ডাইনোসরের কথা তো আমরা সবাই জানি। কিন্তু কখনো কি ভেবেছি, মানুষের জন্মের অনেক আগে পৃথিবীতে যদি আমাদের মতো আরেকটি বুদ্ধিমান সভ্যতা থাকত? তারা যদি বড় বড় শহর বানাত, যন্ত্র ব্যবহার করত, এমনকি নিজেদের ভুলে একদিন হারিয়েও যেত। তাহলে কি আজ তাদের কোনো চিহ্ন খুঁজে পেতাম?
এই কৌতূহল থেকেই ২০১৮ সালে একটি ব্যতিক্রমী গবেষণা করেন যুক্তরাষ্ট্রের রচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্জীববিজ্ঞানী অ্যাডাম ফ্র্যাঙ্ক এবং নাসার জলবায়ুবিজ্ঞানী গ্যাভিন শ্মিট। তারা এই ধারণার নাম দেন ‘সিলুরিয়ান হাইপোথিসিস’। নামটি নেওয়া হয়েছে জনপ্রিয় টিভি সিরিজ ডক্টর হু-এর কাল্পনিক সরীসৃপ জাতির নাম থেকে।
গবেষকেরা বলছেন, এটি কোনো দাবি নয়, বরং একটি বৈজ্ঞানিক চিন্তার পরীক্ষা। যার উদ্দেশ্য হলো, যদি সত্যিই অতীতে কোনো উন্নত সভ্যতা থেকে থাকে, তাহলে তারা পৃথিবীতে কী ধরনের চিহ্ন রেখে যেতে পারত এবং আজ আমরা সেগুলো শনাক্ত করতে পারতাম কি না।
প্রায় ৫ কোটি ৫০ লাখ বছর আগে পৃথিবীতে হঠাৎ করেই তাপমাত্রা অনেক বেড়ে যায়। অনেক প্রাণী ও বাস্তুতন্ত্র ধ্বংস হয়ে যায়। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এটি আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত বা বিপুল পরিমাণ মিথেন গ্যাস নিঃসরণের কারণে হতে পারে। তবে সঠিক কারণ এখনো নিশ্চিত নয়।
এই ঘটনাটির সঙ্গে বর্তমান জলবায়ু পরিবর্তনের কিছু মিল দেখে গবেষকদের মনে প্রশ্ন জাগে, এটি কেবলই প্রাকৃতিক ঘটনা, নাকি অন্য কোনো সম্ভাবনাও থাকতে পারে?
এখন প্রশ্ন হলো, কোনো সভ্যতা থাকলে তার প্রমাণ কি টিকে থাকত?
বিজ্ঞানীদের মতে, খুব সম্ভবত শহর, ভবন বা রাস্তার মতো স্থাপনা কোটি কোটি বছর টিকে থাকত না। পৃথিবীর ভূত্বক সব সময় বদলে যাচ্ছে। ভূমিকম্প, আগ্নেয়গিরি, ক্ষয় ও টেকটোনিক প্লেটের নড়াচড়ায় পুরোনো সবকিছু ধীরে ধীরে মুছে যায়। জীবাশ্ম থেকেও নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া কঠিন। কারণ পৃথিবীতে মারা যাওয়া প্রাণীদের খুব অল্প অংশই জীবাশ্মে পরিণত হয়।
গবেষকদের মতে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হতে পারে পৃথিবীর রাসায়নিক পরিবর্তনের রেকর্ড। যেমন—বায়ুমণ্ডলে অতিরিক্ত কার্বনের চিহ্ন, মাটির স্তরে প্লাস্টিকের অবশিষ্টাংশ, ইলেকট্রনিক যন্ত্রে ব্যবহৃত ভারী ধাতুর উপস্থিতি, কৃষিকাজে ব্যবহৃত কৃত্রিম রাসায়নিক বা হরমোনের চিহ্ন।
তারা বলছেন, মানুষের বর্তমান সভ্যতা একদিন বিলীন হয়ে গেলেও, এসব উপাদান হয়তো কোটি বছর পরও ভূস্তরে থেকে যেতে পারে।
তাহলে কি সত্যিই মানুষের আগেও উন্নত সভ্যতা ছিল? এই প্রশ্নের কোনো প্রমাণ এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। গবেষকেরা নিজেরাও এমন কোনো সভ্যতার অস্তিত্বে বিশ্বাস করেন না। তবে তারা বলছেন, বর্তমান তথ্য দিয়ে এ সম্ভাবনাকে শতভাগ বাতিলও করা যায় না।

অন্যদিকে, অনেক ভূতত্ত্ববিদ মনে করেন, যদি মানুষের মতো বড় আকারের প্রযুক্তিনির্ভর সভ্যতা আগে থাকত, তাহলে শহর, ধাতু, প্লাস্টিক ও শিল্পকারখানার বর্জ্যের স্পষ্ট চিহ্ন পৃথিবীতে পাওয়া যেত। এখন পর্যন্ত তেমন কোনো প্রমাণ মেলেনি।
এই গবেষণার মূল উদ্দেশ্য অতীতের কোনো হারিয়ে যাওয়া সভ্যতার খোঁজ নয়। বরং এটি আমাদের বর্তমান নিয়েই প্রশ্ন তোলে, যেমন—মানবসভ্যতা কি প্রযুক্তি ব্যবহার করে টেকসইভাবে টিকে থাকতে পারবে, নাকি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে একদিন নিজেরাই নিজেদের ধ্বংসের পথে নিয়ে যাবে?
বিজ্ঞানীদের ভাষায়, পৃথিবীকে বদলে দেওয়ার মতো প্রযুক্তি মানুষ তৈরি করেছে। এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, সেই প্রযুক্তির পরিণতি সামলে আমরা কত দিন টিকে থাকতে পারব?
সূত্র: সিএনএন

