এক যুগেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। তবু পেপ গার্দিওলার সেই বার্সেলোনা নিয়ে আলোচনা যেন থামছেই না। নেগ্রেইরা কাণ্ডে রিয়াল মাদ্রিদ উয়েফার কাছে নতুন করে নথি জমা দেওয়ার পর মেসি-জাভি-ইনিয়েস্তাদের সেই অপ্রতিরোধ্য দলটিই আবার উঠে এসেছে আলোচনায়। প্রশ্ন উঠছে, চলমান তদন্তের শেষ পরিণতি কি গার্দিওলার সোনালি যুগের অর্জনগুলোকেও নতুন করে বিতর্কের মুখে ফেলবে?
তবে শুরুতেই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি পরিষ্কার, গার্দিওলাকে কোনো ধরনের অনিয়মের সঙ্গে জড়ানো হয়নি। এমনকি রিয়ালের নতুন নথি জমা দেওয়ার পর বার্সেলোনার বিরুদ্ধেও উয়েফা নতুন কোনো মামলা শুরু করেনি। উয়েফা শুধু জানিয়েছে, রিয়াল মাদ্রিদের কাছ থেকে তারা ‘উল্লেখযোগ্য পরিমাণ’ নথি পেয়েছে এবং চলমান পর্যালোচনার অংশ হিসেবে সেগুলো তাদের তদন্তকারীরা যাচাই করবেন।
নেগ্রেইরা কাণ্ডের কেন্দ্রে রয়েছে বার্সেলোনার করা অর্থপ্রদান। ২০০১ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে স্পেনের রেফারিং কমিটির সাবেক সহসভাপতি হোসে মারিয়া এনরিকেস নেগ্রেইরার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ৭০ লাখ ইউরোর বেশি অর্থ দিয়েছিল বার্সেলোনা। স্পেনে বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চলছে। পাশাপাশি ২০২৩ সাল থেকেই নিজেদের তদন্ত চালিয়ে আসছে উয়েফা।
বার্সেলোনা অবশ্য শুরু থেকেই কোনো অন্যায় করার কথা অস্বীকার করে আসছে। ক্লাবটির দাবি, অর্থগুলো দেওয়া হয়েছিল রেফারিং-সংক্রান্ত কারিগরি প্রতিবেদন ও পরামর্শের জন্য, ম্যাচ কর্মকর্তাদের প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে নয়। রিয়ালের সর্বশেষ উদ্যোগের পরও উয়েফা নতুন কোনো শাস্তিমূলক কার্যক্রম শুরু করেনি বলে জানিয়েছে ক্লাবটি।
রিয়াল মাদ্রিদ অবশ্য বিষয়টি এখানেই থামাতে চাইছে না। স্প্যানিশ জায়ান্টদের দাবি, তাদের জমা দেওয়া নথিতে এমন বিস্তৃত তথ্য ও প্রমাণ রয়েছে, যা প্রতিযোগিতার স্বচ্ছতা এবং রেফারিংয়ের ওপর আস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে প্রভাবিত করতে পারে। তাই উয়েফাকে ‘সর্বোচ্চ দ্রুততার সঙ্গে’ বিষয়টির নিষ্পত্তির আহ্বান জানিয়েছে তারা।
আর এখানেই ফিরে আসছে গার্দিওলার বার্সেলোনার প্রসঙ্গ। ২০০৮ থেকে ২০১২, মাত্র চার মৌসুমে ১৪টি ট্রফি জিতেছিল তার দল। এর মধ্যে ছিল তিনটি লা লিগা ও দুটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ। মেসি, জাভি, ইনিয়েস্তা ও বুসকেতসদের নিয়ে গড়া সেই দল শুধু শিরোপাই জেতেনি, ফুটবল খেলার ধরনেও একটি প্রজন্মকে প্রভাবিত করেছিল। এখনো অনেকের চোখে সেটি ইতিহাসের অন্যতম সেরা ক্লাব দল।
তাই নেগ্রেইরা তদন্তে শেষ পর্যন্ত বার্সেলোনার বিরুদ্ধে কোনো গুরুতর সিদ্ধান্ত এলে সেটি শুধু ক্লাবটির জন্যই নয়, সেই যুগের ঐতিহাসিক মূল্যায়নের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। যদিও সেটি এখনো সম্পূর্ণ সম্ভাবনার জায়গায়। উয়েফা এখনো কোনো রায় দেয়নি, আর গার্দিওলার বিরুদ্ধেও কোনো অভিযোগ নেই।
গার্দিওলা নিজেও বরাবরই তার বার্সেলোনার সাফল্যকে মাঠের পারফরম্যান্স দিয়েই ব্যাখ্যা করেছেন। ২০২৩ সালে নেগ্রেইরা কাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি জানিয়েছিলেন, আদালতের রায় হওয়ার পর এ বিষয়ে নিজের মতামত দেবেন। একই সঙ্গে বার্সেলোনা ও তৎকালীন সভাপতি হোয়ান লাপোর্তাকে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত নির্দোষ হিসেবে দেখার কথাও বলেছিলেন। তার বক্তব্য ছিল, সেই বার্সেলোনা জিতেছিল কারণ তারা প্রতিপক্ষের চেয়ে ‘অনেক ভালো’ ছিল।
এখানে আরেকটি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। নেগ্রেইরাকে দেওয়া অর্থের সময়সীমা গার্দিওলার বার্সেলোনা অধ্যায়ের চেয়ে অনেক দীর্ঘ। অর্থপ্রদান শুরু হয়েছিল তিনি কোচ হওয়ার আগে এবং তিনি বার্সেলোনা ছাড়ার পরও চলেছে। ফলে এসব অর্থের সঙ্গে গার্দিওলার ব্যক্তিগত সম্পৃক্ততার কোনো অভিযোগ নেই।
তারপরও বিষয়টি গার্দিওলার ক্যারিয়ারে আলাদা মাত্রা পাচ্ছে। কারণ ম্যানচেস্টার সিটিকে ঘিরে প্রিমিয়ার লিগের আর্থিক নিয়মভঙ্গের মামলার কারণে তিনি এরই মধ্যে ক্লাব ফুটবলের আর্থিক বিতর্কের মধ্যে রয়েছেন। এখন বার্সেলোনার সবচেয়ে সফল অধ্যায়টিও একটি চলমান তদন্তের প্রসঙ্গে আলোচনায় আসায় তার ক্যারিয়ারের দুই গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ই যেন ভিন্ন দুটি তদন্তের ছায়ায় ফিরে এসেছে।
দুই অধ্যায়ের মধ্যে কিছু পরিচিত নামও রয়েছে। বার্সেলোনায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করা ফেরান সোরিয়ানো পরে ম্যানচেস্টার সিটির প্রধান নির্বাহী হন। একইভাবে পরে সিটির ফুটবল পরিচালক হন বার্সেলোনার টেকনিক্যাল বিভাগে কাজ করা চিকি বেগিরিস্তাইন। তবে নেগ্রেইরা কাণ্ডে তাদের কারও বিরুদ্ধেও কোনো অনিয়মের অভিযোগ নেই।
এই মুহূর্তে তাই রায়ের চেয়ে তদন্তই বড় খবর। উয়েফা নতুন কোনো মামলা খোলেনি, বরং ২০২৩ সাল থেকে চলমান পর্যালোচনার অংশ হিসেবেই রিয়ালের জমা দেওয়া নতুন নথি পরীক্ষা করছে। বার্সেলোনার ভাষ্যও একই, আগের কার্যক্রম কখনো বন্ধ হয়নি, তাই নতুন করে তা খোলার প্রশ্নও নেই।

