ফুটবলপ্রেমীদের কাছে ২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপ এক স্মরণীয় টুর্নামেন্ট। সাম্বার দেশে ফুটবলের বিশ্বমঞ্চে জন্ম নেওয়া অজস্র গল্পের মধ্যে অন্যতম সেরা গল্পটি ছিল এক ২২ বছর বয়সী কলম্বিয়ানের অভাবনীয় উত্থানের। ১৯৯০ সালের আসরের পর বিশ্বকাপে কলম্বিয়ার বলার মতো কোনো সাফল্য ছিল না, তাই এই টুর্নামেন্ট ঘিরে তাদের প্রত্যাশা ছিল আকাশচুম্বী। কিন্তু টুর্নামেন্ট শুরুর ঠিক আগে দলের সবচেয়ে বড় তারকা ও গোলমেশিন রাদামেল ফ্যালকাও চোটে ছিটকে যাওয়ায় সেই স্বপ্ন ফিকে হতে বসেছিল। তার শূন্যস্থান পূরণের কঠিন দায়িত্ব এসে পড়ে এক তরুণ অ্যাটাকিং মিডফিল্ডারের কাঁধে।
ঠিক তখনই যেন এক জাদুকর হিসেবে আবির্ভূত হলেন তিনি। দুর্দান্ত বাম পা আর গ্যালারি মাতানো নিষ্পাপ হাসিতে ভর করে মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে তিনি হয়ে উঠলেন গোটা বিশ্বের নতুন সুপারস্টার। তার নাম হামেস রদ্রিগেজ। ২০১৪ সালের সেই গ্রীষ্মকালটি তার জন্য শুধু একটি সাধারণ টুর্নামেন্ট ছিল না, বরং তা ছিল বিশ্ব ফুটবলে তার শক্ত খুঁটি গেঁড়ে বিজয়কেতন ওড়ানোর। কলম্বিয়ার বিখ্যাত ১০ নম্বর জার্সিতে তিনি যে সৃজনশীলতা ও জাদুর ছোঁয়া দেখিয়েছিলেন, তা ভক্ত-সমর্থকদের পুরোপুরি আচ্ছন্ন করে ফেলেছিল।
গ্রুপ পর্বে গ্রিস, আইভরিকোস্ট ও জাপানের বিপক্ষে তিনটি ম্যাচেই গোল করে তিনি জানান দিয়েছিলেন নিজের আগমনী বার্তা। জাপানের বিপক্ষে বদলি হিসেবে নেমে মাত্র ৪৫ মিনিট খেলে একটি দৃষ্টিনন্দন গোল এবং দুটি চমৎকার অ্যাসিস্ট করে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, তিনি সাধারণ কেউ নন। শুধু বল পায়ে নৈপুণ্যই নয়, প্রতিটি গোলের পর সতীর্থদের নিয়ে কর্নার ফ্ল্যাগের কাছে তার সেই আইকনিক সালসা নাচ যেন হয়ে উঠেছিল ব্রাজিল বিশ্বকাপের অঘোষিত থিম সং।
গ্রুপ পর্বেই হামেসের এমন অনবদ্য পারফরম্যান্স এবং মাঝমাঠে খেলা নিয়ন্ত্রণের অসাধারণ ক্ষমতা দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন সবাই। কলম্বিয়ার তৎকালীন আর্জেন্টাইন কোচ হোসে পেকারম্যান বুঝতে পেরেছিলেন, তার হাতে এক অমূল্য রত্ন রয়েছে। এই প্রিয় শিষ্য সম্পর্কে তিনি গর্বের সাথে বলেছিলেন, ‘হামেসের প্রতিভা নিয়ে আমার মনে কখনোই কোনো সন্দেহ ছিল না। বিশ্বমঞ্চে নিজেকে বিশ্বমানের খেলোয়াড় হিসেবে প্রমাণ করার সব উপাদান ওর মধ্যে রয়েছে। ও এমন একজন খেলোয়াড়, যে একাই ম্যাচের গতিপথ বদলে দিতে পারে।’
তবে হামেস নিজের এই উল্কাসম উত্থানকে কিংবদন্তির পর্যায়ে নিয়ে যান ২৮ জুন। রিও দি জানেইরোর ঐতিহাসিক মারাকানা স্টেডিয়ামে শেষ ষোলোর লড়াইয়ে সেদিন কলম্বিয়ার প্রতিপক্ষ ছিল শক্তিশালী উরুগুয়ে। প্রথমার্ধের ২৮তম মিনিটের মাথায় সতীর্থ মিডফিল্ডার আবেল আগিলার হেডে বল ভাসিয়ে দেন ডি-বক্সের ঠিক বাইরে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকা হামেসের দিকে। এরপর যা হলো, তা যেন ক্যানভাসে আঁকা এক নিখুঁত শিল্পকর্ম।
বলটি আসার আগেই হামেস একবার ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে নিলেন উরুগুইয়ান গোলরক্ষক ফার্নান্দো মুসলেরার অবস্থান। এরপর বুক দিয়ে ভাসমান বলটি আলতো করে রিসিভ করে, মাটিতে পড়ার আগেই অবিশ্বাস্য ক্ষিপ্রতায় শরীরটাকে ঘুরিয়ে নিলেন। তার বাঁ পায়ের জোরালো ভলি মুসলেরার হাতের ডগা ছুঁয়ে ক্রসবারের ভেতরের দিকে লেগে আছড়ে পড়ল জালে। পদার্থবিদ্যার সূত্রকে যেন বুড়ো আঙুল দেখিয়ে করা সেই গোলটি কেবল ২০১৪ বিশ্বকাপের সেরা গোলই হয়নি, জিতেছিল সে বছরের ফিফা পুসকাস অ্যাওয়ার্ডও।
এই জাদুকরী পারফরম্যান্স দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন উরুগুয়ের কিংবদন্তি কোচ অস্কার তাবারেজ। ম্যাচ শেষে অকপটে তিনি স্বীকার করে নিয়েছিলেন হামেসের শ্রেষ্ঠত্ব। তিনি বলেছিলেন, ‘ফুটবলে কিছু খেলোয়াড় থাকেন, যারা জন্মগতভাবেই বিশেষ প্রতিভার অধিকারী। দিয়েগো ম্যারাডোনা, লিওনেল মেসি বা লুইস সুয়ারেজ— ওরা এমন কিছু করে, যা সাধারণের কল্পনাতীত। হামেস রদ্রিগেজ ঠিক সেই ঘরানারই একজন খেলোয়াড়। আমার মনে হয়, ও-ই এই বিশ্বকাপের সেরা ফুটবলার।’
সেদিন উরুগুয়ের বিপক্ষে জোড়া গোল করে কলম্বিয়াকে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে তুলেছিলেন হামেস। এরপর শেষ আটে স্বাগতিক ব্রাজিলের বিপক্ষে পেনাল্টি থেকে গোল করার সময় তার ডান হাতে এসে বসা সেই বিশাল সবুজ ঘাসফড়িংয়ের দৃশ্যটি আজও আইকনিক। ম্যাচটিতে ২-১ গোলে হেরে বিদায় নেওয়ার পর মাঠেই কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। বিদায়বেলায় প্রতিপক্ষ ব্রাজিলিয়ান ডিফেন্ডার দাভিদ লুইজ যেভাবে তাকে জড়িয়ে ধরে পুরো স্টেডিয়ামকে হাততালি দেওয়ার ইশারা করেছিলেন, তা ছিল এই তরুণের অবিশ্বাস্য উত্থানের এক অনন্য স্বীকৃতি।
মাত্র ৫ ম্যাচ খেলে ৬টি গোল, সাথে ২টি অ্যাসিস্ট— এই অসামান্য পরিসংখ্যান নিয়ে বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে ‘গোল্ডেন বুট’ জয় করেন হামেস। এই একটি টুর্নামেন্ট তাকে রাতারাতি বৈশ্বিক সুপারস্টারে পরিণত করে। বিশ্বকাপের ঠিক পরপরই রিয়াল মাদ্রিদের প্রেসিডেন্ট ফ্লোরেন্তিনো পেরেজ তাকে দলে ভেড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন। ফ্রেঞ্চ ক্লাব এএস মোনাকো থেকে প্রায় ৮০ মিলিয়ন ইউরোর বিশাল চুক্তিতে স্বপ্নের ক্লাবে যোগ দেন হামেস। সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে তাকে স্বাগত জানাতে উপস্থিত হয়েছিল প্রায় ৪৫ হাজার দর্শক।
পরবর্তী সময়ে ক্লাব ক্যারিয়ারে চোট আর ফর্মহীনতার কারণে হয়তো সেই শীর্ষস্থান তিনি ধারাবাহিকভাবে ধরে রাখতে পারেননি। রিয়াল মাদ্রিদ থেকে বায়ার্ন মিউনিখ কিংবা এভারটন হয়ে তার ক্লাব ক্যারিয়ারে অনেক উত্থান-পতন এসেছে, চেনা সেই ছন্দের দেখাও সব সময় মেলেনি। তবে ২০১৪ সালের সেই গ্রীষ্মে হামেস নামের যে নক্ষত্রকে বিশ্ব ফুটবল আপন করে নিয়েছিল, তা কোনো পরিসংখ্যান দিয়ে মাপা সম্ভব নয়। ঐ সময়টুকু তার ছিল, আছে ও ইতিহাসের পাতায় এক মোহনীয় অধ্যায় হিসেবে চিরকাল অমলিন থাকবে।

