লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বাব আল-মান্দেব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে সৌদি আরব। সম্ভাব্য এ অভিযানে ইয়েমেনের এক লাখের বেশি সেনা অংশ নিতে পারেন। তাদের সহায়তায় সৌদি বিমান হামলা চালানোর পরিকল্পনাও বিবেচনা করা হচ্ছে।
আঞ্চলিক ও পশ্চিমা কর্মকর্তাদের বরাতে বার্তাসংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এ অভিযান শুরু হতে পারে। তবে অভিযানের সময় ও পরিধি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। বাব আল-মান্দেব প্রণালির উপকূলীয় এলাকায় সীমিত অভিযান অথবা ইয়েমেনের একাধিক এলাকায় একযোগে হামলা—দুই ধরনের পরিকল্পনা বিবেচনা করছে রিয়াদ।
এদিকে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের সেনাবাহিনী দাবি করেছে, গত ২৪ ঘণ্টায় হুতিদের বিরুদ্ধে প্রায় ৫০০টি সামরিক অভিযান চালিয়ে ১ হাজার ৫৪০ বিদ্রোহীকে হত্যা বা আহত করা হয়েছে। শুক্রবার সন্ধ্যায় সেনাবাহিনীর মুখপাত্র কর্নেল মাজেদ আবদুল্লাহ আল-নাজিলি এ তথ্য জানান।
তবে হুতিদের হতাহতের এ দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি। সরকারি বাহিনীর কতজন হতাহত হয়েছেন, সে বিষয়ে সেনাবাহিনীর মুখপাত্র কিছু জানাননি।
দুটি ঘটনার মধ্যে এমন এক সময়ে সামরিক উত্তেজনা বাড়ছে, যখন ইরান যুদ্ধের প্রভাবে মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিকল্প নৌপথ হিসেবে বাব আল-মান্দেব ও লোহিত সাগরের গুরুত্বও বেড়েছে।
বাব আল-মান্দেব কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
বাব আল-মান্দেব প্রণালি লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রবেশপথ। এ পথ দিয়ে ভূমধ্যসাগর ও এশিয়ার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করে। প্রণালিটি ইয়েমেনের উপকূল, আফ্রিকার জিবুতি ও ইরিত্রিয়ার মধ্যবর্তী এলাকায় অবস্থিত।
হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এ বছর বাব আল-মান্দেব ও লোহিত সাগরের নৌপথের কৌশলগত গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
রয়টার্সকে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হুতিদের নিয়ন্ত্রণে থাকা এ অঞ্চলের উপকূলীয় এলাকা ও কৌশলগত অবস্থান পুনরুদ্ধার করা সৌদি অভিযানের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। তাদের মতে, বাব আল-মান্দেবের ওপর হুতিদের নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রভাব বিস্তারের বড় সুযোগ পাবে গোষ্ঠীটি।
পশ্চিমা কূটনীতিক ও উপসাগরীয় অঞ্চলের এক কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, বাব আল-মান্দেবের নিয়ন্ত্রণ হুতিদের হাতে থাকা অবস্থায় তাদের সঙ্গে নতুন করে শান্তি আলোচনা শুরু করতে চায় না সৌদি আরব।
সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইকেল র্যাটনি মনে করেন, সৌদি অভিযান ২০১৫ সালের বৃহৎ সামরিক অভিযানের তুলনায় সীমিত পরিসরে হতে পারে। তার মতে, হুতিদের পুরোপুরি পরাজিত করার পাশাপাশি সৌদি আরবের লক্ষ্য উপকূলীয় এলাকা পুনর্দখল এবং স্বাভাবিক নৌ চলাচল ফিরিয়ে আনা।
অভিযানের সম্ভাব্য পরিকল্পনা কী?
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সৌদি আরব দুটি বিকল্প বিবেচনা করছে।
প্রথমটি হলো বাব আল-মান্দেব প্রণালির আশপাশে সীমিত সামরিক অভিযান চালিয়ে উপকূলীয় এলাকার নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করা।
দ্বিতীয়টি হলো ইয়েমেনের একাধিক রণাঙ্গনে সমন্বিত আক্রমণ চালানো। এ পরিকল্পনায় আল-বাইদা, মারিব, তাইজ ও আল-জাওফ গভর্নরেট অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
কর্মকর্তাদের ধারণা, অভিযানের পরিধির ওপর নির্ভর করে এক লাখের বেশি ইয়েমেনি সেনা এতে অংশ নিতে পারেন। স্থল অভিযানের নেতৃত্বে থাকবে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী। তাদের সহায়তা দেবে সৌদি বিমানবাহিনী।
অভিযান শুরুর নির্দিষ্ট সময় এখনো জানা যায়নি। সংশ্লিষ্ট ছয় ব্যক্তির দেওয়া ধারণা অনুযায়ী, এক সপ্তাহের মধ্যে অভিযান শুরু হতে পারে, আবার যুক্তরাষ্ট্রের নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরও তা শুরু হতে পারে।
সৌদি আরব ও ইয়েমেনের সরকার, হুতি গোষ্ঠী এবং মার্কিন সামরিক বাহিনী এ বিষয়ে রয়টার্সের মন্তব্যের অনুরোধে তাৎক্ষণিক সাড়া দেয়নি।
ইয়েমেনে লড়াই তীব্র হচ্ছে কেন?
ইয়েমেনে ২০১৪ সালে হুতিরা রাজধানী সানা দখল করার পর থেকে গৃহযুদ্ধ চলছে। তাদের অগ্রযাত্রার মুখে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার রাজধানী ছেড়ে এডেনে আশ্রয় নেয়।
২০১৫ সালে ওই সরকারকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনতে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন জোট ইয়েমেনে সামরিক অভিযান শুরু করে। পরবর্তী সময়ে সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থায় রূপ নেয়।
২০২২ সালে দুই পক্ষের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও চলতি বছর জুলাইয়ে তা ভেঙে পড়ে। এরপর থেকে সংঘর্ষ বেড়েছে।
গত সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে হুতিরা পশ্চিম ইয়েমেনের কয়েকটি এলাকায় দ্রুত অগ্রসর হয়ে মোখা বন্দরনগরী এবং বাব আল-মান্দেব প্রণালিসংলগ্ন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নেয় বলে আল জাজিরার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর হুতিবিরোধী বাহিনী মূলত সম্মুখসারির অবস্থান স্থিতিশীল করার চেষ্টা করেছে।
ইয়েমেনের সেনাবাহিনীর মুখপাত্র আল-নাজিলি জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক অভিযানে যুদ্ধবিমান, ড্রোন, কামান, ক্ষেপণাস্ত্র ও রকেট লঞ্চার ব্যবহার করা হয়েছে। এসব হামলায় বেশিরভাগ হতাহত হয়েছে তাইজ গভর্নরেটে। সেখানে সরকারি বাহিনী হুতিদের অগ্রযাত্রা থামিয়ে দিয়েছে বলে দাবি তার।
সরকারি নিয়ন্ত্রণাধীন তাইজ শহর নতুন করে শুরু হওয়া লড়াইয়ের অন্যতম কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ স্থলপথ বন্ধ
আজ শনিবার ইয়েমেনের সেনাবাহিনীর গণমাধ্যমবিষয়ক কর্মকর্তা আম্মার আল-সামি আল জাজিরাকে জানান, তাইজের আল-হুবান ক্রসিং বন্ধ করে দিয়েছে সরকার।
বিরোধী দুই পক্ষের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকার মধ্যে সংযোগ স্থাপনে গুরুত্বপূর্ণ এ সড়কটি এর আগে নয় বছর বন্ধ ছিল। মানবিক কারণে ২০২৪ সালে বেসামরিক মানুষের চলাচলের জন্য এটি খুলে দেওয়া হয়।
আল-সামি বলেন, এ সড়ক দিয়ে তাইজে হুতিদের অনুপ্রবেশের চেষ্টা, আশপাশে হামলা এবং সামরিক তৎপরতা বাড়ার পর নিরাপত্তার কারণে ক্রসিংটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার দীর্ঘদিনের উদ্বেগের অন্যতম বিষয় ইয়েমেনের মানবিক সংকট। নতুন করে সংঘর্ষ শুরুর পর থেকে দেশটিতে কয়েক লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
সৌদিকে কী ধরনের সহায়তা দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র?
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সৌদি আরবের ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাষ্ট্র ইয়েমেনে সৌদি অভিযানে গোয়েন্দা তথ্য, সামরিক পরামর্শ এবং লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করার তথ্য দিয়ে সহায়তা করছে।
তবে এ সহায়তার পরিধি সীমিত হতে পারে। রয়টার্স এর আগে জানিয়েছিল, সৌদি আরবের কার্যত শাসক মোহাম্মদ বিন সালমান সরাসরি বিমান হামলার মতো সামরিক সহায়তা চাইলেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাতে সম্মতি দেননি।
তুরস্ক ও পাকিস্তানও সৌদি আরবকে সামরিক সরঞ্জাম দিয়েছে বলে পাকিস্তানি ও আঞ্চলিক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
পাকিস্তানের এক সরকারি কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, গত মাসে চারটি মালবাহী উড়োজাহাজে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, হালকা কামান, ড্রোন ও ড্রোন প্রতিরোধী সরঞ্জাম এডেনে পাঠানো হয়েছে। সৌদি কর্মকর্তাদের সঙ্গে পাকিস্তানের সামরিক উপদেষ্টারাও ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীকে সহায়তা করছেন বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
এ ছাড়া বর্তমান যুদ্ধের আগে সৌদি আরবের কেনা তুরস্কের ড্রোন ইয়েমেনের আকাশে মোতায়েন করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পাকিস্তানের আরেক কর্মকর্তার ভাষ্য, সৌদি আরবের স্থলসীমান্ত রক্ষা এবং ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে দেশটিতে ৩০ থেকে ৪০ হাজার পাকিস্তানি সেনা মোতায়েন করা হয়েছে। তবে পাকিস্তান ইয়েমেনে সরাসরি যুদ্ধ করার জন্য সেনা পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়নি বলে জানিয়েছেন তিনি।
এদিকে লোহিত সাগরের উপকূলীয় বন্দর ইয়ানবুকে সুরক্ষা দিতে প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ও সেনা পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে ফ্রান্স।
সৌদি অভিযানের ঝুঁকি কোথায়?
ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী একক কোনো সুসংগঠিত সামরিক শক্তি নয়। গৃহযুদ্ধের বিভিন্ন পর্যায়ে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত দেশটির বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীকে প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র দিয়েছে। কিন্তু এসব গোষ্ঠীর মধ্যে বিভক্তি রয়েছে।
ইয়েমেনবিষয়ক বিশ্লেষক মোহাম্মদ আল-বাশা বলেন, হুতিদের মতো শৃঙ্খলাবদ্ধ বাহিনীকে পিছু হটাতে দীর্ঘমেয়াদি অভিযান চালানোর জন্য হুতিবিরোধী অনেক বাহিনী এখনো যথেষ্ট সংগঠিত বা প্রস্তুত নয়। একই সময়ে একাধিক রণাঙ্গনে চাপ সৃষ্টি করে হুতিরা তাদের সামরিক সক্ষমতারও পরীক্ষা নিচ্ছে।
গত শীতকালে ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলের সংযুক্ত আরব আমিরাত-সমর্থিত যোদ্ধারা পূর্বাঞ্চলে নতুন এলাকা দখল ও বিচ্ছিন্নতার পরিকল্পনা ঘোষণা করলে হুতিবিরোধী শিবিরের বিভক্তি আরও স্পষ্ট হয়। কয়েক দফা সংঘর্ষের পর সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর কাছে তারা পরাজিত হয়।
সৌদি সরকারের অবস্থানের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলী শিহাবি বলেন, সম্ভাব্য অভিযানের সাফল্য অনেকাংশে নির্ভর করবে স্থলভাগে ইয়েমেনের বাহিনীগুলোর পারফরম্যান্সের ওপর।
তার মতে, এখন পর্যন্ত অগ্রাধিকার ছিল নিজেদের অবস্থান রক্ষা ও সম্মুখসারি স্থিতিশীল রাখা। তবে এবার তারা আক্রমণাত্মক অবস্থানে যেতে পারে।
সামনে যা হতে পারে
বাব আল-মান্দেবের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারের জন্য সৌদি আরব অভিযান শুরু করলে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ নতুন মাত্রা পেতে পারে। একইসঙ্গে লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রভাব নিয়েও উত্তেজনা বাড়তে পারে।
তবে বড় আকারের স্থল অভিযান চালানো সৌদি আরবের জন্য ঝুঁকিমুক্ত নয়। ইয়েমেনের বিভিন্ন বাহিনীর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব, হুতিদের পাল্টা হামলা এবং সৌদি তেল স্থাপনা ও অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।

