পর্যটন মৌসুম শুরুর আগেই সেন্টমার্টিন দ্বীপের উপকূলে দেখা মিলছে প্রচুর পরিমাণে পরিত্যক্ত প্লাস্টিকের বোতল ও অন্যান্য প্লাস্টিক বর্জ্য। এসব প্লাস্টিকের বোতলে থাকা লেবেল দেখে ধারণা করা হচ্ছে, মিয়ানমার ও থাইল্যান্ড থেকে সেগুলো ভেসে এসেছে। যা বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপটির আশপাশে আন্তসীমান্ত সামুদ্রিক দূষণ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
টেকনাফ উপকূল থেকে প্রায় ৯ কিলোমিটার দূরে সেন্টমার্টিনের অবস্থান। সম্প্রতি সেখানকার কিছু বাসিন্দা দ্বীপটির সর্বদক্ষিণের অংশ ছেঁড়া দ্বীপে গিয়ে সৈকতজুড়ে বিপুল পরিমাণ পরিত্যক্ত প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিন ও অন্যান্য বর্জ্য জমে থাকতে দেখেন। অথচ, পর্যটন মৌসুম এখনো শুরু হয়নি।
তার বর্জ্যগুলো কাছ থেকে পরীক্ষা করে দেখতে পান, অধিকাংশ বোতলই বাংলাদেশের বাইরে থেকে এসেছে বলে মনে হচ্ছে। এসব বোতলের লেবেলে মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নাম ও লোগো রয়েছে।
বাসিন্দাদের ধারণা, এসব প্লাস্টিকসামগ্রী ওই দুই দেশের যেকোনো একটি থেকে আসতে পারে।
ওই এলাকা পরিদর্শনকারীদের একজন সেন্টমার্টিনের মারমেইড রিসোর্টের মালিক তায়েব উল্লাহ। দ্য ডেইলি স্টারকে তিনি বলেন, ‘দ্বীপে কোনো পর্যটক নেই। তারপরও এত পরিমাণ প্লাস্টিক বর্জ্য দেখে আমরা বিস্মিত। এত বর্জ্য কোথা থেকে এল?’
উপকূলীয় কেয়াবনেও একই ধরনের বর্জ্য দেখেছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বোতল ও অন্যান্য প্লাস্টিক বর্জ্যের গায়ের লেবেল ও লেখা দেখে আমাদের ধারণা, এগুলো মিয়ানমার বা থাইল্যান্ড থেকে এসেছে। বর্ষার প্রবল স্রোত ও দক্ষিণা বাতাসের কারণে এগুলো সেন্টমার্টিনে আসতে পারে।’
তার ভাষ্য, এ পরিস্থিতি দেখিয়ে দিচ্ছে, পরিবেশ রক্ষায় স্থানীয়ভাবে নানা উদ্যোগ নেওয়া সত্ত্বেও প্রতিবেশী দেশগুলোর দূষণ সেন্টমার্টিনের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
সেন্টমার্টিনে ব্র্যাকের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মসূচির সমন্বয়ক মোহাম্মদ রফিক জানান, তাদের স্বেচ্ছাসেবকেরা দ্বীপের আবাসিক এলাকা থেকে প্রতিদিন প্রায় এক টন বর্জ্য সংগ্রহ করেন। পরবর্তীতে সেগুলো বিভিন্ন শ্রেণি অনুযায়ী আলাদা করা হয় এবং সেই অনুযায়ী ব্যবস্থাপনা করা হয়।
তিনি রফিক বলেন, ‘দ্বীপের যেসব জায়গায় স্থানীয়রা বসবাস করেন, সেখানে আমরা অন্য দেশ থেকে আসা বর্জ্য পাইনি। তবে ছেঁড়া দ্বীপের কাছে সৈকত পরিষ্কার অভিযান চালানোর সময় এ ধরনের বর্জ্য পেয়েছি। এটি সত্যিই উদ্বেগজনক।’
কক্সবাজারে পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা জানান, প্লাস্টিকের বোতলগুলোর গায়ে থাকা কয়েকটি লোগো তিনি অনলাইনে খুঁজে দেখেছেন। এতে দেখা গেছে, কয়েকটি লোগো থাইল্যান্ডের কোমল পানীয় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের।
তিনি বলেন, ‘কিছু প্যাকেটের গায়েও বিদেশি ভাষায় লেখা রয়েছে, যেগুলো মিয়ানমারের বলে মনে হচ্ছে।’
মাহমুদ পাশা বলেন, ‘এটি অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়। আমরা পর্যটন সীমিত করছি, সৈকত পরিষ্কারে অভিযান চালাচ্ছি এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করেছি সেন্টমার্টিন দ্বীপের দূষণ কমানোর লক্ষ্যে। অথচ অন্য দেশ থেকে আসা বর্জ্যও আমাদের একমাত্র প্রবাল দ্বীপটিকে দূষিত করছে।’
তিনি বলেন, এত বিপুল পরিমাণ বর্জ্য যদি উপকূলে এসে পৌঁছায়, তাহলে সমুদ্রের তলদেশেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ প্লাস্টিক জমা হতে পারে।
‘সমুদ্রের তলদেশে এভাবে বর্জ্য জমতে থাকলে প্রবালের ক্ষতি করতে পারে এবং সেন্টমার্টিনের জীববৈচিত্র্যের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে। দ্বীপের দূষণ কমাতে আমরা কাজ করছি। কিন্তু, এখন আন্তসীমান্ত দূষণ মোকাবিলায় যথাযথ পরিকল্পনা প্রণয়ন করাও জরুরি হয়ে উঠছে’, যোগ করেন তিনি।
সামুদ্রিক বর্জ্যের উৎস ও ব্যাপকতা নির্ধারণে যথাযথ মূল্যায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করে মাহমুদ পাশা বলেন, ‘এই মূল্যায়নের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।’

