সিয়াটলের মাঠ তখনও বেলজিয়ামের বাঁধনহারা উৎসবে মুখর। যুক্তরাষ্ট্রকে ৪-১ গোলে উড়িয়ে দিয়ে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার পর মাঠ ছাড়ার আগে সাংবাদিকদের সামনে দাঁড়িয়ে মনের কথাটা বলেই ফেললেন বেলজিয়াম মিডফিল্ডার নিকোলাস রাসকিন, ‘জীবনে কোথাও না কোথাও একটা বিচার ঠিকই থাকে।’ কথাটা নিছক জয়ের আনন্দ থেকে বলা নয়, এর পেছনে জড়িয়ে ছিল গত কয়েক দিনের এক অদ্ভুত নাটক, যার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার বিপক্ষে ম্যাচে লাল কার্ড দেখেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ গোলদাতা ফোলারিন বালোগান। নিয়ম অনুযায়ী পরের ম্যাচে তার খেলার কথা ছিল না। কিন্তু বুধবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেই ফোন করেন ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোকে, অনুরোধ জানান সিদ্ধান্তটি পর্যালোচনার। রোববার ফিফা জানিয়ে দেয়, বালোগানের নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করা হয়েছে। ফলে বেলজিয়ামের বিপক্ষে খেলার সুযোগ পান বালোগান।
তবে বিতর্কের কোনো প্রভাবই পড়েনি ম্যাচে। নবম মিনিটে চার্লস দে কেতেলেয়ারের গোলে এগিয়ে যায় বেলজিয়াম। মালিক টিলম্যান সমতা ফেরালেও আবারও গোল করেন দে কেতেলেয়ার। দ্বিতীয়ার্ধে হানস ভানাকেন ও বদলি নেমে রোমেলু লুকাকুর গোল ম্যাচটিকে ৪-১ ব্যবধানে নিয়ে যায়। বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু বালোগান ছিলেন প্রায় নিষ্প্রভ। শটের হিসাব (১৫-৭) ও এক্সপেক্টেড গোল (২.১৫-০.৬৭)-দুই ক্ষেত্রেই স্পষ্ট আধিপত্য ছিল বেলজিয়ামের।
ম্যাচ শেষে কয়েকজন বেলজিয়ান খেলোয়াড় ট্রাম্পের বিখ্যাত নাচ অনুকরণ করেন, দলের অফিসিয়াল অ্যাকাউন্ট থেকেও আসে কটাক্ষপূর্ণ পোস্ট। অধিনায়ক ইউরি টিলেম্যান্স জানান, বালোগান বিতর্কের পর দলীয় বৈঠকে সবাই মাঠেই জবাব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। থিবো কোর্তোয়া আবার রসিকতা করে বলেন, এসব বিতর্ক পড়ে তিনি বরং হেসেছেন, কারণ সেনেগালের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে হারানো নিয়ে তার আস্থা বেশি ছিল।
তবে বেলজিয়ামের সমর্থকদের কাছে ‘বিচার’ শব্দটির অর্থ আরও বড়। কারণ গত এক দশকের সবচেয়ে প্রতিভাবান দলগুলোর একটি হয়েও বিশ্বকাপ জিততে পারেনি তারা। ২০১৮ সালে কেভিন ডি ব্রুইনা, থিবো কোর্তোয়া, এডেন হ্যাজার্ড ও রোমেলু লুকাকুদের ‘সোনালী প্রজন্ম’ সেমিফাইনালে ফ্রান্সের কাছে হেরে তৃতীয় হয়। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে সেই প্রজন্মের পতন ঘটে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিয়ে। এরপর আক্ষেপ নিয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানান হ্যাজার্ড।
এবার সেই সোনালী প্রজন্মের শেষ কয়েকজন সদস্য, ৩৫ বছর বয়সী ডি ব্রুইনা, কোর্তোয়া ও লুকাকুকে নিয়েই বাজি ধরেছেন কোচ রুদি গার্সিয়া। এখন পর্যন্ত সেই বাজি সফলই বলা যায়। অধিনায়কত্বের দায়িত্ব অবশ্য এবার ইউরি টিলেম্যান্সের হাতে, যিনি মৌসুম শেষ করেছেন ইউরোপা লিগ জিতে।
যদিও বিশ্বকাপের শুরুটা মোটেও ভালো ছিল না বেলজিয়ামের। মিশরের সঙ্গে ১-১ ও ইরানের সঙ্গে গোলশূন্য ড্রয়ের পর তাদের আক্রমণভাগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। কিন্তু নিউজিল্যান্ডকে ৫-১ গোলে হারিয়ে গ্রুপসেরা হয়ে তারা নতুন ছন্দ খুঁজে পায়।
রাউন্ড অব ৩২-এ সেনেগালের বিপক্ষে ম্যাচে ৫১ মিনিটেই ২-০ গোলে পিছিয়ে পড়েছিল বেলজিয়াম। তবে ২০১৮ সালে জাপানের বিপক্ষে ম্যাচের স্মৃতি ফিরিয়ে এনে ঘুরে দাঁড়ায় দলটি। ৮৬ মিনিট পিছিয়ে থাকার পর লুকাকু ও টিলেম্যান্সের গোলে সমতায় ফেরে তারা। অতিরিক্ত সময়ের শেষ মুহূর্তে ভিএআরের সাহায্যে পাওয়া পেনাল্টি থেকে গোল করে অবিশ্বাস্য জয় এনে দেন টিলেম্যান্সই।
সেনেগালের বিপক্ষে মৃত্যুকূপ থেকে ফিরে আসা সেই দলকেই যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে দেখা গেছে আরও আত্মবিশ্বাসী, আরও পরিণত রূপে। গার্সিয়ার ৪-২-৩-১ ছকে টিলেমেন্স ও আমাদু ওনানার ডাবল পিভট মাঝমাঠে ভারসাম্য আনে, আর ডি ব্রুইনা পান নাম্বার টেন হিসেবে পূর্ণ স্বাধীনতা। চার্লস দে কেতেলেয়ার প্রায়ই ‘ফলস নাইন’ হিসেবে নিচে নেমে খেলেন, আর সেই ফাঁকা জায়গায় আক্রমণে যোগ দেন লিয়ান্দ্রো ত্রোসার্দ ও জেরেমি দোকু। রাসকিন, ওনানা ও টিলেমেন্সের সমন্বয় মাঝমাঠকে শক্তিশালী করেছে, আর পেছনে কোর্তোয়ার অভিজ্ঞতা রক্ষণকে দিয়েছে বাড়তি নিরাপত্তা।
ডি ব্রুইনার বয়সের কথা মাথায় রেখে তাকে হিসেব করে ব্যবহার করছেন গার্সিয়া। সেনেগালের বিপক্ষে ৫৬ মিনিট খেলানোর পর যুক্তরাষ্ট্র ম্যাচে প্রথমবারের মতো বেঞ্চে রাখা হয় তাকে। মৌসুমজুড়ে চোটে ভোগা লুকাকুকেও মূলত বদলি হিসেবেই ব্যবহার করা হচ্ছে, যাতে শেষ দিকে তার গতি ও শক্তি কাজে লাগে।
দুটি ড্র দিয়ে শুরু, এরপর নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে বড় জয়, সেনেগালের বিপক্ষে রোমাঞ্চকর প্রত্যাবর্তন এবং স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্রকে উড়িয়ে দেওয়া, প্রতি ম্যাচেই যেন আরও পরিণত হয়েছে বেলজিয়াম। এখন শুক্রবার লস অ্যাঞ্জেলেসে কোয়ার্টার ফাইনালে তাদের সামনে স্পেন। রাসকিনের বলা ‘বিচার’ ছিল ট্রাম্প-বালোগান বিতর্কের প্রসঙ্গে, কিন্তু ফুটবল রোমান্টিকরা চাইবেন সেই বিচার যেন আরও বড় হয়ে আসে একটি বিশ্বকাপ ট্রফির মাধ্যমে, যা এত বছর ধরে অধরাই রয়ে গেছে বেলজিয়ামের সোনালী প্রজন্মের কাছে।

