এক দশকেরও বেশি সময় ধরে অনলাইন বেটিং বা জুয়ার সাথে জড়িত খোরশেদ আলম (প্রকৃত নাম গোপন রাখা হয়েছে)। তিনি নিজে যেমন জুয়া খেলেছেন, তেমনি অনেককে এই অন্ধকার জগতের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন।
এই দীর্ঘ সময়ে ২৯ বছর বয়সী এই ব্যবসায়ী কাউকে দীর্ঘমেয়াদে লাভবান হতে দেখেননি। বরং তিনি দেখেছেন নিজের পাশাপাশি আরও অনেকের জীবনের সমস্ত সঞ্চয় শেষ হয়ে যেতে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি জানান, জুয়ার টাকার যোগান দিতে তিনি পরিবারের জমি ও গয়না পর্যন্ত বিক্রি করেছেন। এমন অনেক গল্প থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশে অনলাইন বেটিংয়ের বিস্তার বেড়েই চলেছে।
চলমান ফিফা বিশ্বকাপ অনলাইন জুয়ার কারবারে এক নতুন গতি সঞ্চার করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে বেটিং বা বাজির প্রচার ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ছে। জুয়া খেলার ওয়েবসাইটগুলো বাংলাদেশি ব্যবহারকারীদের কাছে এখনো সহজেই প্রবেশযোগ্য রয়ে গেছে।
সদস্য সংখ্যা এক লাখের বেশি- এমন একটি ফেসবুক গ্রুপ বিশ্বকাপ ম্যাচগুলোকে কেন্দ্র করে নিয়মিত বেটিংয়ের প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। এক লাখ ২৪ হাজারের বেশি সদস্য থাকা আরেকটি গ্রুপও একইভাবে এই কাজ করছে।
এই দুটির মতো আরও কয়েক ডজন ফেসবুক গ্রুপ ও প্রোফাইল বিশ্বকাপ ম্যাচগুলো ঘিরে সক্রিয়ভাবে বেটিংয়ের প্রচারণা চালাচ্ছে।
এর মধ্যে অনেকগুলো গ্রুপ টুর্নামেন্ট শুরু হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে খোলা হয়েছে অথবা সেগুলোর নাম পরিবর্তন করা হয়েছে। এগুলোর যেন প্রচার না হয়, সেজন্য দ্য ডেইলি স্টার সেগুলোর নাম প্রকাশ করছে না।
পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বর্তমানে ৫০ লাখেরও বেশি মানুষ অনলাইন জুয়ায় আসক্ত। যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া না হলে ২০২৭ সালের মধ্যে এই সংখ্যা দুই কোটি ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে জানানো হয়, বাংলাদেশে অনলাইন জুয়ার বাজারের আকার বর্তমানে প্রায় ৮৩০ কোটি টাকা (৬২-৬৮ মিলিয়ন ডলার)। প্রতি বছর এই বাজার ৪ দশমিক ৭ থেকে ৬ দশমিক ১ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার গত ৩০ জুন জাতীয় সংসদে ‘জুয়া প্রতিরোধ আইন, ২০২৬’ পাস করেছে। এই আইনের আওতায় অনলাইন জুয়া, বেটিং (বাজি ধরা), ম্যাচ ফিক্সিং, ডিজিটাল ওয়ালেট এবং প্রযুক্তিভিত্তিক সব ধরনের জুয়াকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
নতুন এই আইনে অনলাইন বা দূরবর্তী জুয়ায় জড়িত থাকার দায়ে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড এবং এক কোটি টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া অনলাইন বেটিংয়ে অংশ নিলে সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ড এবং পাঁচ কোটি টাকা জরিমানা হতে পারে। পাশাপাশি জুয়ার প্রচারণা ও বিজ্ঞাপনকেও এই আইনে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।
তবে আইন পাস হওয়া সত্ত্বেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জুয়ার ওয়েবসাইট ও এর প্রচার অবাধে চলতে দেখেছে দ্য ডেইলি স্টার। মেটার অ্যাড লাইব্রেরির তথ্য অনুযায়ী, আইনটি কার্যকর হওয়ার প্রথম সপ্তাহেই ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে জুয়ার অন্তত ২১০টি বিজ্ঞাপন সক্রিয় ছিল।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম (দক্ষিণ) বিভাগের উপ-কমিশনার মোহাম্মদ তরিকুল ইসলাম বলেন, বিশ্বকাপের মতো বড় কোনো আসর চলাকালীন অনলাইন জুয়ার প্রকোপ বেড়ে যায়। এ ধরনের তৎপরতা সম্পর্কে তারা অবগত।
গতকাল দ্য ডেইলি স্টারকে তিনি আরও বলেন, ‘আমরা নিয়মিতভাবে এসব কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করছি, জড়িতদের গ্রেপ্তার করছি এবং মামলা দিচ্ছি। বর্তমানে অধিকাংশ জুয়া অনলাইনে স্থানান্তরিত হয়েছে এবং আমরা এসব ক্ষেত্রে নতুন আইনেই বেশিরভাগ মামলা দায়ের করছি।’
খুঁজে পাওয়া সহজ, খেলা আরও সহজ
পর্যালোচনা করা অধিকাংশ বেটিং সাইটই তাদের এজেন্টদের তালিকা সংবলিত নির্দিষ্ট ওয়েবসাইট পরিচালনা করে। সেখানে দেওয়া ফোন নম্বরে যোগাযোগ করে যে কেউ বিনামূল্যে একটি বেটিং অ্যাকাউন্ট খুলতে পারেন।
এ জন্য প্রয়োজন কেবল একটি মোবাইল নম্বর। প্রতিটি সাইটই মূলত প্রক্সি বা বিকল্প ওয়েবসাইট লিংকের মাধ্যমে পরিচালিত হয়, যেখানে এজেন্টদের নাম ও যোগাযোগের নম্বর দেওয়া থাকে।
বিষয়টির গভীরতা বুঝতে এই অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে ১২টি ভিন্ন ভিন্ন সাইটে পরীক্ষামূলকভাবে বাজি ধরেছে দ্য ডেইলি স্টার।
এই প্ল্যাটফর্মগুলোতে টাকা জমা দেওয়া বা উত্তোলনের কাজটি সরাসরি ওয়েবসাইটের মাধ্যমে না হয়ে এজেন্টদের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। এজেন্টরা ব্যবহারকারীদের পক্ষে অ্যাকাউন্ট খুলে দেন এবং সাইটে দেওয়া নির্দিষ্ট বিকাশ, নগদ বা রকেটের মতো মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) নম্বরে টাকা পাঠানোর নির্দেশনা দেন।
মাত্র ১০০ টাকা জমা দিয়েই এই অনলাইন সাইটগুলোতে জুয়া খেলা শুরু করা যায়।
এই প্রতিবেদকরা যখন বাজিতে জিতেছেন, তখন ওই একই এজেন্টের মাধ্যমেই টাকা পাঠানো হয়েছে। এজেন্ট সেই টাকা সরাসরি তাদের এমএফএস (বিকাশ/নগদ/রকেট) অ্যাকাউন্টে পাঠিয়ে দিয়েছেন, যাতে সাধারণত তিন থেকে পাঁচ মিনিট সময় লেগেছে।
ব্যবহারকারীদের লেনদেন এবং বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেওয়ার জন্য টেলিগ্রাম এবং হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে গ্রাহক সেবাও দেওয়া হচ্ছিল। এ থেকে বোঝা যায়, তাদের এই পুরো ব্যবস্থাটি অত্যন্ত সুসংগঠিত।
একজন এজেন্ট দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, এই প্ল্যাটফর্মটি মূলত দেশের বাইরে থেকে পরিচালিত হয়। এর কার্যক্রম সচল রাখতে হাজারের বেশি এজেন্ট কাজ করেন, যারা প্রায় ২৪ ঘণ্টাই সক্রিয় থাকেন।
এই অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে কয়েকবার লেনদেন ও টাকা উত্তোলনের পর, ওই একই এজেন্ট নতুন গ্রাহক সংগ্রহের জন্য এই প্রতিবেদকদের প্রলোভন দেখান। তিনি কোম্পানির কমিশনের একটি অংশের পাশাপাশি বাড়তি ‘নাশতা খরচ’ হিসেবে নগদ টাকা দেওয়ারও প্রতিশ্রুতি দেন।
ওই এজেন্ট জানান, প্রতিটি নতুন গ্রাহক সংগ্রহের জন্য তিনি যেমন কমিশন পান, তেমনি গ্রাহকদের জমা দেওয়া টাকার একটি নির্দিষ্ট অংশও পান। তিনি আরও দাবি করেন যে, এজেন্টরা নিয়মিত মাসিক বেতনও পেয়ে থাকেন।
বিকাশের করপোরেট কমিউনিকেশনস প্রধান শামসুদ্দিন হায়দার ডালিম জানান, অবৈধ আর্থিক লেনদেন শনাক্ত ও প্রতিরোধে তারা একটি শক্তিশালী তদারকি ব্যবস্থা অনুসরণ করেন। এ ছাড়া কোনো সন্দেহজনক লেনদেন বা অ্যাকাউন্টের অস্বাভাবিক কার্যক্রম নজরে এলে তারা বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটসহ (বিএফআইইউ) সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে নিয়মিত অবহিত করেন।
তিনি আরও বলেন, ‘অনলাইন জুয়া, হুন্ডি, মানি লন্ডারিং, সন্ত্রাসবাদে অর্থায়ন এবং অননুমোদিত অর্থ স্থানান্তর বন্ধে বিকাশ উন্নত প্রযুক্তি এবং দক্ষ জনবল ব্যবহার করে কাজ করে যাচ্ছে।’
নগদ-এর মিডিয়া অ্যান্ড কমিউনিকেশন প্রধান মুহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের অবস্থান অত্যন্ত পরিষ্কার—আমরা কোনো ধরনের অনৈতিক লেনদেনের জন্য নগদ-এর সেবা ব্যবহারের অনুমতি দিই না। এটি শুধু অনলাইন বেটিং নয়, বরং যেকোনো প্ল্যাটফর্মের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। যদি কোনো গ্রাহক সন্দেহজনক বা অস্বাভাবিক লেনদেন করেন, তবে আমরা দ্রুত তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাই।’
ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের (ইউল্যাব) সোশ্যাল সায়েন্স অনুষদের ডিন এবং মিডিয়া স্টাডিজ অ্যান্ড জার্নালিজম বিভাগের প্রধান ড. দিন এম সুমন রহমান বলেন, সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলো মূলত সেই সব কন্টেন্টের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়, যেগুলো সরাসরি জনস্বার্থের জন্য হানিকর। এই কাঠামোর মধ্যে অনলাইন বেটিং প্রতিরোধ করা তাদের নীতিগত অগ্রাধিকার তালিকায় সেভাবে নেই।
তিনি আরও বলেন, ‘সরকারকে অবশ্যই সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোর কাছে বাংলাদেশের আইনি ও সাংস্কৃতিক অবস্থান স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে হবে এবং জানিয়ে দিতে হবে, এই দেশে অনলাইন বেটিং সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।’
‘বিশ্বের অনেক দেশই প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে তাদের নিজ নিজ দেশের আইন মেনে চলতে সফলভাবে রাজি করিয়েছে। বাংলাদেশও একইভাবে সফল হতে পারে, তবে এর জন্য দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক প্রচেষ্টা এবং কার্যকর আলোচনার প্রয়োজন।’

