মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার মধ্যে হরমুজ প্রণালি আবারও বৈশ্বিক নজরের কেন্দ্রে উঠে এসেছে, আর এর মূল কারণগুলোর একটি হলো সমুদ্র মাইন ব্যবহারের আশঙ্কা।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে মাইন পাতা হতে পারে বা ইতোমধ্যে সীমিত আকারে বসানো হয়েছে।
রয়টার্স ও দ্য গার্ডিয়ান বলছে, এমন আশঙ্কা থেকেই বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছে, কারণ বিশ্বের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জ্বালানি এই সরু প্রণালি দিয়েই পরিবাহিত হয়।
সমুদ্র মাইন মূলত পানির নিচে বা পানির উপরিভাগের কাছাকাছি স্থাপন করা বিস্ফোরক ডিভাইস, যা জাহাজের উপস্থিতি শনাক্ত করে বিস্ফোরিত হতে পারে। এগুলো কখনও সরাসরি স্পর্শে, কখনও আবার জাহাজের শব্দ, পানির চাপের পরিবর্তন কিংবা চৌম্বকীয় ক্ষেত্রের পরিবর্তন শনাক্ত করে সক্রিয় হয়।
আধুনিক মাইনগুলো এতটাই উন্নত যে, নির্দিষ্ট ধরনের জাহাজ শনাক্ত করে বিস্ফোরিত হওয়ার মতো করে প্রোগ্রাম করা যায়, ফলে এগুলো কেবল সামরিক নয়, বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলকেও গুরুতর ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে বলে জানিয়েছে রয়টার্স।
দ্য গার্ডিয়ান ও রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাইন বসানোর কৌশল বা ‘মাইনলেইং’ সাধারণত বহুস্তরীয় পরিকল্পনার অংশ। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, যুদ্ধজাহাজ থেকে সরাসরি মাইন ফেলা সবচেয়ে প্রচলিত পদ্ধতি হলেও এটি একমাত্র নয়। ছোট নৌকা বা বেসামরিক জাহাজ ব্যবহার করেও গোপনে মাইন বসানো সম্ভব, যা শনাক্ত করা কঠিন এবং হরমুজের মতো ব্যস্ত নৌপথে বিশেষভাবে কার্যকর।
সাবমেরিন থেকেও টর্পেডো টিউবের মাধ্যমে মাইন স্থাপন করা হয়, যা শত্রুপক্ষের নজর এড়িয়ে গভীর পানিতে বিস্তৃত এলাকাজুড়ে মাইনফিল্ড তৈরি করতে পারে। আবার বিমান বা হেলিকপ্টার থেকেও দ্রুত বড় এলাকায় মাইন ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব, বিশেষ করে সংকীর্ণ জলপথ অবরুদ্ধ করার ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি কার্যকর বলে আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা বিশ্লেষণগুলোতে উল্লেখ করা হয়েছে।
হরমুজ প্রণালির ক্ষেত্রে এই কৌশলগুলোর গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়, কারণ এটি খুবই সংকীর্ণ এবং বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত জ্বালানি করিডর। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে, যদি এখানে মাইন বসানো হয়, তবে খুব অল্প সংখ্যক মাইন দিয়েই কার্যত পুরো নৌপথ অচল করে দেওয়া সম্ভব।
এমনকি মাইন থাকার গুজব বা আশঙ্কাই জাহাজ চলাচল ব্যাহত করতে পারে, বীমা খরচ বাড়িয়ে দিতে পারে এবং বৈশ্বিক তেলের বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে বলেও জানিয়েছে রয়টার্স।
মাইন কীভাবে কাজ করে, সেটিও এই আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ। কিছু মাইন সরাসরি জাহাজের সঙ্গে ধাক্কা লাগলে বিস্ফোরিত হয়, যাকে কন্ট্যাক্ট মাইন বলা হয়। আবার অনেক মাইন জাহাজের ইঞ্জিনের শব্দ, পানির নিচে চাপের পরিবর্তন বা ধাতব কাঠামোর কারণে সৃষ্ট চৌম্বকীয় ক্ষেত্র শনাক্ত করে বিস্ফোরিত হয়। এগুলোকে ইনফ্লুয়েন্স মাইন বলা হয়।
আরও উন্নত ‘স্মার্ট মাইন’ নির্দিষ্ট সময় অপেক্ষা করতে পারে, নির্দিষ্ট সংখ্যক জাহাজ পার হওয়ার পর সক্রিয় হতে পারে, কিংবা শুধু নির্দিষ্ট ধরনের জাহাজকেই লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বেছে নিতে পারে, যা এগুলোকে আরও বিপজ্জনক করে তোলে।
অন্যদিকে, সমুদ্র থেকে মাইন সরানো বা ‘মাইন ক্লিয়ারেন্স’ অনেক বেশি জটিল ও সময়সাপেক্ষ। আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বারবার বলা হচ্ছে, একটি মাইন বসাতে যে পরিমাণ খরচ ও সময় লাগে, তা সরাতে তার বহুগুণ বেশি সম্পদ প্রয়োজন হয়।
মাইন অপসারণের সবচেয়ে পুরোনো পদ্ধতি হলো ‘মাইনসুইপিং’, যেখানে বিশেষ জাহাজ পানিতে তার বা যন্ত্র টেনে নিয়ে মাইনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে বা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে তা নিষ্ক্রিয় করে। তবে আধুনিক মাইনগুলোর ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি সবসময় কার্যকর নয়।
এ কারণে এখন ‘মাইনহান্টিং’ পদ্ধতি বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে, যেখানে উন্নত সোনার প্রযুক্তি দিয়ে পানির নিচে প্রতিটি মাইন আলাদাভাবে শনাক্ত করা হয়। এরপর ডুবুরি বা রিমোট-নিয়ন্ত্রিত আন্ডারওয়াটার ভেহিকল (আরওভি) পাঠিয়ে সেটিকে নিষ্ক্রিয় করা বা নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণের মাধ্যমে ধ্বংস করা হয়।
রয়টার্স ও দ্য গার্ডিয়ানের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্র দেশগুলো ইতোমধ্যে হরমুজ প্রণালিতে ড্রোন ও রোবোটিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে মাইন শনাক্ত ও অপসারণের প্রস্তুতি জোরদার করেছে।
তবে বাস্তবতা হলো, এই পুরো প্রক্রিয়া অত্যন্ত ধীর এবং ঝুঁকিপূর্ণ। একটি বড় জলপথ সম্পূর্ণভাবে ‘নিরাপদ’ ঘোষণা করতে দীর্ঘ সময় লাগে এবং এই সময়ের মধ্যেই বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয়। হরমুজ প্রণালির মতো জায়গায়, যেখানে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ তেল পরিবাহিত হয়, সেখানে অল্প সময়ের জন্যও মাইন আতঙ্ক বৈশ্বিক বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণে স্পষ্ট, সমুদ্র মাইন আধুনিক যুদ্ধের একটি ‘লো-কস্ট, হাই-ইমপ্যাক্ট’ অস্ত্র। এটি সরাসরি সংঘর্ষ ছাড়াই প্রতিপক্ষের অর্থনীতি, জ্বালানি সরবরাহ এবং সামরিক চলাচল ব্যাহত করতে পারে।
হরমুজ প্রণালিতে বর্তমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এই বাস্তবতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ফলে প্রশ্ন এখন শুধু মাইন পাতা হয়েছে কি না, তা নয় বরং এই আশঙ্কাই যে বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও অর্থনীতিকে কীভাবে প্রভাবিত করছে, সেটিই হয়ে উঠেছে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের।

