হর্নের বিকট শব্দ শুনলেই দুই হাত দিয়ে শক্ত করে কান চেপে ধরে ছয় বছর বয়সী জারিফ আহমেদ আয়ান। ঢাকার রাস্তায় বের হলেই তীব্র সব আওয়াজ থেকে নিজেকে বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে সে।
শিশুটির প্রতিদিনের লড়াই এমনটাই। সকালে রেডি হয়ে স্কুলের জন্য বের হলেই অসহনীয় কোলাহলের মুখোমুখি হতে হয় আয়ানকে। মায়ের সঙ্গে রিকশায় চড়ে মিরপুর-১০ নম্বরের যানজট পেরিয়ে স্কুলে যায় সে। চারপাশে ঘিরে থাকা বাস, মোটরসাইকেল আর গাড়ির জটলা থেকে অনবরত আসতে থাকে হর্নের বিকট আওয়াজ।
আয়ানের মা রাজ নুসরাত দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘যখনই জোরে হর্ন বাজে, খুব অস্বস্তিতে পড়ে যায় বাচ্চাটা। ভয় পেয়ে দুই কান চেপে ধরে।’
আয়ানদের পুরো প্রজন্মই রাজধানী ঢাকায় এমন ভয়াবহ শব্দদূষণের মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠছে। আইনের সঠিক প্রয়োগ না থাকায় এই সমস্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে এবং স্থায়ী রূপ নিয়েছে।
প্রাপ্তবয়স্কদের অনেকেই হয়তো এই পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছেন, কিন্তু স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন—শিশুরা চাইলেই এই শব্দ এড়িয়ে যেতে পারে না।
যেসব শিশুর শরীর ও মন এখনো বাড়ন্ত, তাদের ওপর এই তীব্র শব্দের আঘাত অনেক গভীরভাবে পড়ে। এটি তাদের মানসিক বিকাশ, আচরণ ও শেখার ক্ষমতার ওপর এমন এক দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলছে, যা সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হতে পারে।
শহরে ক্রমবর্ধমান যানবাহন, নির্মাণকাজ আর কলকারখানার কারণে শব্দদূষণ এখন আর দু-একটি মোড়ে সীমাবদ্ধ নেই। দিন দিন যানবাহনের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনবরত হর্নের শব্দই যেন এই শহরে স্থায়ী রূপ নিয়েছে।
ফার্মগেট ও কারওয়ান বাজারের মতো ব্যস্ত মোড় থেকে শুরু করে মহাখালী-গাবতলীর বাস টার্মিনাল, মতিঝিলের বাণিজ্যিক এলাকা, ধানমন্ডির স্কুল এলাকা কিংবা শাহবাগের হাসপাতাল চত্বর—সবখানেই শব্দের মাত্রা নির্ধারিত সীমা ছাড়িয়ে গেছে।
সরকার বিভিন্ন এলাকার জন্য শব্দের মাত্রা নির্ধারণ করে দিয়েছে। শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা ২০২৫ অনুযায়ী, নীরব এলাকায় ৫০ ডেসিবেল, আবাসিক এলাকায় ৫৫ ডেসিবেল ও বাণিজ্যিক এলাকায় ৭০ ডেসিবেল।
শব্দের তীব্রতা মাপার একক ডেসিবেলের এই সীমা যেমন মেনে চলে না কেউ, তেমনি বাস্তবে এই বিধিমালারও কোনো প্রয়োগ নেই।
স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর অ্যাটমোস্ফেরিক পলিউশন স্টাডিজের (ক্যাপস) ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার কিছু কিছু এলাকায় হঠাৎ তৈরি হওয়া শব্দের মাত্রা ১৩০ ডেসিবেল পর্যন্ত পৌঁছে যায়।
এর অর্থ হলো, একটি বন্দুকের গুলি কানের পাশ দিয়ে চলে গেলে কিংবা খুব কাছেই কোনো জেট ইঞ্জিন চালু হলে যেমন কান ফাটানো আওয়াজ পাওয়া যায়, ঠিক তেমন মাত্রার শব্দ তৈরি হচ্ছে ঢাকার কিছু এলাকায়।
বন্দুকের গুলির শব্দের মাত্রা সাধারণত ১৪০ থেকে ১৬০ ডেসিবেল এবং জেট ইঞ্জিনের শব্দের মাত্রা ১৪০ ডেসিবেল পর্যন্ত হয়।
ক্যাপসের গবেষণায় দেখা গেছে, সচিবালয়, ফার্মগেট, শাহবাগ ও গুলিস্তানসহ রাজধানীর প্রধান প্রধান সড়ক ও মোড়গুলোতে শব্দের মাত্রা নির্ধারিত সীমার চেয়ে অনেক বেশি। আর এই অতিরিক্ত শব্দের প্রধান উৎস হলো যানবাহনের হর্ন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে দিনের বেলা রাস্তায় শব্দের গড় মাত্রা ৫৩ ডেসিবেলের মধ্যে এবং রাতে ৪৫ ডেসিবেলের মধ্যে থাকা উচিত।
বায়ুদূষণের পর শব্দদূষণকে বিশ্বব্যাপী মানবস্বাস্থ্যের জন্য অন্যতম বড় হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে সংস্থাটি।
ডব্লিউএইচওর তথ্য মতে, ২৪ ঘণ্টা ধরে ৭০ ডেসিবেলের বেশি মাত্রার শব্দের মধ্যে থাকলে শ্রবণশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের ২০২৪ সালের মে মাসের তথ্যে দেখা গেছে, শাহবাগকে নীরব এলাকা ঘোষণা করা হলেও, সকালে অফিস শুরুর সময়ে সেখানে প্রতি মিনিটে গড়ে ১৯ বার হর্ন বাজানো হয়। কোনো কোনো স্থানে মাত্র ১০ মিনিটে ৯০০ বারের বেশি হর্নের শব্দ রেকর্ড করা হয়েছে।
শিশুদের ওপর মারাত্মক প্রভাব
শিশুদের কান এই বিকট শব্দ একেবারেই সহ্য করতে পারে না। বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের নবজাতক ও শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মো. মাহবুবুল হক দ্য ডেইলি স্টারের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলেছেন।
তার মতে, উচ্চমাত্রার শব্দের কারণে প্রাপ্তবয়স্কদের চেয়ে শিশুরা অনেক বেশি ঝুঁকিতে থাকে, কারণ তাদের শ্রবণতন্ত্র এবং চিন্তা করার ক্ষমতা এখনো পুরোপুরি বিকশিত হয়নি।
তিনি বলেন, ‘অনবরত এই উচ্চশব্দের মধ্যে থাকলে শিশুদের ঘুম নষ্ট হয়, মেজাজ খিটখিটে হয় এবং মনোযোগের ক্ষমতা কমে যায়। দীর্ঘমেয়াদে এটি শিশুদের শেখার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এডুকেশনাল অ্যান্ড কাউন্সেলিং সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক মাহজাবিন হক বিষয়টি ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘বারবার তীব্র হর্নের শব্দে শিশুদের মনোযোগ নষ্ট হয়। আর একবার মনোযোগ নষ্ট হলে আবার একই কাজে মন বসানো শিশুদের জন্য কঠিন।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রতিটি উচ্চস্বরের শব্দ শিশুকে শুধু সাময়িকভাবে বিভ্রান্তই করে না বরং তার মস্তিষ্ককে নতুন করে কাজ শুরু করতে বাধ্য করে।’
কোনো কিছু বুঝতে বা মনে রাখতে বড়দের চেয়ে ছোটদের বেশি মানসিক শ্রম দিতে হয় উল্লেখ করে মাহজাবিন হক বলেন, ‘সারাদিন ধরে এভাবে বারবার মনোযোগ নষ্ট হলে শিশুদের শেখার ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়।’
মনোযোগের পাশাপাশি অনবরত এই শব্দদূষণ শিশুদের মধ্যে দুশ্চিন্তা, মানসিক চাপ, মাথাব্যথা, ঘুমের ব্যাঘাত ও আচরণগত পরিবর্তন তৈরি করতে পারে বলেও জানান অধ্যাপক মাহজাবিন।
বিশেষ করে ধানমন্ডি, মিরপুর ও মোহাম্মদপুরের মতো যেসব এলাকায় অনেক স্কুল রয়েছে, সেখানে এই সমস্যা আরও প্রকট। স্কুল শুরু ও ছুটির সময়ে এসব এলাকায় তীব্র যানজট তৈরি হয়। সব গাড়িগুলো তখন কে কার আগে যাবে, সে প্রতিযোগিতায় নামে এবং চালকরা অনবরত হর্ন বাজাতে থাকেন।
ধানমন্ডির একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়ুয়া দুই সন্তানের মা শাবনূর সুলতানা বলেন, ‘বেশি চিন্তার বিষয় হলো, এই অতিরিক্ত হর্ন বাজানোটা এখন আমাদের সমাজে স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানুষ এখন আর এটা নিয়ে মাথা ঘামায় না। অথচ প্রতিদিন এর ফলে আমাদের সন্তানদের কত বড় ক্ষতি হচ্ছে, তা কেউ দেখছে না।’
শেরে-বাংলা নগর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. রজব আলী দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘স্কুলের গেটের সামনে যত্রতত্র গাড়ি পার্কিংয়ের কারণে জটলা তৈরি হয়। আর সেই জট ছাড়াতে চালকরা বারবার হর্ন বাজাতে থাকেন। এতে স্কুল শুরু ও ছুটির সময় বাইরের রাস্তাটি শিশুদের জন্য রীতিমতো নরক হয়ে ওঠে।’
উত্তরা আইইএস স্কুল অ্যান্ড কলেজের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী তাইফা হোসেন স্কুল থেকে ফিরে প্রায়ই মাথাব্যথার কথা বলে। তার ছোট ভাইয়েরও একই সমস্যা।
তাদের বাবা স্থপতি মোবারক হোসেন বলেন, ‘আমার দুটি সন্তানই দিন দিন খিটখিটে হয়ে যাচ্ছে এবং রাতে ভালোভাবে ঘুমাতে পারছে না।’
আইন আছে, প্রয়োগ নেই
গত বছরের নভেম্বরে সংশোধিত শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালায় আবাসিক এলাকায় অহেতুক হর্ন বাজানো সীমিত এবং নির্দিষ্ট নীরব এলাকায় রাতে হর্ন বাজানো নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
নিয়ম ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা পুলিশকে দেওয়া হলেও বাস্তবে প্রয়োগ খুবই দুর্বল।
বিশেষজ্ঞরা এ বিষয়ে সতর্ক করে বলেছেন, আইন কেবল কাগজে-কলমে থাকলে সমস্যার সমাধান হবে না। এর পাশাপাশি জনসচেতনতা গড়ে তোলার ওপর জোর দিতে হবে।
অধ্যাপক মাহজাবিন বলেন, ‘শুধু আইন দিয়ে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। মানুষকে বুঝতে হবে যে অহেতুক হর্ন বাজানো শিশুদের স্বাস্থ্য ও মানসিক বিকাশের জন্য কতটা ক্ষতিকর।’
নাগরিকরা নিজেরা তাদের আচরণ পরিবর্তন না করলে এই দূষণ চলতেই থাকবে বলে মনে করেন তিনি।
ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘অতিরিক্ত যানজট এবং সড়কে শৃঙ্খলার অভাবই হর্ন বাজানোর মূল কারণ। তাছাড়া সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশই জানে না যে শব্দের অনুমোদিত মাত্রা কত বা এর বিরুদ্ধে কোথায়-কীভাবে অভিযোগ করতে হবে।’
সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে সব মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থাকে সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে নিয়মগুলো কঠোরভাবে প্রয়োগের ওপর জোর দেন তিনি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘শব্দদূষণ রোধে একটি বড় ধরনের জনসচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন চালুর পরিকল্পনা করছে সরকার।’
এ ছাড়া যানবাহনের হর্ন বাজানো শনাক্ত করতে মোড়গুলোতে স্বয়ংক্রিয় ক্যামেরা বসানোর বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে বলে জানান তিনি। যদিও এক্ষেত্রে খরচ একটি বড় বাধা বলেও উল্লেখ করেন প্রতিমন্ত্রী।
তিনি বলেন, ‘কম খরচে ক্যামেরা কেনার চেষ্টা করছি, পাওয়া গেলেই শহরের ব্যস্ততম মোড়গুলোতে বসানো হবে।’

