স্টেডিয়ামের ভেতরে হাজার হাজার মানুষ কাঁদছিলেন, কিন্তু কোনো শব্দ ছিল না। সেই নীরবতা চিৎকারের চেয়েও বেশি কষ্টের। হলুদ জার্সি পরা সমর্থকরা মুখ ঢেকে বসে আছেন, কেউ কেউ শূন্য দৃষ্টিতে মাঠের দিকে তাকিয়ে, যেন বিশ্বাসই করতে পারছেন না চোখের সামনে কী ঘটে গেল। মাত্র ছয়টি মিনিট। মাত্র ছয়টি মিনিটে একটি দেশের স্বপ্ন, একটি প্রজন্মের প্রতীক্ষা, একটি জাতির পরিচয়, সব কিছু ধুলোয় মিশে গেলো।
২০১৪ সালের বিশ্বকাপ ব্রাজিলের কাছে ছিল শুধু একটি টুর্নামেন্ট নয়, এটি ছিল প্রায়শ্চিত্তের সুযোগ। ১৯৫০ সালের ‘মারাকানাজো’র পর থেকে ব্রাজিলিয়ানরা নিজেদের মাটিতে বিশ্বকাপ জিততে পারেনি। সেই ক্ষত কখনো শুকায়নি, কখনো ভোলাও যায়নি। এবার নিজেদের মাঠে, নিজেদের দর্শকদের সামনে, এই দলটি ইতিহাস বদলে দেবে। এই স্বপ্নের কেন্দ্রে ছিলেন একজন মানুষ নেইমার জুনিয়র। তাকে ঘিরেই আবর্তিত হচ্ছিল একটি দেশের আশা, একটি জাতির বিশ্বাস।
কিন্তু কোয়ার্টার ফাইনালে কলম্বিয়ার বিরুদ্ধে জুয়ান কামিলো জুনিগার হাঁটুর আঘাতে নেইমারের পিঠের তিনটি কশেরুকা ভেঙে যায়। স্ট্রেচারে চড়ে মাঠ ছেড়ে যাওয়ার সময় তিনি কাঁদছিলেন। ব্রাজিলের কোটি কোটি মানুষও কাঁদছিলেন। ক্যাপ্টেন থিয়াগো সিলভাও সাসপেনশনের কারণে সেমিফাইনালে মাঠে নামতে পারবেন না। দুই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়কে ছাড়াই ব্রাজিলকে মুখোমুখি হতে হবে জার্মানির।
৮ জুলাই ২০১৪। বেলো অরিজন্তের এস্তাদিও মিনেইরো। ৫৮ হাজার দর্শক মাঠে, কোটি কোটি মানুষ টেলিভিশনের সামনে। প্রত্যেকের মনে একটাই প্রার্থনা, ফাইনালে যেতে হবে। স্টেডিয়ামজুড়ে হলুদ-সবুজের ঢেউ, গলা ফাটানো গান, চোখে স্বপ্নের আলো। ব্রাজিলিয়ানরা বিশ্বাস করতেন, ভাগ্য তাদের পক্ষে। তারা জানতেন না, নিয়তি সেদিন অন্য কিছু ভেবে রেখেছে।
ম্যাচ শুরুর মাত্র ১১ মিনিটের মাথায় থমাস মুলার একটি কর্নার থেকে গোল করলেন। মিনেইরোতে থমকে গেল ৫৮ হাজার মানুষের নিঃশ্বাস। তবু আশা ছিল। তবু বিশ্বাস ছিল। এক গোলে কি আর সব শেষ হয়? ব্রাজিলের ইতিহাস বলে, এরা ফিরে আসে। কিন্তু ইতিহাস সেদিন নিজেই প্রস্তুত ছিল এক ভিন্ন অধ্যায় লিখতে।
২৩তম মিনিট। মিরোস্লাভ ক্লোজে বল পেলেন পেনাল্টি বক্সের কাছে। শান্তভাবে, নিখুঁতভাবে করলেন ২-০। বিশ্বকাপে তার ১৬তম গোল, সর্বকালের রেকর্ড। কিন্তু রেকর্ডের কথা তখন কেউ ভাবেনি।
২৪তম মিনিট, মাত্র এক মিনিট পর, টনি ক্রুস বাম পায়ে শট নিলেন। ৩-০। মিনেইরোতে সেই মুহূর্তে নেমে এলো এক অদ্ভুত, অসহ্য নীরবতা।
এরপর ২৬তম মিনিট, আবার ক্রুস, এবার ডান পা থেকে। ৪-০। দর্শকরা চুপ, সমর্থকরা হতবাক, মাঠে ব্রাজিলের খেলোয়াড়রা একে অপরের দিকে তাকাচ্ছেন, চোখে প্রশ্ন, মুখে কোনো উত্তর নেই। কেউ কেউ হাঁটু ধরে বসে পড়লেন। কোচ স্কোলারি ডাগআউটে বসে শূন্য দৃষ্টিতে মাঠের দিকে তাকিয়ে আছেন।
২৯তম মিনিট। সামি খেদিরা। ৫-০।
মাত্র ছয় মিনিটে চার গোল, আঠারো মিনিটে পাঁচটি গোল। বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে। নিজেদের মাঠে। কান্না আর ধাক্কা, লজ্জা আর অবিশ্বাস। সব একসাথে এসে চাপা দিয়ে দিল একটি জাতিকে। স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে হলুদ জার্সি পরা মানুষেরা তখন আর চিৎকার করছেন না, গান গাইছেন না, শুধু কাঁদছেন। ছোট শিশুরা মায়ের বুকে মুখ লুকিয়েছে, বৃদ্ধরা মাথায় হাত দিয়ে বসে আছেন, তরুণরা চোখ মুছছেন বারবার।
হাফটাইমে মাঠ ছেড়ে ব্রাজিলের খেলোয়াড়রা যখন টানেলের দিকে হাঁটছিলেন, স্টেডিয়ামে বাজছিল শুধু কান্নার শব্দ। সেই দৃশ্য দেখে মনে হচ্ছিল, এটি কোনো খেলার বিরতি নয়, এটি কোনো কিছুর শেষের বিরতি। ব্রাজিলিয়ান মিডিয়া পরে এই ম্যাচের নাম দিয়েছিল ‘মিনাইরাজো’, ১৯৫০ সালের ‘মারাকানাজো’র সাথে মিল রেখে। দুটো ঘটনাই একটি জাতির বুকে সমানভাবে দগদগে ক্ষত হয়ে থেকে গেছে।
দ্বিতীয়ার্ধে জার্মানি কিছুটা গতি কমালো। হয়তো তারাও টের পাচ্ছিলেন, যা হচ্ছে তা ফুটবলের সীমা ছাড়িয়ে অন্য কিছু হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ৬৯তম মিনিটে আন্দ্রে শুর্লে আবার গোল করলেন, ৬-০। ৭৯তম মিনিটে আরো একটি, ৭-০। শেষদিকে অস্কার একটি সান্ত্বনা গোল করলেন। ৭-১। সেই গোলে স্টেডিয়ামে যে হাততালি পড়েছিল, সেটা আনন্দের হাততালি ছিল না, সেটা ছিল একটি ডুবন্ত মানুষের শেষ নিঃশ্বাসের শব্দ।
সেই ম্যাচে থমাস মুলার করেছিলেন হ্যাটট্রিক। তিনটি গোল এবং দুটো অ্যাসিস্ট। কিন্তু তার মুখে কোনো উন্মাদনা ছিল না, বুক চাপড়ানো উদযাপন ছিল না। মুলার যেন একজন দক্ষ কারিগরের মতো কাজ করে গেছেন। নিঃশব্দে, নিখুঁতভাবে। এই নির্লিপ্ততাই বরং ছিল আরো বেশি ভয়ংকর। জার্মানি সেদিন কোনো দলকে শুধু হারায়নি, তারা একটি মিথকে ভেঙে দিয়েছিল। ব্রাজিল ‘অজেয়’, এই বিশ্বাসটাকে তারা মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছিল সেই আঠারো মিনিটে।
রাস্তায় রাস্তায় সেদিন রাতে ব্রাজিলিয়ানরা বেরিয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু উৎসব করতে নয়, কাঁদতে। রিও ডি জেনেইরোর কোপাকাবানা সৈকতে, সাও পাউলোর রাস্তায়, বেলো অরিজন্তের গলিতে, মানুষ হাঁটছে, কাঁদছে, চুপ করে বসে আছে। গোলরক্ষক জুলিও সিজার পরে বলেছিলেন, ‘আমি চাইছিলাম মাটি ফেটে যাক, আমি যেন তার ভেতরে ঢুকে যেতে পারি।’ ডেভিড লুইজ ম্যাচ শেষে মাঠে হাঁটু গেড়ে বসে ক্ষমা চেয়েছিলেন দেশবাসীর কাছে। সেই ছবিটি ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের সবচেয়ে বেদনাদায়ক দৃশ্যগুলোর একটি হয়ে থেকে গেছে।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে এর আগে কখনো কোনো স্বাগতিক দেশ সেমিফাইনালে এভাবে হারেনি। এটাই ছিল বিশ্বকাপে ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় পরাজয়। জার্মানি সেই বিশ্বকাপ জিতেছিল, ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে। মারিও গোটসের সেই গোল, সেই শিরোপা। কিন্তু পৃথিবী সেই রাতে মনে রেখেছিল অন্য কিছু।

