৫ অদম্য নারীর হাতে ‘আনসাং উইমেন নেশন বিল্ডার্স অ্যাওয়ার্ড’

বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে থেকে উঠে আসা পাঁচজন অদম্য নারীর সংগ্রাম, সংকল্প ও ত্যাগের স্বীকৃতি হিসেবে পেলেন ‘আনসাং উইমেন নেশন বিল্ডার্স অ্যাওয়ার্ড ২০২৬’। তাদের কেউ সমাজ পরিবর্তনে ভূমিকা রেখেছেন, আবার কেউ সব ধরনের প্রতিকূলতা পেরিয়ে নিজের জীবনকে বদলে দিয়েছেন। 

দ্য ডেইলি স্টার ও আইপিডিসি ফাইন্যান্স পিএলসির যৌথ উদ্যোগে রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ মিলনায়তনে গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় আয়োজিত অনুষ্ঠানে তাদের হাতে সম্মাননা তুলে দেওয়া হয়।

এ বছর পুরস্কার পেয়েছেন শেরপুরের ৮৩ বছর বয়সী সাবেক শিক্ষক রাজিয়া সামাদ ডালিয়া। ব্যক্তিগত খরচ ও উদ্যোগে ডায়াবেটিক হাসপাতাল ও পথশিশুদের আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি করেছেন তিনি। 

পুরস্কার পাওয়া নারীদের মধ্যে ঝিনাইদহের আলেয়া বেগম বাল্যবিবাহ ও আত্মহননের চেষ্টা থেকে ফিরে এসে ১৪ বছর ধরে আত্মহত্যার বিরুদ্ধে লড়াই করছেন। 

শারীরিক শিক্ষিকা সুরাইয়া বেগম শত শত গ্রামীণ মেয়েকে প্রতিযোগিতামূলক খেলাধুলায় প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। 

প্রাণিবিদ্যায় স্নাতক পাস করা লাবণী আক্তার গবেষণাগারের জন্য বৈজ্ঞানিক উপায়ে ইঁদুর পালনে পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করছেন।

জন্মগতভাবে গাইবান্ধার আয়েশা আক্তারের দুই হাত নেই। পায়ের আঙুল দিয়ে লিখে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করে এখন শিক্ষকতা করছেন তিনি।

২০১৭ সালে শুরু হওয়া এই উদ্যোগের মাধ্যমে এ পর্যন্ত তৃণমূল পর্যায়ের ৫২ জন নারীকে বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে তাদের নিরলস অবদানের জন্য সম্মাননা জানানো হয়েছে।

অনুষ্ঠানে আইপিডিসি ফাইন্যান্স পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক রিজওয়ান দাউদ শামস বলেন, ‘বাংলাদেশের সবচেয়ে শক্তিশালী ও অনুপ্রেরণাদায়ী গল্পগুলো সব সময় বড় বড় জায়গা থেকে আসে না। গ্রাম-শহরে ছড়িয়ে আছেন তারা। নারী ক্ষমতায়ন মানে শুধু সুযোগ সৃষ্টি করা নয়, স্বীকৃতি দেওয়াটাও সমান জরুরি।’

দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদক ও প্রকাশক মাহ্‌ফুজ আনাম তার বক্তব্যে বলেন, বাংলাদেশের প্রকৃত শক্তি তৃণমূল পর্যায়ে কাজ করা নারীদের সাহসিকতার মধ্যেই নিহিত। তিনি বলেন, ‘তাদের কথা প্রচার হয়নি, কারণ সমাজ এখনো তাদের প্রাপ্য স্বীকৃতি দেয়নি। নিজেদের স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সমাজের জন্য তাদের যে ত্যাগ, তা শুধু প্রশংসনীয়ই নয়, অনুকরণীয়ও।’

ইউএন উইমেন বাংলাদেশের কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ গীতাঞ্জলি সিং বলেন, ‘প্রকৃত অগ্রগতি তখনই সম্ভব, যখন নারীদের নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। আজকের এই নারীরা আমাদের মনে করিয়ে দেন যে নেতৃত্ব কোনো পদ বা সুবিধার বিষয় নয়, বরং যেখানে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, সেখানে পরিবর্তন আনার ক্ষমতাই হলো নেতৃত্ব।’

অনুষ্ঠানে পুরস্কার বিজয়ীদের নিয়ে তৈরি তথ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। সংগীত পরিবেশন করে ‘এফ মাইনর’ ব্যান্ড।

সম্মাননা পেলেন যারা

অনুষ্ঠানে বিশেষ সম্মাননা তুলে দেওয়া হয় শেরপুরের সবার প্রিয় ‘ডালিয়া খালামণি’ বা রাজিয়া সামাদ ডালিয়াকে। অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির তার হাতে সম্মাননা স্মারক তুলে দেন। পুরস্কার পেয়ে ডালিয়া বলেন, স্বাধীনতা তখনই অর্থবহ হবে, যখন আমরা দেশের মানুষের মধ্যে বৈষম্য কমাতে পারব।

ঝিনাইদহের শ্রীফলতলী গ্রামের ৪৮ বছর বয়সী আলেয়া বেগমকে তার হাতে পুরস্কার তুলে দেন গীতাঞ্জলি সিং। বাল্যবিবাহের পর দুবার আত্মহত্যার চেষ্টা করা আলেয়া বলেন, আমি মানুষকে জীবনকে ভালোবাসতে শেখাই। আমরা জানি কীভাবে শক্তি, সাহস ও মর্যাদা নিয়ে বাঁচতে হয়।

মেয়েদের খেলাধুলায় সামাজিক বাধা দূর করার স্বীকৃতিস্বরূপ ঝিনাইদহের শারীরিক শিক্ষিকা সুরাইয়া বেগমকে সম্মাননা স্মারক তুলে দেন নারীপক্ষের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য শিরিন হক। সুরাইয়া বলেন, ‘সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও আমি নিজে খেলোয়াড় হিসেবে সফল হতে পারিনি। সেই আক্ষেপ থেকেই আমি মেয়েদের খেলাধুলায় প্রশিক্ষণ দিচ্ছি।’

গবেষণাগারের জন্য বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ইঁদুর পালনের জন্য শরিয়তপুরের লাবণী আক্তারকে পুরস্কার তুলে দেন মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম। লাবণী বলেন, মানুষ যদি সত্যি কিছু চায়, তবে সে সবকিছুই অর্জন করতে পারে।

অনুষ্ঠানে আরও পুরস্কার দেওয়া হয় জন্মগতভাবে দুই হাতহীন আয়েশা আক্তারকে। উইমেন উইথ ডিজঅ্যাবিলিটিজ ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক আশরাফুন নাহার মিষ্টি তার হাতে সম্মাননা স্মারক তুলে দেন। আয়েশা বলেন, আমি আমার মতো নারীদের বলতে চাই, নিজেদের কখনোই অসহায় বা পরিবার ও সমাজের বোঝা মনে করবেন না।

অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে আইপিডিসি ফাইন্যান্স পিএলসির চেয়ারম্যান আরিফুল ইসলাম সবাইকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন।

Related Articles

Latest Posts