জিম্বাবুয়ে সফরে গিয়ে যেন শৈশবে ফিরে গেলেন অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট দলের অধিনায়ক মিচেল মার্শ। আসলে তার শৈশবটাই তো পড়ে আছে জিম্বাবুয়েতে। বাবা জিওফ মার্শও ২০০০-এর দশকের শুরুতে ছিলেন জিম্বাবুয়ের প্রধান কোচ, তখন দশ বছরের শুরু মিচেলের বেড়ে উঠা হারারেতে। অনেক বছর পর ভিন্ন ভূমিকায় সেখানে গিরে আবেগাক্রান্ত তিনি।
ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ায় উঠে এসেছে মিচ মার্শের জীবনের আরেক অধ্যায়। হারারে স্পোর্টস ক্লাবের ড্রেসিংরুম বারান্দায় বসে প্রবীণ জিম্বাবুইয়ান ফারাই হ্যাপি মাপোন্ডেরার সঙ্গে আত্মার টান অনুভব করছিলেন তিনি। এই হ্যাপি ছিলেন তার তখনকার নিত্য দিনের সঙ্গী।
পার্থ থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে এসে অচেনা দেশে মানিয়ে নেওয়ার দিনগুলোতে মার্শ পরিবারের পাশে ছিলেন এই হ্যাপি। হারারের হাইল্যান্ড শহরতলির বাড়িতে হ্যাপির হাত ধরেই বেড়ে ওঠা মিচের। ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার কাছে শৈশবের গল্প শোনাতে গিয়ে মার্শ বলেন, ‘আমি বাড়ির ভেতরে না খেয়ে হ্যাপির সঙ্গে বসে খেতেই বেশি পছন্দ করতাম। আমার শৈশবের এক বিশাল অংশ জুড়ে আছেন তিনি।’ হ্যাপির সঙ্গে বসেই গল্প জমাতেন আর খেতেন জিম্বাবুয়ের ঐতিহ্যবাহী খাবার ‘সাদজা’।
প্রায় ২৫ বছর পর সেই হ্যাপি, যিনি এখনো জিম্বাবুয়ে ক্রিকেটের সঙ্গে যুক্ত, অস্ট্রেলিয়া দলের অধিনায়ক হিসেবে আসা মিচের সঙ্গে দেখা করতে মাঠে আসেন। দুই প্রজন্মের দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরলেন উষ্ণ ভালোবাসায়। ছোটবেলার সেই একগুয়ে ছেলেটা আজ হ্যাপির সামনে বিশালদেহী এক তারকা! মিচ তাকে দোতলায় নিয়ে গিয়ে মা মিশেল ও বোন মেলিসার সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলিয়ে দেন। জিওফের মাথায় চুল কমে যাওয়া নিয়ে হ্যাপির রসিকতা আর স্মৃতিকাতরতায় পরিবেশটা কিছুটা আবেগঘন হয়ে উঠেছিল।
জিম্বাবুয়েতেই মিচের ক্রিকেটীয় ভিত তৈরি হয়েছিল। বাবার সহকারী কোচ কেভিন কারানের তিন ছেলে—টম, বেন ও স্যাম কারানের সঙ্গে হারারে স্পোর্টস ক্লাবে দিনের পর দিন ক্রিকেট খেলতেন তিনি। কী অদ্ভুত ক্রিকেটীয় সংযোগ! এই তিন ভাই-ই পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলেছেন (টম ও স্যাম ইংল্যান্ডের হয়ে, আর বেন জিম্বাবুয়ের হয়ে)। ২০০৪ সালে রবার্ট মুগাবে সরকারের ভূমি সংস্কার নীতিতে ভিটেমাটি হারিয়ে কারান পরিবার কিছুদিনের জন্য মার্শদের সঙ্গেই থাকত। সে সময়ের সেই একই ছাদের তলায় থাকা মার্শ ও কারান পরিবার মিলিয়ে আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতা কিন্তু ৬০০ ছাড়িয়ে গেছে!
জিম্বাবুয়ের বর্তমান অধিনায়ক সিকান্দার রাজা রসিকতা করে মিচকে ‘স্থানীয় ছেলে’ বলেই ডাকেন। মার্শ নিজেও স্বীকার করেছেন, ‘একটা সময় তো সত্যি সত্যিই জিম্বাবুয়ের হয়ে খেলার স্বপ্ন দেখতাম।’ তবে ভাগ্যের লিখন অন্য কিছু ছিল। চলতি এই সিরিজেই অস্ট্রেলিয়ার হয়ে নিজের ১০০তম ওডিআই ম্যাচ খেলতে নামছেন মার্শ—যে ক্যারিয়ারে ইতোমধ্যে যুক্ত হয়েছে টি-টোয়েন্টি ও ওডিআই বিশ্বকাপ জয় এবং অ্যাশেজে দুর্দান্ত সব সেঞ্চুরি।
২০১৪ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে তিন নম্বরে ব্যাট করতে নেমে ছক্কার বৃষ্টিতে ৮৯ রানের ইনিংস খেলে জানান দিয়েছিলেন নিজের আগমন। এক সপ্তাহ পর আবার ৮৬ রানের বিধ্বংসী ইনিংস। সেই সফরের দারুণ অভিজ্ঞতাই তাকে ২০১৫ সালের বিশ্বকাপ জয়ী অস্ট্রেলিয়া দলে জায়গা করে নেওয়ার শক্ত ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল।
পার্থের স্কুলে পড়ালেখার সময়েও মিচ পেয়েছিলেন জিম্বাবুয়ে থেকে আসা আরেক বন্ধু রাইলি প্যাটিনসনকে। অস্ট্রেলিয়া দল হারারেতে নামার পর দিনই মিচ পুরো দলকে নিয়ে ঘুরে এসেছেন সেই প্যাটিনসনের পরিবারের ফার্মহাউসে।
মিচ মার্শের কাছে এবারের জিম্বাবুয়ে সফরটা ঠিক যেকোনো এক সফর নয়, অন্যরকম ভ্রমণ।

