পেন্টাগনের ‘মিথ্যা’ বনাম সেনাদের ‘সত্য’: কী তথ্য গোপন করছে যুক্তরাষ্ট্র?

কুয়েতে গত ১ মার্চ ইরানের ড্রোন হামলায় মার্কিন বাহিনীর ৬ সদস্য নিহত ও ২০ জনের বেশি আহত হয়। এ ঘটনার পর মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ব্রিফিংয়ে ঘটনাটিকে একটি ড্রোন ‘ফাঁক গলে ঢুকে পড়েছে’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন।

শুধু তাই নয়, কুয়েতে মার্কিন ঘাঁটি থেকে সেনা সদস্যদের নিরাপদ ও সুরক্ষিত স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং আত্মরক্ষা ও ইরানের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তারা প্রস্তুত বলেও জানিয়েছিলেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী।

 

কিন্তু, সামরিক শক্তিতে শীর্ষ দেশ যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তরের এমন সব বক্তব্য প্রকৃতপক্ষে কতটা সত্য—তা এখন প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে ওই ঘটনার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত মার্কিন সেনারা।

কুয়েতে ওই হামলা থেকে বেঁচে ফেরা কয়েকজন সেনাসদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজকে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। সেখানে তারা তুলে ধরেন পেন্টাগনের বক্তব্যের সঙ্গে বাস্তবে যা ঘটেছে তার মধ্যে কতটা পার্থক্য।

Survivors of the deadliest Iranian attack on U.S. forces since the war began disputed the Pentagon’s description of events and said their unit in Kuwait was left exposed. CBS News’ @JonahPKaplan exclusively spoke with a soldier who detailed the attack. https://t.co/W7MPRLPSQW pic.twitter.com/oUnwAHOi75

— CBS Evening News with Tony Dokoupil (@CBSEveningNews) April 9, 2026

ওই সেনাদের দাবি, কুয়েতে তাদের ইউনিটটিকে অত্যন্ত বিপজ্জনকভাবে অরক্ষিত অবস্থায় ফেলে রাখা হয়েছিল, যে কারণে ৬ সেনা নিহত ও ২০ জনের বেশি আহত হন।

হামলায় আহত সেনাবাহিনীর ১০৩তম সাসটেইনমেন্ট কমান্ডের এক সদস্য সিবিএস নিউজকে বলেন, ‘একটি ড্রোন স্রেফ ঢুকে পড়েছে—এভাবে ঘটনা তুলে ধরাটা সম্পূর্ণ মিথ্যা। আমি চাই মানুষ সত্যটা জানুক…আমাদের ইউনিটটি আত্মরক্ষার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিল না। এটি কোনো সুরক্ষিত অবস্থানও ছিল না।’

সেসময় পেন্টাগন বলেছিল, কুয়েতের পোর্ট অব শুয়াইবায় ওই মার্কিন ঘাঁটিটি ৬ ফুট উঁচু কংক্রিটের দেয়াল দিয়ে সুরক্ষিত ছিল।

কিন্তু বেঁচে ফেরা সেনাদের বক্তব্যে উঠে আসে উল্টো চিত্র।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক সেনাসদস্য বলেন, ‘পোর্ট অব শুয়াইবায় অপারেশন সেন্টারটি ছিল এক ধরনের পুরোনো আমলের সামরিক ঘাঁটি। সেটি ইরাক বা আফগানিস্তান যুদ্ধের সময় তৈরি। বর্তমান ড্রোন যুদ্ধের যুগে এটি অচল। কিছু ছোট ব্যারিয়ার ছিল আর কতগুলো ছোট টিনের ঘর ছিল। কাঠ ও টিনের অস্থায়ী কাঠামোতে তৈরি।’

তিনি আরও বলেন, ‘বাঙ্কারের কথা চিন্তা করলে, এটি ছিল সবচেয়ে দুর্বল মানের। ড্রোন প্রতিরক্ষা সক্ষমতার কথা বললে…সেখানে কিছুই ছিল না।’

সাক্ষাৎকারে আরও উঠে আসে কীভাবে সেনাসদস্যদের প্রথম থেকেই ভুল তথ্য দেওয়া হচ্ছিল এবং বাঁচানোর নামে তাদের লক্ষ্যবস্তু বানাতে ইরানের আরও কাছে নিয়ে যাওয়া হয়।

অপারেশন এপিক ফিউরি শুরু হওয়ার প্রায় এক সপ্তাহ আগে কুয়েতে অবস্থানরত অধিকাংশ মার্কিন সেনাদের জর্ডান ও সৌদি আরবের নিরাপদ অবস্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়, যেন তারা ইরানের মিসাইল রেঞ্জের বাইরে থাকে।

কয়েকজন সেনাসদস্য বলেন, নেতৃত্ব থেকে তাদের বলা হয়েছিল যে তারা বেশিদিন বাইরে থাকবেন না। তারা যেন মাত্র ৩০ দিনের জন্য প্রস্তুতি নেন এবং নিজেদের ব্যক্তিগত সরঞ্জাম ও কম্পিউটার রেখে যান। লক্ষ্য ছিল একটাই—নিজেকে লক্ষ্যবস্তু হতে না দেওয়া।

কিন্তু কুয়েত সিটির দক্ষিণে অবস্থিত একটি প্রধান মার্কিন ঘাঁটিতে থাকা ১০৩তম সাসটেইনমেন্ট কমান্ডের বেশ কয়েকজন সদস্যের জন্য আদেশ ছিল ভিন্ন।

সবকিছু গুছিয়ে নিয়ে কুয়েতের দক্ষিণ উপকূলে একটি ছোট সামরিক আউটপোস্ট ‘পোর্ট অব শুয়াইবা’তে যেতে বলা হয় তাদের।

কাঠ ও টিনের তৈরি অস্থায়ী পুরোনো এই অপারেশন সেন্টার থেকেই লজিস্টিক কর্মীরা পুরো মধ্যপ্রাচ্যে গোলাবারুদ ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহ করত।

সেনাসদস্যরা সিবিএস নিউজকে জানান, তারা গোয়েন্দা তথ্য দেখেছিলেন যে এই পোস্টটি ইরানের সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় ছিল। তারপরও কেন ইরানের হামলার সীমার এত ভেতরে তারা অবস্থান করছেন তা নিয়ে প্রশ্ন ছিল।

হামলায় আহত এক সেনা বলেন, ‘আমরা ইরানের লক্ষ্যবস্তুর আরও কাছে চলে গিয়েছিলাম সেটি ছিল এমন অনিরাপদ এলাকা যা পরিচিত লক্ষ্যবস্তু ছিল। আমি মনে করি না এর পেছনে কোনো ভালো কারণ আমাদের জানানো হয়েছিল।’

সেনা সদস্যদের বক্তব্য অনুযায়ী, ১ মার্চ সকালে হামলার কয়েক ঘণ্টা আগে ইনকামিং মিসাইল অ্যালার্ম বাজলে প্রায় ৬০ জন সেনার একটি দল সিমেন্টের বাঙ্কারে আশ্রয় নেন।

সোয়া ৯টার দিকে ‘অল ক্লিয়ার’ সংকেত পেয়ে তারা হেলমেট খুলে ফেলেন এবং কাজে ফিরে যান। কাঠ ও টিনের তৈরি ওই অস্থায়ী ঘাঁটিতে নিজেদের কাজে ব্যস্ত ছিলেন তারা।

এর প্রায় আধঘণ্টা পরই ঘটে বিস্ফোরণ। হামলার পরের পরিস্থিতি ছিল আরও ভয়াবহ। সেনাদের উদ্ধার ও পর্যাপ্ত চিকিৎসা নিয়ে পেন্টাগন যে বক্তব্য দিয়েছিল, বাস্তবে তার সঙ্গে কোনো মিল নেই।

আহত এক সেনা সিবিএসকে বলেন, ‘সেখানে এক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হয়। রোগীদের আলাদা করার কোনো সুযোগ ছিল না। আপনি হয় আগুনের একপাশে, না হয় অন্যপাশে।’

প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, সেনারা নিজেদের হাতের কাছে থাকা কাপড় দিয়ে রক্তপাত বন্ধের চেষ্টা করেন। তারা বেসামরিক গাড়িতে আহতদের কুয়েত সিটির দুটি স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যান।

যুদ্ধের সময় এমন হামলা অবধারিত বাস্তবতা কি না—এমন প্রশ্নের উত্তরে ওই আহত সেনা বলেন, ‘হ্যাঁ, এটা সত্য যে ঝুঁকি থাকে।’

কিন্তু যখন প্রশ্ন করা হলো—এই হামলা কি ঠেকানো বা এড়ানো যেত?’

তখন তিনি বলেন, ‘আমার ব্যক্তিগত মতে—হ্যাঁ, অবশ্যই এটি এড়ানো সম্ভব ছিল।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ‘পোর্ট অব শুয়াইবায় হামলার বিষয়ে তদন্ত চলছে’ উল্লেখ করে সেনাদের দাবির বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি পেন্টাগন।

Related Articles

Latest Posts