যে পানি ফসল কেড়েছে, সে পানিতেই বাঁচার লড়াই

মৌলভীবাজার সদর উপজেলার কাউয়াদিঘী হাওরের প্রান্তিক কৃষক ফয়েজ আলীর এবারের ঈদ কেটেছে এক অদ্ভুত নীরবতায়। না ছিল নতুন পোশাক, না ছিল উৎসবের আমেজ। প্রতিবেশীর দেওয়া সামান্য একটু মাংসই ছিল তার পরিবারের ঈদ আয়োজন।

এই মৌসুমে বুকভরা আশা নিয়ে মাঠে নেমেছিলেন ফয়েজ আলী। ১২ হাজার টাকা দিয়ে লিজ নিয়েছিলেন ৬ কিয়ার (১ কিয়ার সমান ৩০ শতক) জমি। অক্লান্ত শ্রমের পাশাপাশি হালচাষ, সেচ, বীজ ও সারের খরচ মিলিয়ে ব্যয় দাঁড়িয়েছিল প্রায় ২৫-৩০ হাজার টাকা। ছয় সদস্যের পরিবারের সারা বছরের ভরণপোষণের স্বপ্ন তিনি বুনেছিলেন সবুজ ধানের ক্ষেতে।

কিন্তু বর্ষার পানি এক ঝটকায় মুছে দিয়েছে সব।

ফয়েজ আলী জানান, মাত্র ১ কিয়ারের ধান ঘরে তুলতে পেরেছেন। ফলন পেয়েছেন টেনেটুনে ১২ মণ। বাকি ৫ কিয়ারের সোনালি স্বপ্ন তলিয়ে গেছে পানির নিচে। মাসের পর মাসের শ্রম, ধারদেনা আর ভবিষ্যতের আশা—সবকিছু গ্রাস করেছে বন্যার পানি।

বন্যার পর শুনেছিলেন, নৌকায় করে কৃষি কর্মকর্তারা এসেছিলেন এলাকায়। মনে মনে ভেবেছিলেন, হয়তো তার খোঁজ করবে কেউ, সরকারি সহায়তার তালিকায় নাম উঠবে। কিন্তু সেই নৌকা এসে আবার চলেও গেছে। ফয়েজ আলীর সঙ্গে দেখা হয়নি কারও। তার দুয়ারে পৌঁছায়নি কেউ।

ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের খাতায় নাম ওঠেনি তার।

ধান নেই, সঞ্চয় নেই। এখন বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন হাতের জাল। প্রতিদিন ভোরে নামেন বন্যার পানিতে। যে পানি তার ফসল কেড়েছে, সেই পানিতেই মকা মাছ ধরেন। দিনে দুই বেলা মাছ ধরে আয় হয় ৫০০-৬০০ টাকা। এই সামান্য আয়েই সংসারের খরচ মেটানোর চেষ্টা করেন তিনি।

ফয়েজ আলীর কথা শুনলে বুক ভারী হয়ে আসে।

তিনি বলেন, আগে ঈদে পাড়ার কেউ গরু কোরবানি দিলে মাংস কাটার কাজে সাহায্য করতেন। বিনিময়ে কিছু মাংস পেতেন। সেটুকুই ঘরে এলে উৎসবের আবহ তৈরি হতো।

কিন্তু সময় বদলেছে। এখন অনেকেই কসাই দিয়ে মাংস কাটান। ফয়েজ আলীর মতো মানুষের আর প্রয়োজন নেই কারও।

এবার ঈদের দিন তাই ছিলেন একেবারেই খালি হাতে। শেষবেলায় এক প্রতিবেশী সামান্য কিছু মাংস দিয়েছিলেন। সেই মাংসেই ছয়জনের ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি হয়েছে।

বিষণ্ন কণ্ঠে ফয়েজ আলী বলেন, ‘আমাদের কাছে ঈদের দিন আর অন্য দিনের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। এবার ফসলের এত ক্ষতি হয়েছে যে ঈদের কথা চিন্তাও করতে পারিনি।’

দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি আরও বলেন, ‘এখন এমন একটা সময় এসেছে, আমাদের মতো দরিদ্র কৃষকের খবর কেউ রাখে না।’

কথাগুলো একজন ক্লান্ত মানুষের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও হতাশার প্রকাশ। যে মানুষটি প্রতিটি দুর্যোগে লড়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো সহায়তার তালিকায় নাম ওঠেনি তার।

এই লড়াই শুধু ফয়েজ আলীর একার নয়; হাওরের অসংখ্য কৃষকেরও।

তারপরও কেউ হাত গুটিয়ে বসে নেই। নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর সবাই মিলে ভিজে যাওয়া ধান শুকানোর চেষ্টা করছেন। কেউ নষ্ট হয়ে যাওয়া খড় রক্ষার চেষ্টা করছেন। অনেক কৃষক বন্যার পানিতে মাছ ধরে কোনোভাবে সংসার টিকিয়ে রাখার সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন।

হাওরজুড়ে এখন এক কঠিন বাস্তবতা—যে পানি কৃষকের ফসল কেড়ে নিয়েছে, সেই পানিতেই তারা খুঁজে চলেছেন বেঁচে থাকার অবলম্বন।

Related Articles

Latest Posts