ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের স্থায়ী অবসানের লক্ষ্যে শান্তি আলোচনায় অংশ নিতে আজ রোববার সুইজারল্যান্ডে পৌঁছেছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স।
তবে আলোচনার প্রাক্কালে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি বন্ধের ইরানি দাবিকে ঘিরে দুই দেশের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে বলে জানিয়েছে রয়টার্স।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আলোচনা চলাকালে ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান সম্মত হলেও শনিবার ইরানের ইসলামিক রেভ্যুলেশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) ঘোষণা দেয় যে, হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তবে মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, বাণিজ্যিক জাহাজগুলো এখনও ওই নৌপথ ব্যবহার করে চলাচল করছে।
এই পরিস্থিতি প্রায় চার মাসের যুদ্ধের অবসানে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় হওয়া অন্তর্বর্তী চুক্তি বাস্তবায়নের প্রচেষ্টাকে জটিল করে তুলতে পারে। গত বুধবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ওই চুক্তিতে সই করেন।
আইআরজিসি অভিযোগ করেছে, লেবাননে ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড যুদ্ধবিরতির বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি লঙ্ঘন করেছে। তারা সতর্ক করে বলেছে, হরমুজ প্রণালির কাছে এলে জাহাজগুলো ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
তবে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের দাবি, শনিবার ৫৫টি বাণিজ্যিক জাহাজ প্রণালিটি অতিক্রম করেছে, যেগুলোতে ১ কোটি ৭০ লাখ ব্যারেলের বেশি তেল বিশ্ববাজারে পাঠানো হচ্ছিল।
হরমুজ ও লেবাননই আলোচনার প্রধান বাধা
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল অব্যাহত রাখতে যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি চলাকালে বা এর পর হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াতে কোনো টোল আরোপ করা হবে না। তবে শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হলে যুক্তরাষ্ট্র টোল আরোপের বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে ‘অভিভাবক’ হিসেবে উল্লেখ করে সম্ভাব্য টোল আদায়ের কথা বলেন।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির উপদেষ্টা মোহাম্মদ মোখবার অভিযোগ করেন, ১৪ দফা অন্তর্বর্তী চুক্তির প্রথম শর্ত—সব ফ্রন্টে যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়নে যুক্তরাষ্ট্র ব্যর্থ হয়েছে।
তিনি বলেন, চুক্তি কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকলে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক হবে না।
এদিকে লেবাননে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও পরিস্থিতি ভঙ্গুর রয়ে গেছে। ইসরায়েলি বাহিনী ও ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ পরস্পরের বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ করেছে।
দুই পক্ষের প্রতিনিধিদল
ইরানের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। দলে রয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি, নিরাপত্তা, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও তেল খাতের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা।
অন্যদিকে মার্কিন প্রতিনিধি দলে ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্সের পাশাপাশি রয়েছেন দূত স্টিভ উইটকফ এবং ট্রাম্পের জামাতা জারেড কুশনার।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, অতীতে চুক্তি বাস্তবায়নে ব্যর্থতার অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার তেহরান প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের ওপর জোর দেবে।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশটির প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এবং সেনাপ্রধান সৈয়দ আসিম মুনির আলোচনার এই পর্বে অংশ নেবেন।
সুইজারল্যান্ডে রওনা হওয়ার আগে ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ভ্যান্স বলেন, যুদ্ধবিরতি টিকে থাকবে বলে তিনি আশাবাদী এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধ রয়েছে—এমন কোনো প্রমাণ তিনি দেখেননি।
তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘সম্ভবত কয়েক দিন আলোচনা চলবে। আমরা আশা করছি পারমাণবিক ইস্যুতে অগ্রগতি হবে, একইসঙ্গে লেবানন যুদ্ধবিরতির বিষয়েও অগ্রগতি হবে।’
লেবাননে উত্তেজনা অব্যাহত
লেবাননে যুদ্ধ বন্ধ করা ছিল যুক্তরাষ্ট্র-ইরান পারমাণবিক আলোচনা শুরুর অন্যতম শর্ত। কিন্তু যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই শনিবার ইসরায়েলি হামলায় ২০ জন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে লেবাননের সিভিল ডিফেন্স।
ইসরায়েলের দাবি, তারা হিজবুল্লাহর হামলার জবাব দিয়েছে। অন্যদিকে হিজবুল্লাহ বলেছে, তারা লেবাননে ইসরায়েলকে ‘অবাধ চলাচলের সুযোগ’ দেবে না।
ইসরায়েল জানিয়েছে, তারা যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তির পক্ষ নয় এবং লেবাননে নিজেদের দখলকৃত অবস্থান বজায় রাখবে। দেশটির সামরিক বাহিনী বলেছে, তারা যুদ্ধবিরতি মেনে চললেও ইসরায়েল বা তাদের সেনাদের জন্য হুমকি মনে হলে ব্যবস্থা নিতে দ্বিধা করবে না।
ইসরায়েলের সম্প্রচারমাধ্যম চ্যানেল ১২ জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ সেনাবাহিনীকে লেবাননে গোলাবর্ষণ বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন, তবে দখল করা এলাকা থেকে সরে আসার নির্দেশ দেননি।
এদিকে হিব্রু ইউনিভার্সিটি অব জেরুজালেমের এক জরিপে দেখা গেছে, ৯২ শতাংশ ইসরায়েলি মনে করেন, ইসরায়েল-যুক্তরাষ্টের যৌথ সামরিক অভিযানে ইরানই বেশি লাভবান হয়েছে। মাত্র ৮ শতাংশ মনে করেন, ইসরায়েল বিজয়ী হয়েছে। প্রায় ৯০ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, যুদ্ধের লক্ষ্য অর্জিত হয়নি এবং ৭০ শতাংশের বেশি মানুষ নেতানিয়াহুর ‘বড় সাফল্য’ সংক্রান্ত দাবিতে আস্থা রাখেন না।
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২ মার্চ থেকে ইসরায়েলি হামলায় দেশটিতে ৪ হাজার ৫৭ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে চিকিৎসাকর্মী, নারী ও শিশুরাও রয়েছেন।
অন্যদিকে ইসরায়েল জানিয়েছে, হিজবুল্লাহর সঙ্গে সংঘর্ষে তাদের অন্তত ৩২ সেনা ও চার বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন।

