১৮৭৬ সালে প্রতিষ্ঠিত নোয়াখালী বর্তমানে একটি প্রথম শ্রেণীর পৌরসভা। প্রায় ১৭ দশমিক ১১ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই পৌরসভায় বাস করেন প্রায় দেড় লাখ মানুষ। তবে দেড়শ বছরের পুরোনো এই শহরের বর্জ্য অপসারণ ব্যবস্থা এখন চরম অব্যবস্থাপনার মুখোমুখি। যত্রতত্র ময়লার স্তূপ আর পচা দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন ৯টি ওয়ার্ডের বাসিন্দারা।
পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, শহরের ৯৩টি ডাস্টবিনে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫৫ মেট্রিক টন বর্জ্য জমা হয়। কিন্তু বিশাল এই পরিমাণ বর্জ্য অপসারণের জন্য পৌরসভার ৭টি গার্বেজ ট্রাকের মধ্যে ২টি দীর্ঘদিন ধরে অচল হয়ে পড়ে আছে।
ফলে মাত্র ৫টি ট্রাক দিয়ে জোড়াতালি দিয়ে কোনো রকমে চলছে পুরো শহরের বর্জ্য অপসারণের কাজ। পর্যাপ্ত গাড়ির অভাবে যথাসময়ে বর্জ্য পরিষ্কার করতে পারছে না পৌর কর্তৃপক্ষ।
গতকাল সোমবার সরেজমিনে দেখা যায়, নোয়াখালী সার্কিট হাউস ও ল’ইয়ার্স কলোনি সড়কের পশ্চিম পাশে কোনো ডাস্টবিন না থাকায় ময়লা-আবর্জনা উপচে পড়ছে সড়কের ওপর। ময়লার স্তূপে গবাদি পশু বিচরণ করছে।
এই সড়কটি ব্যবহার করেই প্রতিদিন নোয়াখালী সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়, সরকারি মহিলা কলেজ, সরকারি কলেজ, জেলা প্রশাসন স্কুল অ্যান্ড কলেজসহ বেশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা যাতায়াত করে।
পাশেই রয়েছে চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট, জেলা জজ আদালত, জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের কার্যালয়। বর্জ্যের তীব্র দুর্গন্ধে এই পথে পায়ে হেঁটে বা যানবাহনে চলাচল করা দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে।
গোলাম রাব্বানী নামে স্থানীয় এক মাদ্রাসা শিক্ষার্থী জানায়, খোলা জায়গায় গৃহস্থালির বর্জ্য ফেলায় সেখানে প্রতিনিয়ত কুকুর ও গরুর দল চরে বেড়ায়। অনেক সময় কুকুরের দল পথচারীদের তেড়ে আসায় নিরাপদে যাতায়াত করাও বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে।
ল’ইয়ার্স কলোনির বাসিন্দা নোয়াখালী সিটি কলেজের অধ্যক্ষ মো. আবুল বাসার বলেন, পৌর কর্তৃপক্ষ যদি নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ করত, তাহলে পথচারী ও শিক্ষার্থীদের এমন দুর্ভোগ পোহাতে হতো না।
একই চিত্র দেখা গেছে শহরের অভিজাত আবাসিক এলাকা হাউজিং এস্টেট দীঘির পশ্চিম পাড় এবং সোনাপুর-চৌমুহনী আঞ্চলিক মহাসড়কের শহীদ ভুলু স্টেডিয়াম সংলগ্ন চার লেন সড়কের ওপরও। সেখানে সড়কের একাংশ জুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে আবর্জনা।
এমনকি নোয়াখালী ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের মর্গের দক্ষিণ পাশেও আবর্জনা জমে থাকতে দেখা গেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নিয়মিত এই আবর্জনা পরিষ্কার করা হয় না। উপরন্তু হাসপাতালের সীমানা প্রাচীর লাগোয়া একটি বেসরকারি হাসপাতাল থেকে জানালা দিয়ে ময়লা-আবর্জনা জেনারেল হাসপাতালের ভেতরে ফেলা হচ্ছে। এতে হাসপাতালে আসা রোগী ও দর্শনার্থীরা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন।
পৌরসভার প্রবীণ বাসিন্দা আবদুর রহিম (৬০) ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, পৌর কর্তৃপক্ষ নিয়মিত ময়লা পরিষ্কার করে না। দুর্গন্ধে আমাদের ঘরে টেকাই দায় হয়ে পড়েছে।
বেসরকারি হাসপাতাল ব্যবসায়ী কবির উদ্দিন বলেন, আমরা নিয়মিত পৌরকর দিয়ে যাচ্ছি, কিন্তু ন্যূনতম সেবাটুকু পাচ্ছি না। শহরের যত্রতত্র আবর্জনার স্তূপ জমে থাকায় রোগব্যাধি ছড়ানোর আশঙ্কা বাড়ছে।
তবে যত্রতত্র বর্জ্য ফেলার পেছনে নাগরিকদের অসচেতনতাকেও দায়ী করছেন পৌরসভার কর্মকর্তারা। নোয়াখালী পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী বেলাল আহম্মেদ খান বলেন, পৌরবাসী নির্দিষ্ট ডাস্টবিনে ময়লা না ফেলে যেখানে-সেখানে ফেলছেন। এতেও বর্জ্য অপসারণে কিছুটা সমস্যা তৈরি হচ্ছে।
বর্জ্য অপসারণে নিজেদের সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করে পৌরসভার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম বলেন, সাতটি গার্বেজ ট্রাকের মধ্যে দুটি দীর্ঘদিন ধরে অকেজো হয়ে পড়ে আছে। সেগুলো মেরামতের জন্য পাঠানো হয়েছে। বর্তমানে পাঁচটি ট্রাক দিয়ে কাজ চালানো হচ্ছে। এর পাশাপাশি আমাদের লোকবল সংকটও রয়েছে। আমরা দ্রুত এই সমস্যাগুলো সমাধানের উদ্যোগ নিয়েছি। আশা করছি অচিরেই নাগরিক দুর্ভোগ লাঘব হবে।

