ভোটবাক্সে মমতার ‘অগ্নিপরীক্ষা’?

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে অভিযোগের যেন অন্ত নেই। দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, বেকারত্ব, অনুপ্রবেশ, অরাজকতা ইত্যাদি। এসব অভিযোগ মূলত মমতাবিরোধীদের।

দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গ শাসন করছেন মমতা। ক্ষমতায় তার তৃণমূল। তাই শাসক পরিবর্তনের মনোভাব ‘তুঙ্গে’ বলে মন্তব্য করছেন তৃণমূলের বিরুদ্ধজনেরা।

এমন বাস্তবতায় প্রশ্ন— ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন কি তৃণমূলপ্রধান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য ‘অগ্নিপরীক্ষা’? নাকি, তা আশঙ্কাই মাত্র?

এ কথা সবাই জানেন যে, ২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্টের ৩৪ বছরের শাসনের অবসান ঘটেছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ধরে। সেসব এখন ইতিহাস। কারও কাছে তা ‘সোনালি অতীত’। কারও কাছে ‘পুরোনো কাসুন্দি’।

মমতাবিরোধীরা এবার ‘পরিবর্তনের ডাক’ দিয়েছেন। তারা দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসকগোষ্ঠীকে এবার বিরোধীর বেঞ্চে বসানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন। মুখ্যমন্ত্রীর ভাষায়—‘ওরা সব চেষ্টা করে যাচ্ছে।’

এ জন্য ভিন রাজ্য থেকে ‘লোক’ আনা হচ্ছে—বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি।

শুধু তাই নয়, খোদ রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে তৃণমূলকে হারানোর পাঁয়তারা চলছে বলেও অভিযোগ ঘাসফুলপ্রেমীদের।

কিন্তু, সাধারণ ভোটাররা কী ভাবছেন?

পশ্চিমবঙ্গের গণমাধ্যমগুলোয় ভোটার প্রতিক্রিয়ায় দুই ধরনের ভাষ্য পাওয়া যাচ্ছে। একদল বলছে, মমতার ‘বিকল্প’ নেই। অন্যদল বলছে, ‘আগামী ৫ মে দেখা যাবে বিকল্প কে বা কারা’।

তৃণমূলের সমর্থকরা আশাবাদী, ‘দিদিই ফিরবে’। তৃণমূলের মূল প্রতিপক্ষ বিজেপির সমর্থকরা বলছেন—‘ওর দিন শেষ’।

পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকের বক্তব্য: গত বিধানসভা নির্বাচনেও বিজেপি এমন প্রচারণা চালিয়েছিল যে তারাই নিশ্চিত ক্ষমতায় আসছে। বাস্তবে দেখা গিয়েছিল, মানুষের ভরসা ছিলেন মমতাই।

এবারও বিজেপি তেমন প্রচারণা চালালেও পশ্চিমবঙ্গে তাদের সাংগঠনিক ভিত্তি তুলনামূলক দুর্বল বলে মনে করেন অনেকে।

বিশ্লেষকদের কারও কারও মত: বিজেপি গণমানুষের মুক্তির কথা না বলে গোষ্ঠী স্বার্থকে তুলে ধরছে। তারা মোটা দাগে মুসলিমবিরোধী মনোভাব নিয়েই নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। বিজেপি নেতাদের আচরণ জনমনে প্রশ্ন তৈরি করছে।

বঙ্গ বিজেপির বিরুদ্ধে শুধু মুসলিমবিরোধী নয়, এখন ‘বাঙালিবিরোধী’ তকমাও লেগেছে। তারা তাদের ‘ভাবমূর্তি’ রক্ষায় বেশি ব্যস্ত বলেও মন্তব্য করছেন বিশ্লেষকদের একাংশ।

গত ১৬ এপ্রিল আনন্দবাজার পত্রিকার এক পডকাস্টে কলকাতার সেন্টার ফর স্ট্যাডিজ ইন সোশ্যাল সায়েন্সেস-এর শিক্ষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মইনুল ইসলাম বলেন, ‘তৃণমূলের শাসনামল থেকে দুর্নীতি পশ্চিমবঙ্গে বড় ইস্যু হয়েছে। আগে কখনো এমনটি দেখা যায়নি যে মন্ত্রীরা জেলে আছেন অথচ তাদের মন্ত্রীত্ব যাচ্ছে না।’

‘সমীক্ষা বলছে, মানুষ দুর্নীতিকে বড় ইস্যু মনে করছে না।’

সাংবাদিক শুভাজিৎ বাগচীর সঙ্গে মইনুল ইসলামের আলোচনায় আরও জানা গেল—তৃণমূলের লোকই বলছে যে তিনি বাড়ি করেছেন, তার থেকে টাকা নেওয়া হয়েছে। এটা অন্য রাজ্যেও আছে এবং অতীতেও এটা পশ্চিমবঙ্গে ছিল। কিন্তু, মনে হচ্ছে এটা যেন বাড়াবাড়ি জায়গায় পৌঁছেছে।

মইনুল ইসলামের মতে, মানুষ দৃশ্যমান উন্নয়ন দেখতে চায়। কাঁচা রাস্তা পাকা, খাওয়ার পানির ব্যবস্থা ইত্যাদি।

গত ২২ এপ্রিল একই দৈনিকের ‘এমন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েননি মমতা?’ শীর্ষক অপর এক পডকাস্টে অধ্যাপক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ক্যালকাটা রিসার্চ গ্রুপের রণবীর সমাদ্দার বলেন, ‘গত নির্বাচনের তুলনায় এবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওপর চাপ বেশি। নির্বাচন কমিশনসহ কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিষ্ঠানগুলোর চাপ গত নির্বাচনের তুলনায় এবার বেশি।’

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির ‘আগ্রাসন’ ঠেকানো তৃণমূলের একার পক্ষে কষ্টকর বলেও মনে করছেন তিনি।

ওই পডকাস্টে জানা যায়, পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এখনো পর্যন্ত সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক নেতা। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে, ‘বিশাল’ সংখ্যক মুসলিম ভোট।

আরও জানা যায়, পশ্চিমবঙ্গে এবারের ভোটার তালিকা থেকে সবচেয়ে বেশি বাদ গেছে দলিত ও মুসলমানদের নাম। সংখ্যায় কম হলেও উচ্চবর্ণের হিন্দুদের নামও বাদ গেছে।

বক্তারা জানালেন—দলিত ও মুসলমানরা বিজেপিকে ‘ভয়’ পায়। বিজেপিশাসিত কেন্দ্রীয় সরকার ধীরে ধীরে ‘গণবিরোধী’ হয়ে যাচ্ছে। তারা নিজ দেশের জনগণকে মৌলিক রাজনৈতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করছে। নিজ দেশের নাগরিক হয়েও মানুষ তাদের নাগরিকত্ব পাওয়া বা রক্ষা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছে।

 

 

পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভার মোট আসন ২৯৪টি। সরকার গড়তে প্রয়োজন ১৪৮ আসনের। রাজ্যটিতে মুসলমানের সংখ্যা ৩০ শতাংশের মতো। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিধানসভার ১০০ থেকে ১১০ আসনে প্রার্থীদের জয়-পরাজয়ে মুসলমান ভোটাররা ‘গুরুত্বপূর্ণ’ ভূমিকা রাখেন।

‘নির্ভীক’ নেত্রী হিসেবে পরিচিত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে রাজ্যের মুসলিম ভোটারদের ‘অবদান’ আছে। তবে কোনোকিছুই যেহেতু চিরস্থায়ী নয়, তাই মমতার আসন-শাসন কতদিন টিকবে তাই যেন এখন বড় প্রশ্ন।

বিজেপি নিজেদের ক্ষমতায় আনতে পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুদের ‘এক জোট হওয়ার’ ডাক দিয়েছে।

আর অনেকের মতে, এটাই মমতার ‘ভয়’।

গতকাল ২৩ এপ্রিল পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার প্রথম দফা নির্বাচনে ২৩ জেলার মধ্যে ১৬ জেলার ১৫২ আসনে ভোট হয়।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম থেকে জানা যায়—এইদিন দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার মথুরাপুরে জনসমাবেশে দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ‘সুরক্ষিত, সমৃদ্ধ, বিকশিত পশ্চিমবঙ্গের জন্য ভোট’ দেওয়ার আহ্বান জানান।

তিনি বিজেপি নেতাদের জেতানোর অনুরোধ করেন।

পাশাপাশি, ‘অনুপ্রবেশকারী’ প্রসঙ্গও তোলেন প্রধানমন্ত্রী মোদি। তৃণমূলের মদতে অনুপ্রবেশকারীরা পশ্চিমবঙ্গে ঢুকছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

মোদির ভাষ্য: ‘যখনই অনুপ্রবেশের বিরুদ্ধে আমরা কথা বলি, তখনই ওরা (তৃণমূল) প্রতিবাদ করে। (রাজ্যে) ক্ষমতায় এলে অনুপ্রবেশকারীদের প্রতি আমরা কোনো সহানুভূতি দেখাবো না।’

তার অভিযোগ—পশ্চিমবঙ্গে সব কাজে টাকা দিতে হয়। চাকরি পেতে ঘুষ দিতে হয়।

অন্যদিকে, হুগলী জেলার বলাগড়ে এক নির্বাচনী সভায় দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মমতাকে ‘বিদায়’ জানানোর জন্য ভোটারদের কাছে আহ্বান জানিয়েছেন।

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় আসছে বলেও ভবিষ্যৎবাণী করেন তিনি। তার ভাষ্য: আগামী ৫ মে বিজেপি রাজ্যে সরকার গড়তে যাচ্ছে। মমতার দল বা তৃণমূল ‘ধুয়েমুছে’ সাফ হয়ে যাচ্ছে, বলেও মন্তব্য করেন এই নেতা।

বিজেপির এই ২ শীর্ষ নেতা পশ্চিমবঙ্গে ব্যাপক উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি ক্রমাগত দিয়ে যাচ্ছেন। শুধু তাই নয়, বিজেপি বিজয়ী হলে তরুণদের সহায়তা ভাতা বর্তমানে মমতার দেওয়ার ভাতা থেকে বাড়িয়ে দ্বিগুণ করার কথাও কথা বলা হচ্ছে।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর ভোটার প্রতিক্রিয়ায় দেখা যাচ্ছে—বিজেপির এমন ‘প্রতিশ্রুতি’ অনেককে আকৃষ্ট করছে। অনেকে বলছেন, ‘মমতাকে তো দেখা হলো ১৫ বছর। এবার বিজেপিকে দেখলে দোষ কোথায়?’

গত ২২ এপ্রিল ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছিল—ভোটের এই সময়ে অমিত শাহ টানা ৭ দিন তথা আগামী ২৭ এপ্রিল পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে থাকছেন।

বিজেপি সমর্থকদের কেউ বলছেন, অমিত শাহ পশ্চিমবঙ্গের মাটি কামড়ে পড়ে আছেন, যাতে ভোটের সময় সংঘাত না হয়। বিপরীতে, তৃণমূল সমর্থকদের কেউ বলছেন, ‘বিজেপিকে ভোটে জেতাতে মরিয়া অমিত শাহ।’

নির্বাচন উপলক্ষে পশ্চিমবঙ্গকে নিরাপত্তার ‘চাদর’ নয় বরং ‘কম্বলে’ মুড়ে দেওয়া হয়েছে বলে দেশটির সংবাদমাধ্যম থেকে জানা যাচ্ছে। এ নিয়ে বিজেপি ‘আনন্দিত’ হলেও ‘আতঙ্কিত’ তৃণমূল। রাজ্যে ক্ষমতাসীন দলটির পক্ষ থেকে আশঙ্কা করা হচ্ছে, ‘এসব নিরাপত্তা মূলত গোপনে ভোট চুরির কৌশল।’

এত কঠোর নিরাপত্তার মধ্যেও বীরভূম জেলার দুবরাজপুরে পুলিশ ও অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের ওপর হামলার দৃশ্য দেশটির গণমাধ্যমে বেশ প্রচার পেয়েছে। গত ২৩ এপ্রিল নিউজ এইটটিন-এর এক ভিডিও প্রতিবেদনের শিরোনাম করা হয়—‘তৃণমূলকে ভোট দিলে ভোট পড়ছে বিজেপিতে!’

প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, সেখানে ইভিএম কারচুপির অভিযোগ উঠায় উত্তেজিত জনতা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর ইট-পাটকেল ছোড়ে। পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর করে। এ ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যসহ বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কেন্দ্রীয় বাহিনীকে এগিয়ে আসতে হয়।

বিশ্লেষকদের কেউ কেউ বলছেন, মুসলিম ভোটারদের ওপর ‘ভরসা’ করে মমতা সরকার গড়ার স্বপ্ন দেখলেও মুসলিমদের একাংশ মমতার ওপর ক্ষুব্ধ। তাদের একটি অংশ তৃণমূলের প্রতীক ‘ঘাসফুল’ থেকে মুখ সরিয়ে নিলে খুব অল্প ব্যবধানে হলেও বিজেপির বিজয় সম্ভব হতে পারে।

পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের দ্বিতীয় দফা ভোট আগামী ২৯ এপ্রিল। সেদিনও সব দলের প্রার্থীর প্রত্যাশা থাকবে বিজয়ী হওয়ার। ধরে নেওয়া যায়, সেদিনও কেন্দ্র-রাজ্যের ক্ষমতাসীনদের ‘কথা ছোড়াছুড়ি’ হবে।

ইতোমধ্যে অমিত শাহ হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ‘দিদির (মমতার) গুন্ডাদের বলে যাচ্ছি, ২৯ তারিখেও তারা যেন ঘরের বাইরে না বেরোয়!’ আজ আনন্দবাজারের এক প্রতিবেদনে অমিত শাহের বক্তব্য তুলে ধরে বলা হয়—‘৫ তারিখের পর আপনার (মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়) ও ভাইপোর (অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়) সময় শেষ হবে। এখানে বিজেপির সরকার তৈরি হবে।’

তিনি ‘অনুপ্রবেশকারীদের’ দেশ ছাড়া করারও হুমকি দেন।

তবে মমতার ‘ভয়’ কাটার অপেক্ষায় থাকতে হবে আগামী ৪ মে পর্যন্ত।

সেদিন জানা যাবে ভোটবাক্সে ‘অগ্নিপরীক্ষা’ আসলে কার ছিল, মমতার নাকি অন্য কোনো নেতার।
 

Related Articles

Latest Posts