সাংবাদিকদের ওপর হামলার প্রতিবাদে রাবিতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মানববন্ধন

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) সাংবাদিক ও শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার প্রতিবাদে মানববন্ধন করেছেন গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। হামলায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তারা।

আজ সোমবার সকাল সাড়ে ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রবীন্দ্র কলা ভবনের সামনে এই কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।

মানববন্ধনে সহযোগী অধ্যাপক কাজী মামুন হায়দার বলেন, ‘আমরা গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে নতুন বাংলাদেশ গড়ার চেষ্টা করেছি। কিন্তু এরপরই দেখছি, গণমাধ্যমের ওপর বড় ধরনের হামলা শুরু হয়েছে। গণমাধ্যম সংস্কারের বদলে সেটাকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়েছে। গণমাধ্যম ধ্বংসের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।’

রোববারের হামলার ঘটনা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ভিডিও দেখলেই বোঝা যায়, কোনো কারণ ছাড়াই তাদের মারধর করা হয়েছে। সাংবাদিকরা তাদের দায়িত্ব পালন করতেই সেখানে গিয়েছিলেন। তাদের নির্মমভাবে পেটানো হয়েছে।’

তিনি বলেন, দুদিন আগে দুপক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা থেকেই রোববারের পরিস্থিতির সূত্রপাত।

এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন মামুন।

এই শিক্ষক বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কি ঘাস কাটছে? একটা ঘটনা ধামাচাপা দিতে আরেকটা ঘটনা সামনে আনা পুরোনো কৌশল। ২০২৪ সালেও এর পরিণতি তারা দেখেছে।’

বিষয়টি দ্রুত সমাধান করা না হলে এর পরিণতি আরও খারাপ হতে পারে, যোগ করেন তিনি।

বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক মোজাম্মেল হোসেন বকুল বলেন, ‘আজ আমাদের শিক্ষার্থীরা রক্তাক্ত। তারা পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে সেখানে গিয়েছিল। দেশীয় অস্ত্র নিয়ে যেভাবে তাদের ওপর হামলা করা হয়েছে এবং গলা চেপে ধরা হয়েছে, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘গণমাধ্যমের ওপর হামলা খুবই গুরুতর বিষয়। ক্যাম্পাসের মতো নিরাপদ জায়গায় যদি এভাবে গণমাধ্যমের ওপর হামলা হয়, তাহলে তা অত্যন্ত অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির জন্ম দেয়।’

হামলায় জড়িতদের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি। একইসঙ্গে তাদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তার এবং অভিযুক্তদের ছাত্রত্ব ও সনদ বাতিলের দাবি বকুল।

অধ্যাপক মশিউর রহমান বলেন, হামলার ভিডিওতে অভিযুক্তদের চেহারা ও কথাবার্তা দেখে বোঝা যায়, এটা কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না।

‘সাংবাদিকদের লক্ষ্য করে মারধর করা হয়েছে। এটাকে শুধু ব্যক্তির ওপর হামলা হিসেবে দেখলে হবে না। এটা তথ্য, গণমাধ্যম, মুক্তচিন্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর হামলা।’

মানববন্ধনে আরও বক্তব্য দেন অধ্যাপক আল মামুন ও অধ্যাপক নাজিয়াত হোসেন চৌধুরী।

রোববার রাত সাড়ে ৮টার দিকে শহীদ জিয়াউর রহমান হলের সামনে সাংবাদিক ও শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার কয়েক ঘণ্টা পর আজকের এ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।

প্রত্যক্ষদর্শী ও ঘটনাস্থলে থাকা সাংবাদিকদের ভাষ্য, বিশ্ববিদ্যালয় শাখা জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা দেশীয় অস্ত্র নিয়ে সাংবাদিক ও শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করেন। এতে চার সাংবাদিকসহ অন্তত ১০ জন আহত হন। 

আহত সাংবাদিকরা হলেন দ্য ডেইলি স্টারের রাবি প্রতিনিধি ও রাজশাহী ইউনিভার্সিটি রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি নূর আহসান মৃদুল, আগামীর সময়ের জাহিদুল ইসলাম, বিডিনিউজ২৪ ডটকমের আরিফুজ্জামান কোরবান ও সমকালের প্রতিনিধি মাইনুল ইসলাম রাজু।

তাদের প্রথমে বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাকেন্দ্রে দেওয়া হয়। পরে তাদের রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়।

হামলার প্রতিবাদে ভোররাত দেড়টার দিকে সাংবাদিক ও শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপউপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. মামুনুর রশীদসহ কয়েকজন কর্মকর্তাকে হল প্রাধ্যক্ষের কার্যালয়ে অবরুদ্ধ করেন। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা এবং সোমবার দুপুরের মধ্যে তাদের গ্রেপ্তারের দাবি জানান তারা।

পরে অধ্যাপক মামুনুর রশীদ আশ্বাস দেন, হল প্রশাসন সোমবার মামলা করবে। বাকি দাবিগুলোও পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

আন্দোলনকারীরা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত অভিযুক্তদের ছাত্রত্ব এবং পড়াশোনা শেষ করা শিক্ষার্থীদের সনদ বাতিলের দাবি জানান। একইসঙ্গে তারা বহিরাগতদের ক্যাম্পাসে প্রবেশ নিষিদ্ধ এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থতার অভিযোগে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও হল প্রাধ্যক্ষের পদত্যাগের দাবি তোলেন।

এদিকে হামলার ঘটনা তদন্তে দুই সদস্যের কমিটি করেছে ছাত্রদল। সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সহসভাপতি এ বি এম ইজাজুল কবির রুয়েল ও মঞ্জুরুল আলম রিয়াদকে নিয়ে কমিটি গঠন করা হয়েছে। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাদের প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

অভিযুক্তদের একজন ও রাবি ছাত্রদলের সহসভাপতি আহসান হাবিব ফেসবুক পোস্টে কোনো ‘নিরপেক্ষ সাংবাদিকের’ ওপর হামলার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

তার দাবি, ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা শহীদ জিয়াউর রহমান হলে গিয়ে হল শাখা ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক ছাত্রলীগ নেতা আরিফুলকে ধরতে গেলে শিবিরের সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন সাংবাদিক ছাত্রদল নেতাকর্মীদের ওপর হামলা করতে আসেন। ছাত্রদল নেতাকর্মীরা কেবল তাদের প্রতিরোধ করেছেন বলে দাবি করেন তিনি।

Related Articles

Latest Posts