রেফারির বাঁশিটা বাজার আগেই মাঠে নেমে পড়ে মানুষ। হাজার হাজার। হলুদ-সবুজ জার্সি, সাদা শার্ট, খালি গায়ে, সবাই একই দিকে ছুটছে। ক্যামেরাগুলো ঘুরছে। ফ্ল্যাশ জ্বলছে। গোটা অ্যাজটেকা স্টেডিয়াম তখন একটাই শব্দ। অবিন্যস্ত, উন্মত্ত, অসহ্য সুন্দর একটা চিৎকার।
আর সেই ঢলের মাঝখানে একজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছেন; স্থির, চোখ বন্ধ, মুখ সামান্য নামানো। পেলে। তার চোখের কোণ ভেজা। চারদিকে যত শোরগোল, তাকে ঘিরে ততটাই নীরবতা, যেন সবাই বুঝে গেছে, এই মুহূর্তে তাকে একটু একা থাকতে দেওয়া দরকার।
তারপর কার্লোস আলবার্তো এলেন।
কোনো কথা নেই। কোনো সংকেত নেই। শুধু দুটো হাত, অধিনায়কের হাত, পেলের দিকে এগিয়ে গেল। আর এক মুহূর্তে পেলে মাটি ছেড়ে উঠে গেলেন। কাঁধে। সতীর্থদের কাঁধে। যে মানুষটা সারাজীবন অন্যদের বহন করেছেন, সেদিন সে নিজে বাহিত হলেন।
জুন ২১, ১৯৭০। ফাইনাল। ব্রাজিল বনাম ইতালি। স্কোর তখন ৪-১। কিন্তু এই সংখ্যাগুলো সেদিনের গল্পের খুব ছোট একটা অংশ মাত্র। আসল গল্প ছিল অন্যত্র, একটা মানুষের ত্রিশ বছর বয়সে নিজের সেরা অধ্যায়কে বিদায় বলার মুহূর্তে।
তার গল্পের শুরু হয়েছিল ১৯৫৮ সালে। মাত্র সতেরো বছরের এক কিশোর সুইডেনের মাঠে এমন এক ঝড় তুলেছিল, যা পুরো বিশ্বকে অবাক করে দিয়েছিল। ফাইনালে গোল, চোখধাঁধানো নৈপুণ্য, আর বিশ্বকাপ জয়ের উল্লাস, সেই কিশোর রাতারাতি হয়ে উঠেছিলেন ফুটবলের নতুন রাজপুত্র।
চার বছর পর চিলির বিশ্বকাপেও ব্রাজিল ট্রফি জিতেছিল। কিন্তু চোটের কারণে শেষ পর্যন্ত খেলতে পারেননি। ১৯৬৬ সালে ইংল্যান্ডে এসে গল্পটি অন্যদিকে মোড় নেয়। প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডারদের নির্মম ফাউলে জর্জরিত পেলে বারবার মাটিতে লুটিয়ে পড়ছিলেন। তখনকার ফুটবলে খেলোয়াড়দের সুরক্ষার ব্যবস্থা আজকের মতো ছিল না। বিশ্বের সেরা ফুটবলারকে থামানোর সবচেয়ে সহজ উপায় ছিল তাকে লাথি মারা।
সেই বিশ্বকাপ শেষে ক্ষুব্ধ, ক্লান্ত ও আহত পেলে বলেছিলেন, তিনি আর কখনো বিশ্বকাপ খেলবেন না। অনেকেই বিশ্বাস করেছিলেন, হয়তো সেটিই সত্যি হতে যাচ্ছে। কিন্তু ফুটবল এবং মানুষের ভালোবাসা শেষ পর্যন্ত তাকে মেক্সিকোতে নিয়ে এসেছিল। আরেকবার।
তবে এবার আর তিনি আগের সেই কিশোর নন। এবার তিনি আরও পরিণত, আরও বুদ্ধিমান, আরও সম্পূর্ণ একজন ফুটবলার। তার গতি হয়তো সামান্য কমেছে, কিন্তু খেলার বোঝাপড়া এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল, যেখানে অন্যরা যা দেখতে পেত না, তিনি তা আগেই বুঝে ফেলতেন।
১৯৭০ সালের ব্রাজিল দলকে আজও অনেকে সর্বকালের সেরা জাতীয় দল বলে মনে করেন। সেই দলের প্রতিটি লাইন ছিল তারকায় ভরা। জাইরজিনহো ছিলেন অপ্রতিরোধ্য। টুর্নামেন্টের প্রতিটি ম্যাচে গোল করেছিলেন তিনি। রিভেলিনোর বাঁ পা ছিল যেন জাদুর তুলি। তোস্তাও ছিলেন অসাধারণ বুদ্ধিদীপ্ত ফরোয়ার্ড। আর পেছন থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন অধিনায়ক আলবার্তো।
তবু এই নক্ষত্রপুঞ্জের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন একজনই। পেলে।
পুরো বিশ্বকাপজুড়ে তিনি যেন ফুটবলকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করছিলেন। কখনো গোল করে, কখনো অ্যাসিস্ট দিয়ে, কখনো এমন কোনো মুহূর্ত তৈরি করে যা পরিসংখ্যানে ধরা পড়ে না।
চেকোস্লোভাকিয়ার বিপক্ষে মাঝমাঠ থেকে নেওয়া সেই অবিশ্বাস্য শট, যা অল্পের জন্য গোল হয়নি। উরুগুয়ের বিপক্ষে গোলরক্ষককে বল ছাড়াই কাটিয়ে যাওয়া সেই কিংবদন্তি মুভ। প্রতিটি ম্যাচে তিনি এমন কিছু রেখে যাচ্ছিলেন, যা দর্শকদের মনে বছরের পর বছর বেঁচে থাকবে।
অবশেষে এল ফাইনাল।
আর ১৮ মিনিটে আসে প্রথম গোল। ডান দিক থেকে ভেসে আসে একটি ক্রস। ইতালির ডিফেন্ডারদের মাথার ওপর দিয়ে লাফিয়ে ওঠেন পেলে। তার ঝাঁপটি যেন মানুষের চেয়ে বেশি কিছু। কয়েক সেকেন্ডের জন্য তিনি আকাশে স্থির হয়ে ছিলেন বলে মনে হয়। তারপর বজ্রের মতো একটি হেড। বল জালে। গোলরক্ষক শুধু তাকিয়ে থাকেন।
সেই গোলের পর পেলের মুখে যে হাসি ফুটে উঠেছিল, তাতে ছিল আত্মবিশ্বাস, স্বস্তি এবং স্বপ্নপূরণের আভাস। ইতালি অবশ্য লড়াই ছেড়ে দেয়নি। তারা একবার সমতায় ফিরেছিল। কিন্তু ব্রাজিলের ফুটবল সেদিন ছিল থামানো অসম্ভব। একের পর এক আক্রমণ, একের পর এক সৃষ্টিশীলতা।
তারপর আসে সেই মুহূর্ত, যা অনেকের কাছে বিশ্বকাপ ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ দলীয় গোল। ম্যাচের শেষদিকে ব্রাজিল ধৈর্যের সঙ্গে বল চালাচ্ছিল। প্রতিটি পাস যেন একটি গল্পের অংশ। বল ঘুরতে ঘুরতে পৌঁছায় পেলের কাছে। তিনি মাথা তুলে তাকান। ডানদিকে দৌড়ে উঠছেন কার্লোস আলবার্তো।
এক মুহূর্তও দেরি করেননি পেলে। একটি নিখুঁত পাস। আলবার্তো ছুটে এসে প্রথম স্পর্শেই এমন এক শট নেন, যা জালের ভেতর গিয়ে থামে। গোল। ৪-১। খেলা শেষ। বিশ্বকাপ শেষ। আর একই সঙ্গে শেষ হয়ে যায় পেলের বিশ্বকাপ যাত্রাও।
জুলে রিমে ট্রফি। সোনার ট্রফি। সেবার ব্রাজিলকে চিরতরে দিয়ে দেওয়া হয়। তিনটি বিশ্বকাপ জেতার পুরস্কার। পেলে ট্রফিটা হাতে নিয়ে একবার আকাশের দিকে তাকালেন। তারপর চোখ নামালেন। সেই দৃষ্টিতে কী ছিল। সমাপ্তির স্বস্তি, নাকি হারানোর বেদনা।, সেটা তিনি কখনো পুরোপুরি বলেননি।
মাঠ থেকে বেরোনোর পথে ইতালির রবার্তো রোসাতো এগিয়ে এলেন। হাত বাড়িয়ে দিলেন, জার্সিটা চাই। পেলে থামলেন। খুলে দিলেন। রোসাতো কেঁদে ফেললেন। পেলে হাসলেন।
তবে খালি গায়ে দাঁড়িয়ে থাকা সেই কালো মানিকের চোখেমুখে তখনো যুদ্ধ জয়ের ঘোর। জাইরজিনহো, তোস্তাও, রিভেলিনো, কার্লোস আলবার্তোদের চোখে তখন বিশ্বজয়ের আনন্দাশ্রু। সেই বাঁধভাঙা আবেগের তোড়েই সতীর্থরা আর উন্মত্ত ভক্তরা মিলে আচমকা কাঁধে তুলে নিলেন তাদের প্রাণভোমরাকে।
শূন্যে ভাসমান পেলে তখন আর কেবল একজন ফুটবলার নন, সতীর্থদের কাঁধে চড়ে তিনি যেন অধিষ্ঠিত হলেন এক অদেখা সিংহাসনে। দৃশ্যটি যদি স্থিরচিত্র হয়ে চোখের সামনে ভাসে, দেখবেন পেলের সেই বিখ্যাত ভুবনভোলানো হাসি। প্রাপ্তির এক আদিম ও অকৃত্রিম তৃপ্তিতে চোখ দুটো যেন হাসছে। ডান হাতের মুঠি শূন্যে ছুঁড়ে দিয়ে তিনি যেন ছুঁতে চাইছেন আকাশটাকে।
ভিড়ের মাঝখান থেকে কে একজন মাথায় পরিয়ে দিল ঐতিহ্যবাহী মেক্সিকান ‘সামব্রেরো’ হ্যাট। চারপাশে ঘিরে থাকা সাংবাদিকদের ক্যামেরার শাটারের অবিরাম শব্দ, পুলিশ আর উন্মত্ত দর্শকদের ভিড়, সবকিছুর কেন্দ্রে কেবল তিনি। যেন এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের শেষে বিজয়ী সেনাপতিকে বরণ করে নিচ্ছে তার অনুগত যোদ্ধারা।
পরে এক সাক্ষাৎকারে পেলেকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, সেই মুহূর্তে কী মনে হয়েছিল? পেলে বলেছিলেন, ‘আমি ভেবেছিলাম, এরপর আর কী বাকি থাকে?’
এরপর আর কী বাকি থাকে? এই প্রশ্নটা শুনলে মনে হয় বিষণ্নতার। আসলে এটা পরিপূর্ণতার ভাষা। যে মানুষ সব দিয়েছেন, সব পেয়েছেন এবং সেটা জানেন। তার জন্য এর চেয়ে সৎ কোনো উত্তর হয় না।
কার্লোস আলবার্তো সেদিন পেলেকে কাঁধে তুলেছিলেন। কিন্তু আসলে সেটা উল্টো ছিল, পেলেই তাদের সবাইকে বহন করেছিলেন বছরের পর বছর। সেদিন শুধু একটু বিশ্রাম নিয়েছিলেন।
রাজারা এভাবেই বিদায় নেন।

