‘সদ্যবিদায়ী’ মানবাধিকার কমিশনারদের খোলা চিঠি, আইনমন্ত্রী বললেন ‘ভুল ব্যাখ্যা’

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশ বাতিল হওয়ায় একটি খোলা চিঠি দিয়েছেন ‘সদ্যবিদায়ী’ কমিশনাররা। এতে ‘সংসদে উপস্থাপিত ভুল তথ্যের জবাব’, ‘সরকারের প্রকৃত আপত্তি’ ও ‘ভবিষ্যৎ আইনের গুণগত মান নিয়ে প্রস্তাবনা’ শীর্ষক তিনটি অংশ রয়েছে।    

এদিকে, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান দ্য ডেইলি স্টারকে বলেছেন, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশে শাস্তি-সংক্রান্ত বিষয়ে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের কয়েকজন সদস্য খোলা চিঠিতে যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা সম্পূর্ণ ভুল।

আজ সোমবার এ খোলা চিঠি দেওয়া হয়। এতে সই করেন কমিশনের চেয়ারম্যান বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী, সদস্য নুর খান, ইলিরা দেওয়ান, মো. শরিফুল ইসলাম ও নাবিলা ইদ্রিসের।  

চিঠিতে বলা হয়, সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশগুলো সংসদে পাস না হওয়ায়, ভুক্তভোগীরা আমাদের বারবার প্রশ্ন করছেন—‘এখন আমাদের কী হবে?’ তাদের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই এই খোলা চিঠি। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা ব্যক্তিস্বার্থে নয়, ভুক্তভোগীদের প্রতি কর্তব্যবোধ থেকে আজ আমরা কলম হাতে নিয়েছি।

এতে বলা হয়, অধ্যাদেশগুলো বাতিলের পক্ষে সংসদে বেশকিছু ভুল তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশকে মূল আইন উল্লেখ করে বলা হয়, এর ওপর ভিত্তি করেই গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থান সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ অধ্যাদেশ প্রণীত হয়েছিল। ফলে আলোচ্য তিনটি অধ্যাদেশ পরস্পর অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত।

প্রথমত, সংসদে বলা হয়েছে—গুমের সাজা মাত্র ১০ বছর, যা ভুক্তভোগীদের জন্য অবিচার।

বাস্তবে, মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশে অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ড, যাবজ্জীবনসহ বিভিন্ন মেয়াদের সাজা ও জরিমানার বিধান রয়েছে।

দ্বিতীয়ত, সংসদে বলা হয়েছে—তদন্তের সময়সীমা ও জরিমানা আদায়ের উপায় নেই।

চিঠিতে বলা হয়, মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশে তদন্তের নির্দিষ্ট সময়সীমা ও জরিমানা আদায়ের পদ্ধতি স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে। সময়মতো তদন্ত প্রতিবেদন না দিলে শাস্তির বিধানও রাখা হয়েছে। বরং পুনর্বহালকৃত ২০০৯ সালের আইনে এগুলো কিছু নেই।

তৃতীয়ত, সংসদে বলা হয়েছে—আইসিটি আইনই যথেষ্ট এবং গুম অধ্যাদেশ আইসিটি আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

বাস্তবে, আইসিটি আইন কেবল মানবতাবিরোধী অপরাধ বিচার করতে পারে, ফৌজদারি অপরাধ নয়। কোনো অপরাধ মানবতাবিরোধী হিসেবে গণ্য হতে হলে তা ব্যাপক বা পদ্ধতিগত হতে হয়, অনেকটা হত্যা আর গণহত্যার পার্থক্যের মতো। তাই আইসিটি ‘বিচ্ছিন্ন’ গুমের বিচার করতে পারে না, শুধু ‘গণহারে’ গুমের বিচার করতে পারে।

সংসদে বলা হয়েছে—আইনে এ বিষয়ে ‘অ্যাম্বিগুইটি’ আছে, যা সঠিক নয়। গুম অধ্যাদেশও বলে যে ব্যাপক বা পদ্ধতিগত গুমের বিচার আইসিটির এখতিয়ারাধীন।

দুটি আইন ‘ম্যাচিং’ করার উদ্দেশ্যে অধ্যাদেশ বাতিল হয়েছে। যেহেতু ‘বিচ্ছিন্ন গুম’ আর ‘গণহারে গুম’ ভিন্ন অপরাধ, আইন ‘ম্যাচিং’ করার কোনো অবকাশ নেই।

চিঠিতে আরও বলা হয়, অধ্যাদেশ বাতিল হওয়ার ফলে ১১ এপ্রিলের পর সংঘটিত নতুন কোনো গুম ফৌজদারি আইনে স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত থাকছে না, ফলে ভুক্তভোগীরা কার্যকর প্রতিকার পাবেন না।

সংসদে জুলাই যোদ্ধাদের সুরক্ষা নিশ্চিত হয়েছে বলে দাবি করা হলেও কমিশনাররা বলেন, অধ্যাদেশ অনুযায়ী রাজনৈতিক প্রতিরোধে সংঘটিত মৃত্যুর ক্ষেত্রে সুরক্ষা থাকলেও বিশৃঙ্খলার সুযোগে সংঘটিত হত্যার ক্ষেত্রে তদন্ত প্রয়োজন ছিল, যা মানবাধিকার কমিশন করতো। কিন্তু পুনর্বহাল করা ২০০৯ আইনে নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তের ক্ষমতা কমিশনের নেই।  

তারা বলেন, কমিশন তদন্ত করে আবার নিজেই বাদী হওয়া পক্ষপাতমূলক, এমন অভিযোগও সঠিক নয়। তদন্তকারী পুলিশও নিয়মিত বাদী হয়, কিন্তু বিচারকের ভূমিকা পালন করে না; কমিশনের ক্ষেত্রেও একই কাঠামো প্রযোজ্য ছিল।

এছাড়া ২০০৯ ও ২০২৫ আইনকে সমান স্বায়ত্তশাসিত বলা হলেও বাস্তবে ২০০৯ আইনে কমিশনের কার্যকর তদন্ত ক্ষমতা সীমিত বলে উল্লেখ করা হয়।

সংসদীয় বিশেষ কমিটির প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে কমিশনাররা বলেন, সরকারের আপত্তির মূল লক্ষ্য ছিল কমিশনের আইনি স্বাধীনতা সীমিত করা।

প্রথমত, কমিশনকে মন্ত্রণালয়ের অধীন রাখার প্রস্তাব কমিশনের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতার পরিপন্থী। অধ্যাদেশ অনুযায়ী কমিশন রাষ্ট্রপতি, প্রধান বিচারপতি, অডিটর জেনারেল ও নাগরিক সমাজের কাছে জবাবদিহি করতো। কিন্তু ২০০৯ আইনে কমিশন কার্যত আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনে ফিরে গেছে।

দ্বিতীয়ত, নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে তদন্তে সরকারের পূর্বানুমতির দাবি। কমিশনাররা বলেন, সরকারি বাহিনী অভিযুক্ত হলে সরকারের অনুমতিক্রমে তদন্ত কার্যকর হতে পারে না।

তৃতীয়ত, জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে আটককে গুমের সংজ্ঞা থেকে বাদ দেওয়ার প্রস্তাব সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৩(২)-এর সঙ্গে অসঙ্গত। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আদালতে হাজির করা হলে সেটি গুম নয়, এ বিধান ইতোমধ্যে সংবিধানেই নির্ধারিত।

চতুর্থত, বাছাই কমিটিতে সরকারি প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর ফলে কমিশনার নিয়োগে দলীয়করণের ঝুঁকি বাড়বে বলে শঙ্কা প্রকাশ করা হয়।  

চিঠিতে আরও বলা হয়, সরকারের বক্তব্যে একটি মৌলিক অন্তর্দ্বন্দ্ব রয়েছে। একদিকে শক্তিশালী আইন তৈরির কথা বলা হচ্ছে, অন্যদিকে বিশেষ কমিটিতে উত্থাপিত আপত্তিগুলো মানলে আইন অনিবার্যভাবে দুর্বল হয়ে পড়বে।  

কমিশনাররা বলেন, অধ্যাদেশ প্রণয়নের আগে ৬০০-এর বেশি অংশীজন পরামর্শ প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়েছিলেন, যার মধ্যে প্রধান রাজনৈতিক দলের নেতারাও ছিলেন। অধ্যাদেশ বাতিল না করেও সংশোধনের সুযোগ ছিল।  

এতে আরও বলা হয়, গুমবিষয়ক আন্তর্জাতিক সনদ আইসিপিপিইডি’তে স্বাক্ষরের কারণে রাষ্ট্র গুমকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করতে বাধ্য। ভবিষ্যতে সরকার যদি নতুন আইন প্রস্তাব করেও ভুক্তভোগীরা একটি বিষয়ে নজর রাখবে—সরকারের নথিভুক্ত আপত্তিগুলো মেনে নিয়ে কি আইনকে দুর্বল করা হচ্ছে, নাকি সেই আপত্তিগুলো প্রত্যাখ্যান করে অধ্যাদেশগুলোর চেয়েও শক্তিশালী আইন আনা হচ্ছে?

গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (রহিতকরণ ও পুনঃপ্রচলন) বিল কণ্ঠভোটে পাস হয়। ওই অধ্যাদেশ বাতিল হওয়ায় আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০০৯ সালে প্রণীত ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন’ পুনরায় চালু হলো।

জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, তারা যা বলেছেন, তা সম্পূর্ণ ভুল ব্যাখ্যা। আপনি যদি আইনটি দেখেন, সেখানে স্পষ্টভাবে বলা আছে, শাস্তি হতে পারে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ১০ বছর। 

‘এখন সর্বোচ্চ ১০ বছর বলতে কী বোঝায়? এর অর্থ ১০ বছরের বেশি নয়। সুতরাং সর্বোচ্চ ১০ বছর মানে আদালতের এখতিয়ার আছে এক ঘণ্টা, একদিন, এক মাস বা এই সীমার মধ্যে যেকোনো সময়ের শাস্তি দেওয়ার। তাহলে এটি (আমার বক্তব্য) কীভাবে পরস্পরবিরোধী হয়?’

আইনমন্ত্রী বলেন, তারা বিষয়টি স্পষ্টভাবে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। আমি সব সংবাদ সম্মেলনে বলেছি, একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে হবে। কিন্তু প্রতিবেদন পাওয়ার পর সিদ্ধান্ত নিতে কত সময় লাগবে, সে বিষয়ে কোনো নির্দেশনা নেই।

খোলা চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে সংসদে দেওয়া বক্তব্যের বিষয়ে আপনি কোনো লিখিত জবাব প্রস্তুত বা পাঠিয়েছেন কি না জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, তাদের উত্থাপিত বিষয়গুলো ভুল ধারণার ওপর, সঠিক নয়।

তিনি বলেন, আমি কেন তাদের লিখিত জবাব দেবো? জবাব দেওয়ার প্রয়োজন নেই। আমি মনে করি, দেশের মানুষ বিষয়টি বুঝতে পারে।

তিনি আরও বলেন, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশের চার ধারাতেই বলা আছে, শাস্তি হবে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ১০ বছর। ‘সর্বোচ্চ ১০ বছর’ স্পষ্টভাবে ‘১০ বছরের বেশি নয়’—এই অর্থই বোঝায়।

 

 

 

Related Articles

Latest Posts