লৌহজং: বৃহত্তর ঢাকার মিষ্টির রাজধানী

বৃহত্তর ঢাকার মুন্সীগঞ্জ জেলার লৌহজং উপজেলা, ইতিহাসে যা ‘বিক্রমপুর’ নামে পরিচিত। অনেকেই হয়তো পুরোনো মাওয়া বা শিমুলিয়া ঘাটে ইলিশ খেতে এক্সপ্রেসওয়ে দিয়ে সেখানে গেছেন। কিন্তু পুরোনো ঘাট থেকে একটু ভেতরের দিকে গেলেই যে শান্ত-স্নিগ্ধ লৌহজংয়ের দেখা মেলে, তা হয়তো অনেকেরই অজানা। এই লৌহজংয়ের পরতে পরতে মিশে আছে মিষ্টির স্বাদ।

লৌহজংয়ের আকর্ষণ কেবল ইলিশেই সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে মিশে আছে প্রাচীন নদীমাতৃক খাদ্যাভ্যাস, পাল রাজবংশের ঐতিহ্য এবং মোগল ও ফারসি সংস্কৃতির গভীর প্রভাব।

ঢাকা থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে পদ্মা সেতুর কাছেই অবস্থিত লৌহজং বৃহত্তর ঢাকার ‘মিষ্টির রাজধানী’ হিসেবে পরিচিত। এখানকার মিষ্টি একদম টাটকা, খাঁটি এবং বিক্রমপুরের ঐতিহ্যে ভরপুর। ভিড় এড়িয়ে আসল স্বাদ খুঁজতে যারা হাইওয়ে থেকে একটু ভেতরের দিকে আসেন, এখানকার মিষ্টি তাদের বারবার টেনে আনে।

এখানকার ময়রারা কেবল মিষ্টির কারিগর নন, তারা একেকজন রসনাশিল্পী। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে এই শিল্প তারা টিকিয়ে রেখেছেন। শত শত বছর ধরে তারা দুধের তৈরি নানা রকম মিষ্টি বানানোর এই শিল্পকে নিখুঁত করেছেন। তারা এতটাই দক্ষ যে—দুধ থেকে ঠিকঠাক ছানা হচ্ছে কি না, তা তারা শুধু দেখেই বা ছুঁয়েই বলে দিতে পারেন। দুই আঙুলের মাঝে চিনির সিরার আঠালো ভাব দেখেই বুঝতে পারেন সঠিক ঘনত্ব। খোলা ইটের চুলায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা নাড়াচাড়া করে তারা মিষ্টির সঠিক টেক্সচার নিয়ে আসেন।

ময়রাদের মুখে মুখে শেখা জ্ঞান আর সহজাত দক্ষতা থেকেই তৈরি হয় ঐতিহ্যবাহী ‘পাতক্ষীর’, যা ইতিমধ্যে জিআই (ভৌগোলিক নির্দেশক) স্বীকৃতি পেয়েছে।

পাতক্ষীর লৌহজংয়ের মিষ্টির সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। শীতকালে এর চাহিদা বহুগুণ বেড়ে যায়, কারণ, পাটিসাপটা পিঠার প্রাণ হলো এই পাতক্ষীর। আর গরমকালে এটি খাওয়ার আনন্দটাই অন্য রকম—আম-দুধের সঙ্গে পাতক্ষীর মিশিয়ে তার ওপর একমুঠো মুড়ি ছড়িয়ে দিলে যে স্বাদ তৈরি হয়, তা ভোলা প্রায় অসম্ভব। যারা একবার খেয়েছেন তারা সবাই এটা জানেন। 

তবে স্থানীয়দের মতে, সকালে এক কাপ কড়া লাল চায়ের সঙ্গে একদম টাটকা পাতক্ষীর খাওয়ার মজাই আলাদা।

লৌহজংয়ের হালদা বাজারের ‘শ্রী দুর্গা মিষ্টান্ন ভান্ডার’ নামের দোকানটি মিষ্টিপ্রেমীদের কাছে ভীষণ জনপ্রিয়। পুরোনো মাওয়া ঘাট থেকে এটি মাত্র ১০-১৫ মিনিটের পথ। টিনের চালের এই দোকানটি চালান গণেশ ঘোষ ও তার ছেলে। তারা বংশপরম্পরায় ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন।

গণেশ ঘোষ তার পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে হাতে-কলমে এই কাজ শিখেছিলেন। সরাসরি হাঁড়ি থেকে তুলে দেওয়া তার গরম গরম রসগোল্লা ভোজনরসিকদের মুগ্ধ করে। দুধের ছানার নরম, সাদা গোল্লাগুলো চিনির সিরার মধ্যে গলে যায়। একসময় শুধু তাদের পরিবারের মধ্যেই এই কাজ সীমাবদ্ধ ছিল, কিন্তু এখন গণেশ ঘোষের কাছে কাজ শেখা মুসলিম ময়রাদের হাত ধরেও লৌহজংয়ের এই ঐতিহ্য দূরদূরান্তে ছড়িয়ে পড়ছে।

ঘোষের রসগোল্লা তৈরি হয় নদীমাতৃক এলাকার গরুর ঘন দুধ দিয়ে। ফলে রসগোল্লাগুলো হয় নরম। গাঢ় সিরায় ডোবানো থাকলেও অতিরিক্ত মিষ্টি লাগে না। এগুলো স্পঞ্জ রসগোল্লার চেয়ে একেবারেই আলাদা। এই ভিন্নতা মনে করিয়ে দেয় যে কীভাবে স্থানীয় দুধের মান এবং ময়রাদের দক্ষতা একটি মিষ্টির গঠন ও স্বাদে পার্থক্য গড়ে দেয়।

১৮৬৮ সালে ময়রা নবীন চন্দ্র দাস কলকাতার স্পঞ্জ রসগোল্লা জনপ্রিয় করে তোলেন। সেখানে ছানার সঙ্গে কিছুটা সুজি মেশানো হয়, যাতে এটি চিনির সিরা ধরে রাখতে পারে এবং কামড় দিলে স্পঞ্জের মতো আবার আগের রূপে ফিরে আসে। নিখুঁত সাদা, গোলাকার এবং এখন ‘বাংলার রসগোল্লা’ হিসেবে জিআই স্বীকৃতি পাওয়া এই মিষ্টিটি মূলত এর স্পঞ্জি ভাবের জন্যই পরিচিত।

ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ে থেকে ১০ মিনিটের জন্য একটু পথ পালটে লৌহজংয়ে ঢুকলে যে কাউকে মিষ্টির দুনিয়ায় হারিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতেই হবে। এখানকার ঘোষের রসগোল্লা এড়িয়ে যাওয়া খুব কঠিন। এই স্বাদ নিতে গিয়ে কিছু বুঝে ওঠার আগেই হয়তো পাঁচ-ছয়টি রসগোল্লা শেষ হয়ে যাবে!

Related Articles

Latest Posts