রংধনু সাদাও হয়!

আমরা মাঝে মাঝে আকাশে রংধনু দেখি। তবে আমরা যে রংধনু দেখি তা রঙিন। কিন্তু জানেন কি, আকাশে কখনো কখনো সাদা রঙের রংধনুও দেখা যায়! যাকে বলা হয়, ফগ বো। সাধারণত কুয়াশাচ্ছন্ন আকাশে ফগ বো বা সাদা রংধুন দেখা যায়। তবে এটি বেশ বিরল ঘটনা।

ন্যাশনাল জিওগ্রাফির প্রতিবেদনে বলা হয়, ইতিহাসে প্রথম ফগ বো দেখা গিয়েছিল ইকুয়েডরে। ১৭৩৭ সালের আগস্ট থেকে ১৭৩৯ সালের জুলাইয়ের মধ্যে কোনো এক সময় স্প্যানিশ বিজ্ঞানী ও অভিযাত্রী অ্যান্তোনিও দে উল্লোয়া প্রথম ফগ বো দেখেছিলেন।

তিনি তখন আকাশে তিনটি আলোকীয় বলয় দেখতে পান, যেগুলোকে রংধনুর মতো মনে করেছিলেন। এর পাশাপাশি তিনি আরেকটি আলাদা সাদা রঙের বাঁক দেখেন, যেটাকে ‘চতুর্থ আর্ক’ হিসেবে বর্ণনা করেন। এটিই আজ আমরা ফগ বো বা সাদা রংধনু নামে চিনি। চতুর্থ আর্ক বলতে এখানে আকাশে দেখা আলোর চারটি বাঁকের মধ্যে চতুর্থটিকে বোঝানো হয়েছে।

যখন সূর্যের আলো পানির ফোঁটার ওপর পড়ে, তখন ফগ বো এবং রংধনু তৈরি হয়। নর্থ ডাকোটার কেএক্স নিউজের প্রধান আবহাওয়াবিদ কেনি মিলার বলেন, ‘দুটোর পেছনের প্রক্রিয়া একই, কেবল পানির ফোঁটার আকার আলাদা হয়। এই আকারের পার্থক্যের কারণে আমরা কোন রং দেখব বা দেখব না, তা পরিবর্তিত হয়।’

নিউ হ্যাম্পশায়ারের মাউন্ট ওয়াশিংটন অবজারভেটোরির আবহাওয়া পর্যবেক্ষক বেইলি নরডিন ব্যাখ্যা করেন, যখন সূর্যের আলো বড় বৃষ্টির ফোঁটার ভেতর দিয়ে প্রতিসরিত হয়, তখন একটি সাধারণ রংধনু তৈরি হয়। মূলত সূর্যের আলো পানির ফোঁটার ভেতর দিয়ে বাঁক নেয় এবং পরে তার পেছন দিক থেকে প্রতিফলিত হয়। এই সময় আলো বিভিন্ন কোণে বাঁক নেয় বলেই আমরা লাল, কমলা, হলুদ, সবুজ, নীল, আকাশি ও বেগুনি রঙগুলো দেখতে পাই।

কেনি মিলরা বলেন, বিপরীতে যখন সূর্যের আলো কুয়াশার পানির ক্ষুদ্র ফোঁটার ওপর প্রতিসরিত ও বিচ্ছুরিত হয় তখন ফগ বো তৈরি হয়। আলোর এই বিচ্ছুরণই সাদা রঙের প্রধান কারণ। এজন্য প্রথমে দরকার কুয়াশা। কুয়াশা সারা বছরই তৈরি হতে পারে, বিশেষ করে তাপমাত্রা দ্রুত পরিবর্তন হলে। যেমন বসন্তে বরফ গলতে শুরু করলে কুয়াশা বেশি দেখা যায়।

ফগ বোকে শীতের দিনে নিজের নিঃশ্বাস দেখার সঙ্গে তুলনা করেন কেনি মিলার। তিনি ব্যাখ্যা করেন, আমরা যখন মুখ দিয়ে উষ্ণ বাতাস বের করি, তা ঠাণ্ডা বাতাসের সঙ্গে মিশে ছোট মেঘ বা কুয়াশার মতো ঘনীভবন তৈরি করে এবং আশপাশের পরিবেশের সঙ্গে মিশে যায়।

তার ভাষ্য, সাধারণ রংধনু দেখতে হলে পানির ফোঁটার আকার প্রায় দুই মিলিমিটার হতে হয়, কারণ এই আকারে ফোঁটাগুলো প্রায় গোলাকার থাকে। ফলে আলো সঠিকভাবে প্রতিসরিত হয়ে রঙগুলো আলাদা করে দেখায়।

তিনি জানান, অন্যদিকে ফগ বো তৈরি হতে খুব ছোট মাত্র প্রায় শূন্য দশমিক শূন্য পাঁচ মিলিমিটার আকারের কুয়াশার ফোঁটাই যথেষ্ট। এই ছোট ফোঁটাগুলোর ভেতরেও প্রতিসরণ ঘটে, তবে এর সঙ্গে বিচ্ছুরণও যুক্ত হয়, যা আলোকে বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে দেয়। সূর্যের আলো যখন ফোঁটার চারপাশ দিয়ে বাঁকে তখন তাকে বিচ্ছুরণ বলা হয়, আর আলো যখন বাতাস থেকে পানির ফোঁটার ভেতরে প্রবেশ করে বাঁকে তখন সেটি প্রতিসরণ। এই দুই প্রক্রিয়ার মিলিত প্রভাবে সব রং একসঙ্গে মিশে যায়। ফলে আলাদা আলাদা রং না দেখে আমরা সাদা রংধনু বা ফগ বো দেখতে পাই।

অবশ্য ফগ বো সবসময় একদম সাদা হয় না। কখনও কখনও এতে হালকা লাল বা বেগুনি আভাও দেখা যায়, বলেন মিলার। তিনি জানান, যখন এমন হয়, তখন বুঝতে হবে প্রতিসরণ বিচ্ছুরণের চেয়ে একটু বেশি প্রভাব ফেলছে। ফলে কিছু রং পুরোপুরি মিশে না গিয়ে সামান্য আলাদা হয়ে দেখা যায়।

সূর্যের আলো কীভাবে বাতাসে থাকা পানির ছোট ফোঁটার সঙ্গে কাজ করে তা জানতে গবেষকরা ফগ বো নিয়ে গবেষণা করেন। তারা কম্পিউটারে কৃত্রিমভাবে (সিমুলেশনে) পানির ফোঁটার আকার ও আকৃতি বদলে বিভিন্ন ধরনের আলোকীয় ঘটনা নিয়ে গবেষণা করেন। সেখানে তারা অনেক মজার ঘটনা বুঝতে পারেন, যেমন ফগ বো, ডাবল রংধনু, টুইন রংধনু—যেখানে একটি রঙধনু কখনও কখনও দুই ভাগ হয়ে যায়।

ফগ বো সহজে দেখা যায় না। এমনকি আপনার এলাকায় তৈরি হলেও, এটি দেখতে হলে সঠিক জায়গায় থাকতে হয়। ফগ বো দেখার জন্য অবশ্যই কুয়াশা থাকতে হবে। আবার বেশি ঘন কুয়াশা থাকলে দেখা কঠিন হয়ে যায়, কারণ তখন কিছুই পরিষ্কার দেখা যায় না।

নরডিন বলেন, ফগ বো দেখতে হলে আপনার পেছনে সূর্য বা চাঁদ থাকতে হবে, যেন আলো কুয়াশার ওপর পড়ে সেটিকে আলোকিত করে।

নরডিন বলেন, ফগ বো পৃথিবীতে খুবই বিরল। তবে যেসব জায়গায় কুয়াশা অনেক বেশি হয় সেখানে এগুলো তুলনামূলক বেশি দেখা যায়। যেমন পাহাড়ের চূড়া বা আর্কটিক অঞ্চল।

Related Articles

Latest Posts