কয়েক মাস আগেই বাংলাদেশের পেস বোলিং কোচ হিসেবে নিবিড়ভাবে কাজ করেছেন অস্ট্রেলিয়ার সাবেক পেসার শন টেইট। দায়িত্ব ছাড়ার পরও যোগাযোগটা রয়েই গেছে। সম্প্রতি তার দেশে গিয়েই অবিশ্বাস্যভাবে ডারউইনে টেস্ট জিতে যায় বাংলাদেশ। দ্য ডেইলি স্টাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে টেইট বিশ্লেষণ করেছেন বাংলাদেশ দলের নতুন পেস শক্তি, টেস্টে ধারাবাহিক হওয়ার চ্যালেঞ্জসহ নানা বিষয়।
দ্য ডেইলি স্টার: ডারউইন ও ম্যাকাইয়ের খেলা তো কাছ থেকেই দেখলেন। টাইগারদের পারফরম্যান্স কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
শন টেইট: প্রথম টেস্ট ম্যাচটা এক কথায় দারুণ ছিল। আমি জানতাম বাংলাদেশ লড়াই করবে, তবে জয়ের ইতিহাস গড়বে—তা ভাবিনি… দ্বিতীয় টেস্টে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ সামলাতে হয়েছে, যেটা স্বাভাবিক বলেই মনে করি। তবে অস্ট্রেলিয়ার মাটি থেকে টেস্ট জয় নিয়ে ফেরা মোটেও মুখের কথা নয়, এর চেয়ে বেশি কিছু চাওয়ার থাকতে পারে না।
দ্য ডেইলি স্টার: জয়টাকে কতটা অঘটন বলবেন, বিশেষ করে ডারউইনের উইকেট নিয়ে যখন বাউন্সের অভাবের কারণে সমালোচনা হচ্ছিল?
টেইট: কারণ ওটা ছিল সবুজ ঘাসের পেসসহায়ক উইকেট। অস্ট্রেলিয়া সাধারণত ডারউইনের আরো দক্ষিণে খেলে থাকে, যেখানে উইকেট শক্ত হয় এবং ব্যাটাররা বাড়তি সুবিধা পায়। তবে সেখানকার উইকেট ছিল একদম ভিন্ন। আমার মনে হয় টসটা খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে এবং বাংলাদেশ বেশ ভালো বোলিং আক্রমণ নিয়ে জবাব দিয়েছে। বাইরে থেকে দেখলে এটা অবশ্যই বড় একটা অঘটন। তবে গত এক বছর আমি বাংলাদেশ দলের সঙ্গে ছিলাম বলে পুরোপুরি অবাক হইনি।
অস্ট্রেলিয়া তাদের সেরা খেলাটা খেলতে পারেনি, আর বাংলাদেশ ছিল নিজেদের সেরা রূপে। সমীকরণটা খুবই সরল। তবে দ্বিতীয় টেস্টে অসিরা বল হাতে নিজেদের আসল রূপের অনেকটাই কাছাকাছি পৌঁছাতে পেরেছিল।
দ্য ডেইলি স্টার: কৌশলগুলো মাঠে কতটা ভালোভাবে প্রয়োগ করা গেছে, বিশেষ করে প্রথম টেস্টে নাহিদ রানা ও শরিফুল ইসলামের অনুপস্থিতিতে?
টেইট: বাংলাদেশের পেস বোলিংয়ের গভীরতা দারুণ। বর্তমানের ৭-৮ জন পেসারের মধ্যে যেকোনো কাউকে খেলানো হোক না কেন, সবাই প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে তৈরি। শরিফুল কিংবা রানা না থাকলেও তাসকিন [আহমেদ], এবাদত [হোসেন] ও হাসান [মাহমুদ] তো ইদানীং টেস্ট খেলছেই। পাইপলাইনে খালেদও [আহমেদ] আছে। সুতরাং বাংলাদেশের হাতে বিকল্পের অভাব নেই।
দ্য ডেইলি স্টার: দায়িত্ব ছাড়ার আগে এই দলটার সঙ্গে ঠিক কী নিয়ে কাজ করছিলেন?
টেইট: টেকনিক নিয়ে আমরা খুব একটা মাথা ঘামাইনি… ডেটা অ্যানালিটিক্স বা ওয়ার্কলোড নিয়েও খুব বেশি আলোচনার প্রয়োজন পড়েনি। আমার মূল কাজ ছিল পেসারদের সঙ্গে একটি মানসিক মেলবন্ধন বা আত্মিক সম্পর্ক গড়ে তোলা।
দ্য ডেইলি স্টার: টেস্ট র্যাংকিংয়ে বাংলাদেশ এখন ছয় নম্বরে উঠে এসেছে। এই সংস্করণে দলটার উন্নতি কীভাবে দেখছেন?
টেইট: মূল বিষয় হলো—বাংলাদেশ কি এখন ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারবে এবং এই অবস্থান বজায় রাখতে পারবে? এ পর্যন্ত যা করেছে তা দুর্দান্ত, তবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এই সাফল্য কতটা দীর্ঘস্থায়ী হয়। আগামী ৩-৪ বছর তারা সব সময় সমানভাবে লড়াই করতে পারছে কি না, সেটাই আসল। বছরে একটা ম্যাচ নয়, নিয়মিত ভালো খেলতে হবে।
দ্য ডেইলি স্টার: সামনেই বাংলাদেশের দক্ষিণ আফ্রিকা সফর। ওয়ান্ডারার্স আর সেঞ্চুরিয়ানে ইতিবাচক ফলের আশা করছেন?
টেইট: অবশ্যই! সফরটা বিশাল, টেস্ট ও সাদা বলের ম্যাচ—সব মিলিয়ে অনেক বড় একটা চ্যালেঞ্জ। টিভিতে খেলাটা দেখার জন্য মুখিয়ে আছি।
ওখানকার উইকেটগুলোতে অবশ্য আগের চেয়ে খানিকটা পরিবর্তন এসেছে। ব্যাটারদের জন্য ভালো হলেও আমি জানি, টেস্টের শুরুতেই নতুন বলে পেসাররা বেশ সুবিধা পেতে পারে।
দ্য ডেইলি স্টার: অস্ট্রেলিয়া সিরিজের পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে হাসান ও শরিফুলকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
টেইট: শরিফুলের খেলা আমাকে চমকে দেয়নি। ছেলেটা কঠোর পরিশ্রম করে এবং মানুষ হিসেবে দারুণ। তার সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব বহুদিনের। আর হাসানের কথা বলতে গেলে, তার জন্য বুকটা গর্বে ভরে ওঠে… অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে এমন পারফরম্যান্স তার প্রাপ্যই ছিল।
দ্য ডেইলি স্টার: ম্যাকাইয়ে তাসকিনের গতি কমে ১২৫-১২৯ কিলোমিটারের ঘরে নেমে আসায় সমালোচনা হচ্ছে। বিষয়টা কি চিন্তার কারণ?
টেইট: একদমই নয়। তাসকিনের বয়স বাড়ছে, এটা মাথায় রাখতে হবে। এখন সবচেয়ে জরুরি তার ওয়ার্কলোড সঠিক উপায়ে ব্যবস্থাপনা করা। দীর্ঘ দিন খেলছে, শরীর ভারী—তার সবকিছুই একটু আলাদা। বোলিংয়ে সে নিজের সর্বোচ্চটা উজাড় করে দেয়, তাই শরীর ফিট রাখার দিকেই তার বেশি মনোযোগ দিতে হবে। তাসকিনের দায়িত্ব এটুকুই। আমি যখন ছিলাম, সাদা বলের ক্রিকেটে সে অসাধারণ বল করেছে। আবার লাল বলের জগতে ফিরে এসে এখন কেবল মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। পাশাপাশি তার নেতৃত্ব গুণও খুব গুরুত্বপূর্ণ, কারণ পেস ইউনিটের বাকিদের জন্য সে দারুণ এক অভিভাবক।
তাকে পর্যাপ্ত বিশ্রাম দেওয়া উচিত, শরীর পুনরুদ্ধারের সময় দিতে হবে এবং প্রপার ফিটনেস নিয়ে কাজ করতে দিতে হবে। এরপর কেবল গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচগুলোতে তাকে খেলানো উচিত।
দ্য ডেইলি স্টার: বাংলাদেশের বর্তমান লাল বলের বোলিং আক্রমণকে কীভাবে নম্বর দেবেন?
টেইট: টি-টোয়েন্টি, ওয়ানডে কিংবা টেস্ট—যেকোনো সংস্করণেই এখন বাংলাদেশের বোলিং আক্রমণ বিশ্বমানের। জাতীয় দলের সঙ্গে সেই একটা বছর কাটানোর সুযোগ পেয়ে নিজেকে ভাগ্যবান মনে করি। সময়টা দারুণ কেটেছে এবং আমি নিশ্চিত, সামনে তারা আরো অনেক জয় উপহার দেবে।
দ্য ডেইলি স্টার: স্ট্র্যাটেজি বা পরিকল্পনা সাজানোর ক্ষেত্রে কি বাংলাদেশ পেস বোলিংকে এখন আগের চেয়ে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে?
টেইট: একশো বার! পরিস্থিতির দিন দিন উন্নতি হচ্ছে। পেসাররা এখন অনেক বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। বাংলাদেশ এখন উপলব্ধি করতে পেরেছে যে ক্রিকেট মানেই কেবল স্পিন বোলিং, স্পিন উইকেট কিংবা ব্যাটারদের দাপট নয়। এখন হাতে একঝাঁক দুর্দান্ত পেসার রয়েছে এবং বিশ্বাস করুন, পুরো ক্রিকেট বিশ্ব এখন বাংলাদেশের পেস আক্রমণ নিয়ে কথা বলছে।

