প্রিয় মানুষদের দেখতে দেশে এসেছেন ইলিয়াস কাঞ্চন

গুলশানের ফ্ল্যাটের দরজা পেরিয়ে ডাইনিংরুমে ঢুকতেই চোখে পড়ে দেওয়ালে টাঙানো কয়েকটি ছবি। একটি আদিল সিনেমার, অন্যটি কুংফু কন্যার। আরেকটি ছবিতে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছেন ইলিয়াস কাঞ্চন। পাশে প্রয়াত স্ত্রী জাহানারা কাঞ্চন, মেয়ে ইশরাত জাহান ইমা ও ছেলে মিরাজুল মঈন জয়। ছবিগুলো যেন সময় পেরিয়েও প্রাণবন্ত। সেখানে থমকে আছে একটি পরিবারের সুখের মুহূর্ত, একজন নায়কের জীবনের প্রিয় কিছু স্মৃতি।

দীর্ঘ ১৫ মাসেরও বেশি সময় লন্ডনে চিকিৎসাধীন থাকার পর কয়েক দিনের জন্য দেশে ফিরেছেন কিংবদন্তি অভিনেতা ইলিয়াস কাঞ্চন। অসুস্থ শরীর নিয়ে দেশে ফেরার পর তার কাছে যেন সবচেয়ে জরুরি হয়ে উঠেছে প্রিয় মানুষদের একবার দেখা। তাই গুলশানের বাসায় একে একে হাজির হয়েছেন তার দীর্ঘদিনের সহকর্মী ও স্বজনেরা। কেউ এসেছেন খোঁজ নিতে, কেউ পুরোনো দিনের গল্প করতে, কেউবা কেবল প্রিয় মানুষটিকে একনজর দেখতে।

দীর্ঘদিন পর কাছের মানুষদের পেয়ে কখনো স্মৃতিচারণ করেছেন ইলিয়াস কাঞ্চন, কখনো গান গেয়েছেন, কখনো গল্পে মেতেছেন। আবার কখনো আবেগ সামলাতে না পেরে নীরবে চোখ ভিজেছে তার।

ঘরের দেওয়ালে টাঙানো ছবিগুলোর দিকে তাকালেই বোঝা যায়, পরিবার তার কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ। ছেলে জয় জানান, দেয়ালে থাকা ছবিগুলোর প্রায় সবই তার বাবার খুব প্রিয়।

তিনি বলেন, ‘এখানে যে ছবিগুলো রয়েছে, এগুলো আব্বার খুবই প্রিয় ছবি। ড্রয়িংরুমে আরেকটা ছবি আছে আব্বুর ফুটবল নিয়ে, সেটাও খুব প্রিয়। আমাদের সঙ্গে যে ছবিটা, এটা ঢাকা ক্লাবে তোলা। তখন আমার বয়স পাঁচ। বাসায় দেওয়ালে যে ছবিগুলো দেখছেন, এগুলো আব্বুর খুব পছন্দের।’

এই ছবিগুলো কেবল দেওয়ালের সাজসজ্জা নয়। প্রতিটি ছবির সঙ্গে জড়িয়ে আছে তার জীবনের কোনো না কোনো গল্প। পরিবার, চলচ্চিত্র, বন্ধু ও দীর্ঘ ক্যারিয়ারের নানা স্মৃতি যেন ছবিগুলোর মধ্যেই ধরে রেখেছেন তিনি।

ডাইনিং টেবিলের পাশেই কয়েকটি বুকসেলফ। থরে থরে সাজানো অসংখ্য বই। তাকগুলোর দিকে তাকালেই বোঝা যায়, বই পড়ার অভ্যাস ছিল ইলিয়াস কাঞ্চনের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ।

দীর্ঘদিন অসুস্থতার কারণে বইয়ের পাতায় হয়তো কিছুটা ধুলো জমেছে। কিন্তু বইগুলো যেন এখনো অপেক্ষা করছে, কখন আবার প্রিয় মানুষটি এসে পাতা উল্টাবেন।

ড্রয়িংরুমের বিশাল শোকেসেও রয়েছে তার দীর্ঘ কর্মজীবনের অসংখ্য স্মৃতি। অভিনয়জীবনে পাওয়া পুরস্কার, ক্রেস্ট ও সম্মাননা দিয়ে সাজানো সেই শোকেস যেন তার দীর্ঘ পথচলার নীরব সাক্ষী। দেওয়ালের অন্য তাকেও রয়েছে আরও কিছু অর্জনের স্মারক।

গত ৩ আগস্ট দেশে ফেরার পর থেকেই গুলশানের ফ্ল্যাটে ইলিয়াস কাঞ্চনের সঙ্গে দেখা করতে আসছেন তার প্রিয় সহকর্মীরা। তাদের মধ্যে ছিলেন বরেণ্য অভিনেতা আলমগীর, শবনম, রোজিনা, আনোয়ারা, সুচন্দা, চম্পা, বাপ্পারাজ, মুক্তি, সম্রাট, চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির সদস্যরা এবং অভিনেত্রী দিতির মেয়ে লামিয়া চৌধুরীসহ আরও অনেকে।

দীর্ঘদিন পর সহকর্মীদের কাছে পেয়ে ইলিয়াস কাঞ্চনের ঘর যেন আবার ফিরে পেয়েছে পুরোনো দিনের আড্ডার আবহ। গল্প হয়েছে, স্মৃতিচারণ হয়েছে, গান হয়েছে। কখনো পুরোনো দিনের কোনো ঘটনা মনে করে হেসেছেন সবাই। আবার কখনো সেই স্মৃতিই এনে দিয়েছে আবেগ।

বরেণ্য এই অভিনেতা যখন গুলশানের নিজের ফ্ল্যাটের ড্রয়িংরুমে এসে বসলেন, তার চোখেমুখে তখন অনেক না বলা কথা। অসুস্থতার কারণে আগের মতো স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারছেন না। তবু প্রিয় মানুষদের দেখতে পাওয়ার আনন্দ তার চোখে স্পষ্ট।

দীর্ঘ ১৫ মাস প্রিয় মানুষদের কাছ থেকে দূরে থাকার পর দেশে ফিরে তাদের সঙ্গে দেখা করার জন্য যেন অস্থির হয়ে ছিলেন তিনি।

অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে থাকার পর এই প্রতিবেদককে ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, ‘নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলন এই দেশের মানুষ ভালোবাসা নিয়েই এগিয়ে নেবে। এটা আমার বিশ্বাস। দেশের মানুষের ওপর আমি সেই দায়িত্ব দিয়ে গেলাম। সিনেমার মানুষদের প্রতি আমার আজন্ম ভালোবাসা। বেঁচে থাকলে বড় ক্যানভাসে দেখা হবে। দেশে ফিরে এসে স্বস্তি পাচ্ছি। প্রিয় মানুষগুলোর সঙ্গে দেখা হচ্ছে, এটা আমার জন্য আনন্দের।’

কথাগুলো বলতে বলতে যেন তার দীর্ঘ কর্মজীবনের নানা অধ্যায় চোখের সামনে ভেসে ওঠে। চলচ্চিত্রের মানুষদের প্রতি তার ভালোবাসা, নিরাপদ সড়কের আন্দোলন এবং দেশের মানুষের সঙ্গে তার দীর্ঘ সম্পর্ক—সবকিছুই উঠে আসে কথায়।

২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে ব্রেন টিউমারের চিকিৎসার জন্য লন্ডনে ছিলেন ইলিয়াস কাঞ্চন। সেখানে মেয়ে ইমার বাসায় থেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন তিনি।

আগামী ১২ আগস্ট চিকিৎসার জন্য আবার ঢাকা ছাড়বেন এই কিংবদন্তি অভিনেতা।

তার বর্তমান শারীরিক অবস্থা জানতে চাইলে ছেলে জয় দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘সবার দোয়ায় আগের চেয়ে আব্বু ভালো আছেন। আব্বুকে আর কেমোথেরাপি দিতে হবে না। ১২ আগস্ট সেখানে গিয়ে ১৯ আগস্ট আব্বুর একটা পরীক্ষা করবেন। ডাক্তাররা আশাবাদী, আব্বু সুস্থ হয়ে উঠবেন।’

সম্প্রতি কয়েকটি গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়, ইলিয়াস কাঞ্চন নাকি অনেককে চিনতে পারছেন না। বিষয়টি নিয়ে ছেলে জয় বলেন, খবরটি সঠিক নয়।

তিনি বলেন, ‘অনেকে না জেনে সংবাদ করছেন। আব্বু সবাইকে চিনতে পারেন। তার মেমরিতে কোনো সমস্যা নেই। আব্বুর টিউমারটা হয়েছে ব্রেনের স্পিচ জায়গায়। এ কারণে তিনি অনেক সময় যেটি বলতে চান, সেটি গুছিয়ে প্রকাশ করতে পারছেন না।’

অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করছেন ইলিয়াস কাঞ্চন। সামনে আরও চিকিৎসা, আরও পরীক্ষা। কিন্তু এর মধ্যেও প্রিয় মানুষদের একবার দেখতে দেশে ফিরে আসার মধ্যে যেন অন্যরকম এক টান আছে।

গুলশানের সেই ঘরে দেওয়ালে টাঙানো ছবিগুলো, তাকভরা বই, শোকেসে সাজানো পুরস্কার আর প্রিয় সহকর্মীদের আনাগোনা—সব মিলিয়ে ইলিয়াস কাঞ্চনের এই দেশে ফেরা হয়ে উঠেছে স্মৃতি ও ভালোবাসায় ভরা আরেক অধ্যায়।

Related Articles

Latest Posts