বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে রাত ৮টায় দোকান বন্ধ: বিক্রি কমেছে ৩০% পর্যন্ত

রাত ৮টার মধ্যে দোকান বন্ধ করতে নির্দেশনা আছে সরকারের। সরকার বিদ্যুৎ সাশ্রয় করার জন্য এই পদক্ষেপ নিলেও জুতা ও ফ্যাশন পণ্যের বিক্রেতারা বলছেন এতে তাদের বিক্রি প্রায় ৩০ শতাংশ কমে গেছে।

বিদ্যুৎ সংকটের কারণে গত আগস্টে সারা দেশের দোকান, বাজার ও শপিং মল রাত ৮টার মধ্যে বন্ধ করার নির্দেশ দেয় সরকার। আগে রাত ১০টা পর্যন্ত দোকান খোলা রাখা যেত।

দীর্ঘদিনের মূল্যস্ফীতিতে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। এর মধ্যে কেনাকাটার সময় কমে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে বিক্রিতেও। অথচ দোকানভাড়া, কর্মীদের বেতনসহ অন্যান্য খরচ আগের মতোই আছে, বরং কিছু ক্ষেত্রে বেড়েছে। ফলে বিক্রি কমার পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের মুনাফায় আরও চাপ পড়ছে।

ফ্যাশন ব্র্যান্ড কে ক্রাফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক খালিদ মাহমুদ খান বলেন, গত এক মাসে বিক্রি কমেছে। নগদ অর্থের প্রবাহে বড় চাপ তৈরি হয়েছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে মানুষ সাধারণত সূর্য ডোবার পর কেনাকাটায় বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। বিশেষ করে গরমের সময় সন্ধ্যার পর কেনাকাটা করতেই বেশি পছন্দ করেন অনেকে। তাই দোকান খোলা রাখার সময় কমিয়ে দেওয়ায় দীর্ঘদিনের এই অভ্যাসে ব্যাঘাত ঘটছে।

খালিদ মাহমুদ খানের হিসাবে, মূল্যস্ফীতি ও কেনাকাটার সময় কমে যাওয়ায় গত এক মাস ফ্যাশন ও লাইফস্টাইল পণ্যের বিক্রি প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ কমেছে।

তিনি বলেন, খরচ বেড়েছে, কিন্তু আয় কমেছে। অথচ কর্মীদের বেতন ও দোকানভাড়া কমেনি।

বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের অংশ হিসেবে সরকার প্রথমে গত এপ্রিল মাসে দোকান, বাজার ও শপিং মল সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছিল। ব্যবসায়ীদের চাপের মুখে পরে তা সন্ধ্যা ৭টা করা হয়।

 ঈদুল আজহায় সাময়িকভাবে রাত ১০টা পর্যন্ত দোকান খোলার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। এরপর আবার দোকান বন্ধের সময় সন্ধ্যা ৭টা করা হয়। গত ১১ জুন তা বাড়িয়ে রাত ৯টা করা হয়। সর্বশেষ নির্দেশনায় রাত ৮টার মধ্যে দোকান বন্ধ করতে বলা হয়েছে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, বারবার দোকান বন্ধের সময় পরিবর্তন করায় বিক্রি ও কর্মীদের কাজের সময় ঠিক করে পরিকল্পনা করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

যেসব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বিক্রি সন্ধ্যার পর বেশি হয়, তারাই সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছে।

দেশের অন্যতম বড় জুতা প্রস্তুতকারক ও বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান অ্যাপেক্স ফুটওয়্যার জানিয়েছে, তাদের দেশে মোট বিক্রির প্রায় ৬০ শতাংশই সাধারণত রাত ৮টার পর হয়।

প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফিরোজ মোহাম্মদ বলেন, সর্বশেষ দোকান বন্ধের সময় কমানোর পর দেশের বাজারে তাদের ব্যবসা ২০ থেকে ৩০ শতাংশ কমেছে। রাত ৮টায় দোকান বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত আমাদের ব্যবসায় খুব বড় প্রভাব ফেলছে।

দেশে ২৪০টি আউটলেট পরিচালনা করা লোটো বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী জামিল ইসলাম বলেন, সর্বশেষ নির্দেশনার এক মাসের মধ্যেই তাদের বিক্রি প্রায় ২০ শতাংশ কমেছে। আমাদের মূল বিক্রি হয় সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ৯টার মধ্যে।

বিক্রি কমলেও দোকানভাড়া ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় আগের মতোই আছে বলে জানান তিনি।

আন্তর্জাতিক খুচরা বিক্রয় প্রতিষ্ঠান মোস্তাফা মার্টও জানিয়েছে, সর্বশেষ নির্দেশনার পর তাদের ব্যবসায় বড় ধরনের পতন হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপক (হিসাব ও অর্থ) বিএম সালেহ মুসা বলেন, ক্রেতারা সাধারণত সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১০টার মধ্যে কেনাকাটা করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। স্বাভাবিক বিক্রির তুলনায় গত এক মাসে আমাদের আয় প্রায় ৩০ শতাংশ কমেছে।

তিনি জানান, তাদের একটি শাখায় দৈনিক বিক্রি প্রায় ৩ লাখ টাকা থেকে কমে ৭০ হাজার টাকায় নেমেছে। রাত ৮টার পরও যেসব ক্রেতা পণ্য কিনতে আসেন, বিক্রয়কর্মীদের তাদের ফিরিয়ে দিতে হচ্ছে।

প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের খুচরা বিক্রয় চেইন ডেইলি শপিংও জানিয়েছে, দোকান খোলা রাখার সময় কমানোর প্রভাব পড়েছে তাদের ব্যবসায়।

উত্তরার একটি আউটলেটের ব্যবস্থাপক হিরণ মাহমুদ বলেন, এখনো ক্রেতাদের রাত ৮টার মধ্যে কেনাকাটা শেষ করার অভ্যাস হয়নি। ফলে বিক্রি ও আয়, দুটোর ওপরই প্রভাব পড়েছে।

ট্রান্সকম ইলেকট্রনিকস লিমিটেডের উত্তরার গাউসুল আজম অ্যাভিনিউ শাখার বিক্রিও নেমে গেছে। দোকান খোলা রাখার সময় কমানোর পর বিক্রি প্রায় ১০ শতাংশ কমেছে বলে জানিয়েছেন শাখাটির অপারেশন প্রধান মো. শরীফ সরকার।

তিনি বলেন, আমাদের দৈনিক গড় বিক্রি যদি ৪ লাখ টাকা হয়, তাহলে ১০ শতাংশ কমার অর্থ ৪০ হাজার টাকা কম বিক্রি। এখন দিনে প্রায় ৩ লাখ থেকে সাড়ে ৩ লাখ টাকা বিক্রি হচ্ছে।

আগে ওই শাখাটি রাত ১০টার পরও খোলা থাকত।

দোকান খোলা রাখার সময় কমেছে। এদিকে মানুষের ক্রয়ক্ষমতাও কমেছে এবং ব্যবসা পরিচালনার খরচ বেড়েছে।

জুতা ব্যবসায়ীরাও পেট্রোকেমিক্যালভিত্তিক কাঁচামালের দাম বাড়ার কারণে চাপের মধ্যে আছেন। এতে তাদের মুনাফাও কমেছে।

অ্যাপেক্সের ফিরোজ মোহাম্মদ বলেন, আমাদের ব্যবসার একটা অংশ রপ্তানি, আরেকটা দেশের বাজারের জন্য। রপ্তানি ব্যবসা থেকে খুব বেশি মুনাফা থাকে না।

তিনি বলেন, কাঁচামালের দাম বাড়লেও এর পুরোটা ক্রেতাদের ওপর চাপিয়ে দেয়নি অ্যাপেক্স। বাড়তি খরচের বড় একটি অংশ প্রতিষ্ঠান বহন করছে।

ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য বিক্রি কমে যাওয়া আর নির্দিষ্ট খরচ একই থাকা, দুটো মিলিয়ে পরিস্থিতি দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে।

বাংলাদেশ ফুটওয়্যার অ্যান্ড লেদার ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি ও ফাইভ-আর ফুটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. নাসির খান বলেন, চাহিদা কমে যাওয়া, বাড়তি খরচ ও সামগ্রিক জ্বালানি সংকটের কারণে তারা প্রায় ৭০টি আউটলেট স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দিয়েছেন।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের স্থানীয় বাজারে ব্যবসা চালানো এখন অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।

সরকার অবশ্য বলছে, বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি না হলে রাত ৮টার মধ্যে দোকান বন্ধ রাখার নিয়ম শিথিল করার সম্ভাবনা নেই।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মুহাম্মদ আরিফ সাদেক বলেন, এখনো লোডশেডিং হচ্ছে। বিদ্যুৎ সরবরাহও পর্যাপ্ত নয়। পরিস্থিতির উন্নতি না হলে বিষয়টি বিবেচনা করা সম্ভব নয়।

পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, সন্ধ্যার সময় বিদ্যুতের ঘাটতি এখনো উল্লেখযোগ্য।

গত ১৪ সেপ্টেম্বর রাত ৯টায় বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল ১৭ হাজার ৩৪৮ মেগাওয়াট। বিপরীতে সরবরাহ ছিল ১৫ হাজার ৪৩৫ মেগাওয়াট। অর্থাৎ ঘাটতি ছিল ১ হাজার ৯১৩ মেগাওয়াট।

শীতকালে সাধারণত বিদ্যুতের ব্যবহার কমে। তখন দোকান বন্ধের সময়ের এই বিধিনিষেধ তুলে নেওয়ার সম্ভাবনা আছে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, সেটা তখনকার পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে। পরিস্থিতির উন্নতি হলে বিষয়টা পুনর্বিবেচনা করা হবে।

Related Articles

Latest Posts