মধ্যপ্রাচ্যের তেল-গ্যাস বন্ধ হলে কোন পথে যাবে বিশ্ব

মধ্যপ্রাচ্য বিশ্বের অন্যতম বড় জ্বালানি ভাণ্ডার। সৌদি আরব, ইরান, ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, ওমান ও কাতারের অর্থনীতি অনেকাংশেই তাদের তেল-গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। পাশাপাশি, বিশ্ব জ্বালানি বাজারের গতিপথও অনেকাংশে নির্ধারণ করে এই দেশগুলো।

মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে বিপুল পরিমাণ তেল-গ্যাস সমুদ্রপথে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যায়। এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি। এই একটি সমুদ্রপথে বিশ্বের মোট পরিবাহিত তেল-গ্যাসের ২০ শতাংশ রপ্তানি হয়।

ফলে এ অঞ্চলের জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে এর ধাক্কা পড়ে বিশ্বের সব প্রান্তেই।

গত সাত মাস ধরে বিশ্ববাসী ইরান যুদ্ধের প্রভাব অনুভব করছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরান-ওয়াশিংটনের চলমান শান্তি আলোচনার মধ্যেই ইরানের আকাশে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধবিমান দেখা যায়। প্রথম দিনের হামলায় নিহত হন শীর্ষ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ সামরিক-বেসামরিক ব্যক্তিত্ব।

এরপর হরমুজ প্রণালিতে নৌযান চলাচল বন্ধ করে দেয় ইরান। অল্প কয়েকদিনের মধ্যে পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে ইরানের সব বন্দর অবরুদ্ধ করে যুক্তরাষ্ট্র। সেই অচলাবস্থা আজও কাটেনি।

গত বুধবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের মঞ্চে দাঁড়িয়ে বললেন, ইরানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের বৈঠক ইতিবাচক হয়েছে। শিগগির আবারও দুই পক্ষ বৈঠকে বসবে।

গত ২২ সেপ্টেম্বর বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়—ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনা চলছিল এবং তিনি শেষ পর্যন্ত একটি সমঝোতা হওয়ার আশা করছেন। এতে আরও বলা হয়—ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র সামরিক চাপ কমিয়ে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ তুলে নিলে কয়েকদিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া সম্ভব।

এমন সংবাদে নিমিষেই বিশ্ববাজারে ব্যারেলপ্রতি অপরিশোধিত তেলের দাম কমতে শুরু করে। যুদ্ধ বন্ধে আলোচনা হচ্ছে এবং তা ফলপ্রসূ হতে যাচ্ছে—এমন আশ্বাসেই ব্যবসায়ীদের মনে ফিরে আসে স্বস্তি।

মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকট বিশ্ববাসীকে একটি পুরনো শিক্ষা নতুন করে উপলব্ধি করার সুযোগ এনে দিয়েছে। বলা হয়, ‘সব ডিম এক ঝুড়িতে রেখো না। ঝুড়ির কিছু হলে সব ডিমই নষ্ট হবে।’

একইভাবে, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ এখন বুঝতে পেরেছে, জ্বালানির জন্য মধ্যপ্রাচ্যের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা বিপদের কারণ হতে পারে।

সবচেয়ে বড় কথা, এই সংকট শুধু জ্বালানির নয়—এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিদ্যুৎ, শিল্প, পরিবহন, খাদ্য উৎপাদন, মূল্যস্ফীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচ।

গত ১৮ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল ‘মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহ ঘাটতি পূরণে হিমশিম খাচ্ছে তেলের বাজার’।

এতে বলা হয়, গত আগস্টে গড়ে প্রতিদিন হরমুজ প্রণালি দিয়ে ৭৬ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর আগে সংখ্যাটি ছিল প্রতিদিন দুই কোটিরও বেশি।

আইইএ-র হিসাব অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরুর পর আগস্ট পর্যন্ত (ছয় মাসে) হরমুজ দিয়ে তেল রপ্তানি হ্রাস পেয়েছে প্রায় ২৮০ কোটি ব্যারেল। অর্থাৎ, স্বাভাবিক রপ্তানির তুলনায় যুদ্ধাবস্থার ২৮০ কোটি ব্যারেল কম রপ্তানি হয়েছে, যা দিয়ে প্রায় ২৮ দিনের বৈশ্বিক চাহিদা ও বাংলাদেশের ৫৫ বছরের চাহিদা মেটানো সম্ভব।

আইইএ-র প্রতিবেদন মতে, চলতি বছরে বিশ্বজুড়ে তেলের দৈনিক চাহিদা ১০ কোটি ৭ লাখ ব্যারেল। অপরদিকে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) দেওয়া তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশের বার্ষিক জ্বালানি তেলের চাহিদা প্রায় ৭০ লাখ টন।

উপরের হিসাবে এই তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে।

তবে এটা বিশ্ববাজারের সরবরাহ ঘাটতি হিসেবে দেখা যাবে না। কারণ, সংকটের সময় মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে উৎপাদন বাড়ানো হয়েছে। সৌদি আরব ও আরব আমিরাত বিকল্প বাণিজ্যপথ ব্যবহার করেছে। বিভিন্ন দেশের মজুত থেকে তেল ছাড়া হয়েছে এবং উচ্চ দামের কারণে তেলের চাহিদাও কমেছে।

হরমুজ প্রণালি বন্ধ বা অচল হয়ে গেলেই মধ্যপ্রাচ্যের সব তেল রপ্তানি থেমে যায় না। সৌদি আরব ও আরব আমিরাতের মতো দেশগুলোর হাতে হরমুজ এড়িয়ে তেল রপ্তানির বিকল্প ব্যবস্থা রয়েছে।

সৌদি আরব লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরের মাধ্যমে তেল রপ্তানি করতে পারে। দেশটির পূর্বাঞ্চল থেকে পশ্চিম উপকূলে তেল নেওয়ার জন্য রয়েছে ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন। আরব আমিরাতেরও রাজধানী আবুধাবি থেকে ফুজাইরাহ পর্যন্ত পাইপলাইন রয়েছে। এর মাধ্যমে হরমুজ এড়িয়ে ওমান উপসাগরের বন্দর ব্যবহার করা যায়।

গত ১৮ সেপ্টেম্বর আইইএ-র প্রতিবেদনে আরও বলা হয়—সৌদি আরব ও আমিরাতের এসব বিকল্প রুট দিয়ে তেল রপ্তানি ফেব্রুয়ারির ৪১ লাখ ব্যারেল থেকে জুনে সর্বোচ্চ প্রতিদিন ৭৮ লাখ ব্যারেল পর্যন্ত উঠেছিল। আগস্টে তা আবার কমে ৫৫ লাখ ব্যারেলে নেমে আসে।

লোহিত সাগর এলাকায় ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের হামলার কারণে বিকল্প বাণিজ্যপথ দিয়ে তেল সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। আগামীতে ওই অঞ্চলের পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে।

অর্থাৎ, হরমুজ বন্ধ হলেও কিছু পরিমাণ তেল অন্য পথ দিয়ে পরিবহন করা সম্ভব। কিন্তু সেই সক্ষমতা হরমুজ দিয়ে স্বাভাবিক সময়ে যাওয়া বিপুল পরিমাণ তেলের সমান নয়।

এবার আসে দ্বিতীয় প্রশ্ন—মধ্যপ্রাচ্যের ঘাটতি পূরণে অন্য দেশগুলো কতটা এগিয়ে আসতে পারে?

আইইএ-র ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে আগস্ট পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যের বাইরের দেশগুলো সম্মিলিতভাবে বাড়তি প্রায় ৪২ কোটি ব্যারেল তেল সরবরাহ করেছে। অর্থাৎ দৈনিক হিসাবে প্রায় ২৩ লাখ ব্যারেল।

এই বাড়তি সরবরাহে বড় ভূমিকা রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল, কাজাখস্তান, ভেনেজুয়েলা ও নাইজেরিয়া।

গত ফেব্রুয়ারি থেকে আগস্টের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদন বেড়েছে দৈনিক ৫ লাখ ২০ হাজার ব্যারেল, ব্রাজিলের ৪ লাখ ৭০ হাজার, কাজাখস্তানের ৪ লাখ ৪০ হাজার, ভেনেজুয়েলার ৩ লাখ ও নাইজেরিয়ার ২ লাখ ব্যারেল।

কিন্তু, এখানেও একটি বড় সীমাবদ্ধতা আছে। মধ্যপ্রাচ্যের কয়েক কোটি ব্যারেলের স্বাভাবিক সরবরাহকে অন্য দেশগুলো রাতারাতি প্রতিস্থাপন করতে পারে না।

সংকট মোকাবিলায় আরেকটি বড় অস্ত্র হলো বিভিন্ন দেশের কৌশলগত তেল মজুত।

গত মার্চে আইইএ-র সদস্য দেশগুলো জরুরি প্রয়োজনের জন্য মজুত রাখা ৪০ কোটি ব্যারেল তেল বাজারে ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এটি ছিল সংস্থাটির ইতিহাসে জরুরি মজুত বাজারে ছাড়ার সবচেয়ে বড় উদ্যোগ।

তবে মজুত তেল নতুন সরবরাহ নয়। এটি মূলত সংকটের সময় বাজারে অতিরিক্ত তেল এনে দামের চাপ ও সরবরাহ ঘাটতি সাময়িকভাবে সামাল দেওয়ার ব্যবস্থা। এই মজুতেরও সীমা আছে।

আইইএ জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরুর পর ছয় মাসে বিশ্বজুড়ে দৃশ্যমান তেলের মজুত ৫০ কোটি ৭ লাখ ব্যারেল কমেছে। অর্থাৎ দীর্ঘমেয়াদি সংকট চলতে থাকলে এই ‘জরুরি তেল’ও একসময় কমে আসবে।

তেলের ক্ষেত্রে বিকল্প সরবরাহের কিছু সুযোগ থাকলেও প্রাকৃতিক গ্যাসের পরিস্থিতি আরও জটিল।

গ্যাসকে তেলের মতো সহজে বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পাঠানো যায় না। পাইপলাইনের বাইরে সমুদ্রপথে গ্যাস পাঠাতে হলে সেটিকে প্রথমে তরল বা এলএনজিতে রূপান্তর করতে হয়।

এজন্য প্রয়োজন বিশেষায়িত এলএনজি উৎপাদনকেন্দ্র, এলএনজি পরিবহনকারী জাহাজ ও আমদানি-উপযোগী টার্মিনাল।

হরমুজ প্রণালি দিয়ে স্বাভাবিক সময়ে বিশ্বের মোট এলএনজি বাণিজ্যের প্রায় ২০ শতাংশ হয়। এর বড় অংশ আসে কাতার থেকে।

আইইএ বলছে, হরমুজ দিয়ে এলএনজি সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হলে অন্য দেশের বিদ্যমান স্থাপনা দিয়ে এই ঘাটতি স্বল্প সময়ে পূরণ করা সম্ভব নয়। ইতোমধ্যে বেশিরভাগ এলএনজি উৎপাদনকেন্দ্রই প্রায় পূর্ণ সক্ষমতায় চলছে।

তবে কাতারের বিকল্প হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া ও আফ্রিকার কয়েকটি দেশ থেকে বাড়তি এলএনজি আসতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে বিশ্ব এলএনজি বাজারে বড় সরবরাহকারী হয়ে উঠেছে। নতুন কয়েকটি প্রকল্প থেকে আগামী বছরগুলোতে আরও এলএনজি বাজারে আসার কথা।

এই সংকটে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে ‘সময়’।
নতুন এলএনজি প্রকল্পের অনুমোদন, অর্থায়ন, নির্মাণ ও উৎপাদন শুরু করতে কয়েক বছর লাগে। ফলে আজ কাতারের সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে আগামীকাল নতুন একটি এলএনজি প্রকল্প চালু করে সেই ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব নয়।

এই কারণেই মধ্যপ্রাচ্যের গ্যাস সরবরাহ দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে বিভিন্ন দেশের মধ্যে একই এলএনজি চালানের জন্য প্রতিযোগিতা বাড়বে।

হরমুজ দিয়ে যাওয়া এলএনজির বড় অংশের ক্রেতা এশিয়ার দেশগুলো। চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মতো দেশগুলো মধ্যপ্রাচ্যের এলএনজির ওপর গুরুত্বপূর্ণভাবে নির্ভরশীল। হরমুজ দিয়ে যাওয়া এলএনজির প্রায় ৯০ শতাংশই এশিয়ার বাজারে যায়।

আইইএ-র গ্যাস মার্কেট রিপোর্টের তৃতীয় প্রান্তিকের হিসাবে, কাতারের সরবরাহ কমে যাওয়ার পর এশিয়ার স্পট মার্কেটে এলএনজির দাম যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় ৪৫ শতাংশ বেড়েছে।

গত ১৭ সেপ্টেম্বর রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়—উচ্চদামের কারণে চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো উত্তর-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো এলএনজি ব্যবহার কমিয়ে কয়লা, পারমাণবিক বিদ্যুৎ ও নিজস্ব গ্যাসের ব্যবহার বাড়ানোর চেষ্টা করছে।

ইউরোপও একই বাজার থেকে এলএনজি কিনছে। ফলে এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে এলএনজি কেনার প্রতিযোগিতা বাড়ছে।

এই জায়গায় বাংলাদেশের ঝুঁকি সবচেয়ে স্পষ্ট।

আইইএ-র হিসাবে—২০২৫ সালে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তান তাদের মোট এলএনজি আমদানির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পেয়েছে। ফলে এই পথের সরবরাহ দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে তিন দেশের ওপরই বড় চাপ পড়তে পারে।

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৪ সালে দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রায় অর্ধেক এসেছে গ্যাসচালিত কেন্দ্রগুলো থেকে।

ফলে এলএনজি সরবরাহ কমে গেলে প্রথম ধাক্কা পড়তে পারে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। এরপর এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়বে গ্যাসনির্ভর শিল্পে। বিশেষ করে, সার উৎপাদন কমে গেলে এর প্রভাব কৃষি ও খাদ্য সরবরাহেও পড়তে পারে।

অন্যদিকে, বেশি দামে এলএনজি আমদানি করতে হলে বাড়বে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সরকারের ব্যয়। শেষ পর্যন্ত সেই বাড়তি ব্যয়ের একটি অংশ ভোক্তার ওপরও পড়তে পারে। অর্থাৎ, বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি শুধু গ্যাস পাওয়া না পাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিদ্যুৎ, শিল্প, সার, কৃষি ও জীবনযাত্রার ব্যয়।

অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকবে দেশগুলো। ইতোমধ্যে এর ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

বেশি দামের কারণে এশিয়ার কয়েকটি দেশ গ্যাসের পরিবর্তে কয়লা ও পারমাণবিক বিদ্যুতের দিকে ঝুঁকছে। অন্যদিকে, ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন উৎস থেকে এলএনজি আমদানি বাড়ানো হয়েছে।

আইইএ-র বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ২০৩৫ সালের মধ্যে বৈশ্বিক জ্বালানি চাহিদার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বিদ্যুৎ দিয়ে মেটানো সম্ভব হতে পারে। এর ফলে জ্বালানি আমদানির খরচ কমতে পারে এবং তেলের ওপর নির্ভরশীলতাও কমবে।

বিদ্যুৎচালিত গাড়ি, বৈদ্যুতিক শিল্পযন্ত্র, সৌর-বায়ু-পারমাণবিক বিদ্যুৎ এবং আরও দক্ষ বিদ্যুৎব্যবস্থা—সব মিলিয়ে দেশগুলো চাইছে এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে, যেখানে একটি নির্দিষ্ট অঞ্চল থেকে তেল-গ্যাস আসা বন্ধ হয়ে গেলেই পুরো অর্থনীতি থমকে যাবে না।

নতুন তেলক্ষেত্র তৈরি করতে সময় লাগে। আইইএ-র হিসাবে, নতুন প্রচলিত তেল-গ্যাস প্রকল্প চালু করতে অনুসন্ধান থেকে প্রথম উৎপাদন পর্যন্ত সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গড়ে প্রায় ২০ বছর সময় লেগেছে।

নতুন এলএনজি প্রকল্পের ক্ষেত্রেও চূড়ান্ত বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত থেকে উৎপাদন শুরু হতে গড়ে চার থেকে পাঁচ বছর লাগে।

কৌশলগত তেলের মজুতও সীমিত এবং এগুলো মূলত সাময়িক সরবরাহ-বিঘ্ন সামাল দেওয়ার জন্য।

অন্যদিকে, কয়লার ব্যবহার বাড়ালে কার্বন নিঃসরণ ও পরিবেশগত চাপ বেড়ে যায়। পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পেও বড় মূলধন বিনিয়োগ ও নির্মাণে দীর্ঘ সময় প্রয়োজন হয়।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত বাস্তবতা।

যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র নয় এমন কোনো দেশ পরমাণু কর্মসূচি এগিয়ে নিলে, বিশেষ করে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বা পারমাণবিক জ্বালানি তৈরির সক্ষমতা বাড়ালে, তা নিয়ে অস্ত্র তৈরির সম্ভাবনা ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক উদ্বেগ তৈরি হতে পারে। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ ইরান।

ইরান বরাবরই বলে আসছে—তাদের পরমাণু কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ ও বেসামরিক উদ্দেশ্যে।

তবে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) বলছে—দেশটির কয়েকটি অঘোষিত স্থানে পাওয়া ইউরেনিয়ামের চিহ্ন এবং সেগুলোর ব্যাখ্যা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অমীমাংসিত প্রশ্ন রয়েছে। ২০২৫ সালের জুনে আইএইএ-র বোর্ড অব গভর্নরস ইরানকে তার পারমাণবিক নিরাপত্তা-সংক্রান্ত বাধ্যবাধকতা পালনে ব্যর্থ বলে ঘোষণা করে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধে দেশটির পরমাণু কর্মসূচিও হামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হয়ে ওঠে।

গত ৪ মে রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়—যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধের প্রধান লক্ষ্য ছিল ইরানকে পরমাণু অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখা। তবে একই সময়ে ইরানের প্রচলিত সামরিক সক্ষমতা ও সামরিক-শিল্প অবকাঠামোতেও হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র।

অপরদিকে, নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদন ও ব্যবহার বাড়াতে প্রয়োজন নতুন গ্রিড ও বিদ্যুৎ সংরক্ষণ ব্যবস্থা।

তাই সরবরাহ বাড়ানোর পাশাপাশি আরেকটি কাজ করতে হয়, তা হলো—চাহিদা কমানো।

গত ১৮ সেপ্টেম্বর আইইএ-র প্রতিবেদনে বলা হয়—গত ছয় মাসে বিশ্বে তেলের চাহিদা ফেব্রুয়ারির তুলনায় গড়ে প্রতিদিন ৫৮ লাখ ব্যারেল কমেছে। বেশি দাম, সরবরাহ সংকট ও বিভিন্ন দেশের জরুরি সংরক্ষণ নীতির কারণে এই চাহিদা কমেছে।

চীনেও তেলের ব্যবহার আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

অর্থাৎ, সরবরাহ কমে গেলে বাজারের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া শুধু নতুন উৎস খোঁজা নয়। এর ফলে দাম বেড়ে যায়, ব্যবহার কমে যায় এবং মানুষ ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান বিকল্প জ্বালানির দিকে ঝুঁকে।

মধ্যপ্রাচ্যের তেল-গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলে বিশ্বের সামনে কোনো একক বিকল্প নেই।

কিছু তেল আসবে সৌদি আরব ও আরব আমিরাতের বিকল্প রুট দিয়ে। যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল, কাজাখস্তানসহ অন্য উৎপাদকরা উৎপাদন বাড়াবে। কৌশলগত মজুত থেকে তেল ছাড়া হবে। এলএনজির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া ও আফ্রিকার সরবরাহের ওপর চাপ বাড়বে।

এর পাশাপাশি কোথাও কয়লা, কোথাও পারমাণবিক বিদ্যুৎ, কোথাও নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদন বাড়ানো হবে।

সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি হয়তো আসবে ব্যবহারকারীর দিক থেকে—দাম বাড়লে কমবে জ্বালানির ব্যবহার।

অর্থাৎ, মধ্যপ্রাচ্যের তেল-গ্যাসের বিকল্প আছে। কিন্তু একই সময়ে, একই পরিমাণে ও একই দামে সেই বিকল্প সবার হাতের নাগালে থাকবে না।

আর এই বর্তমান সংকটের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত সেখানেই—জ্বালানির নিরাপত্তা শুধু বেশি তেল-গ্যাস মজুত করার বিষয় নয়; বরং কোথা থেকে জ্বালানি আসছে, কতগুলো বিকল্প পথ আছে এবং কোনো একটি উৎস বন্ধ হয়ে গেলে অর্থনীতি কত দ্রুত অন্য ব্যবস্থায় যেতে পারে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

Related Articles

Latest Posts