই সময়সীমা শেষ হলে এর সুনির্দিষ্ট ফলাফল জনগণের সামনে তুলে ধরা হবে।
সরকারের মধ্যে কোনো সমন্বয়হীনতা নেই দাবি করে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী প্রতিটি মন্ত্রিসভার বৈঠকে মন্ত্রীদের সঙ্গে সমন্বয় করেন এবং প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেন। প্রয়োজনে আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকও অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, কার্ডভিত্তিক প্রকল্পের মতো নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো সরকার ইতোমধ্যেই বাস্তবায়ন শুরু করেছে এবং জনগণকে প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সব খাতেই কাজ শুরু হয়েছে। তবে সামগ্রিক মূল্যায়নের জন্য তিন মাস সময় একেবারেই যথেষ্ট নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন।
সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের তালিকায় থাকলেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখনো বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় থেকেই দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি বেশ নাজুক ছিল। মব (গণপিটুনি) ও বিভিন্ন অপরাধের ঘটনা ঘটছিল ওই সময়। বর্তমান সরকারের তিন মাসেও পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি হতে যায়নি।
দেশজুড়ে খুন, চাঁদাবাজি, মব অ্যাটাক ও অপহরণের মতো অপরাধের ঘটনা প্রায়ই ঘটছে। গত তিন মাসে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বেশ কিছু অপরাধবিরোধী অভিযান চালালেও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে তারা এখনো হিমশিম খাচ্ছে।
অধ্যাপক মজিবুর রহমান মনে করেন, একাধিক সামাজিক কল্যাণমূলক উদ্যোগ নেওয়ার চেয়ে সরকারের উচিত ছিল জননিরাপত্তাকে সবার আগে অগ্রাধিকার দেওয়া। তার মতে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক করার বিষয়টি সবার আগে আসা উচিত ছিল। কারণ নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখনো বেশ নাজুক।
এই বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। তারা যেকোনো অভিযোগের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিচ্ছে এবং অপরাধীদের গ্রেপ্তার করছে।
এছাড়া পুলিশ বাহিনীকে সংস্কার এবং এর মধ্যে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার কাজ চলছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমি মনে করি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখন এমন একটি পর্যায়ে আছে যা জনগণের প্রত্যাশার কাছাকাছি।
এদিকে, শিশুদের মধ্যে হামের প্রাদুর্ভাব বর্তমান সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় স্বাস্থ্যগত চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। দেশজুড়ে হাম বা হাম-সদৃশ উপসর্গে ৫০০-র বেশি শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। ইউনিসেফ জানিয়েছে, তারা আগেই টিকা সংকট ও বড় ধরনের প্রাদুর্ভাবের আশঙ্কা নিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে বারবার সতর্ক করেছিল, কিন্তু সেই সতর্কবার্তাগুলো তখন উপেক্ষিত হয়েছিল।
বর্তমান সরকার অবশ্য ক্ষমতায় আসার পর জরুরি ভিত্তিতে টিকা সংগ্রহ, টিকাদান কর্মসূচি জোরদার ও স্বাস্থ্য খাতের কিছু জায়গায় প্রশাসনিক রদবদল করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে।
অধ্যাপক মজিবুর ও আল মাসুদ হাসানুজ্জামান—উভয়েই মনে করেন, বিপুল জনম্যান্ডেট নিয়ে আসা বিএনপি সরকার এই জনসমর্থনকে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতায় রূপান্তর করতে পারবে কি না, তা আগামী মাসগুলোর কর্মতৎপরতার মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে।

