পুরোনো কোনো গন্ধে হঠাৎ শৈশব মনে পড়ে কেন?

অফিস শেষে বিকেলে বাড়ি ফিরছিলেন রকিব। হঠাৎ দেখলেন, দূরের আকাশ কালো হয়ে বৃষ্টি নামছে। আর তখনই ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধ ভেসে এলো বাতাসে। থমকে গেল এলোমেলো ভাবনা। মনে পড়ে গেল শৈশবের সেই দিনগুলোর কথা, গ্রামের বাড়ির দক্ষিণের জানালায় বসে কত বিকেল এমন বৃষ্টি আর মাটির গন্ধে কেটেছে! সুদূর অতীতের সেই চেনা ঘ্রাণ কয়েক মুহূর্তের জন্য হলেও তাকে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল শৈশবে।

এমন অনুভূতি কেবল রকিবেরই হয়েছে, এমন না। অনেক বছর পর গ্রামে গিয়ে পুরোনো কাঠের আলমারিটা খুলতেই এক অচেনা-চেনা গন্ধে থমকে গিয়েছিলেন বেসরকারি চাকরিজীবী নিপাও। ধুলো, কাঠ, ন্যাপথলিন আর জমানো কাপড়ের একটা মিশ্র ঘ্রাণ। খুব একটা যে ভালো লাগে, তা নয়। কিন্তু নিপার তখন মনে হয়েছিল, এই ঘরটায় তিনি আগেও ছিলেন। খুব ছোটবেলায়। মনে পড়ে যায়, আলমারি খুললে পাওয়া যেত মায়ের শাড়ি, বাবার পুরোনো পাঞ্জাবি, ঈদের নতুন জামার গন্ধ।

পুরোনো কোনো গন্ধে হঠাৎ এমন করে অতীত স্মৃতি মনে পড়ে যায় কেন?

মনোবিজ্ঞানে এই অতীত-যাত্রাকে বলা হয় ‘প্রুস্ত ফেনোমেনন’ বা প্রুস্ত প্রভাব। নামটা এসেছে ফরাসি লেখক মার্সেল প্রুস্তের বিখ্যাত সাহিত্যকর্ম ‘ইন সার্চ অব লস্ট টাইম’ থেকে। 

উপন্যাসে দেখানো হয়েছিল, কীভাবে চায়ে চুবিয়ে নেওয়া এক টুকরো মাদেলিন কেকের স্বাদ-গন্ধ এক নিমেষে কেন্দ্রীয় চরিত্রটিকে শৈশবের স্মৃতিতে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। সেই বর্ণনা পরে মনোবিজ্ঞান ও স্মৃতিবিজ্ঞানে গুরুত্বপূর্ণ একটা উদাহরণ হয়ে ওঠে। 

২০০০ সালে যুক্তরাজ্যের লিভারপুল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক সাইমন চু ও জন জে. ডাউনস ঘ্রাণ ও স্মৃতির এই নিবিড় সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা করেন। এর শিরোনাম ছিল, ‘ওডার-ইভোকড্ অটোবায়োগ্রাফিক্যাল মেমোরিজ: সাইকোলজিক্যাল ইনভেস্টিগেশনস অব প্রুস্তিয়ান ফেনোমেনা’।

তাদের গবেষণায় দেখা যায়, অন্যান্য ইন্দ্রিয়ের তুলনায় গন্ধ অতীত স্মৃতিকে জাগিয়ে তুলতে সবচেয়ে কার্যকর। গন্ধ দিয়ে মনে করা স্মৃতিগুলোতে আবেগের তীব্রতাও বেশি।

আর সেই স্মৃতিগুলো বেশির ভাগ সময়ই শৈশবের প্রথম ১০ বছরের। অর্থাৎ ৩০ বছর বয়সে হঠাৎ কোনো গন্ধে শৈশবের হারিয়ে যাওয়া বিকেল মনে পড়ে যাওয়া মোটেও অস্বাভাবিক নয়।

আমরা যখন কোনো গন্ধ নিই, নাকের ঘ্রাণগ্রাহক কোষগুলো সেই রাসায়নিক সংকেত সোজা পাঠিয়ে দেয় মস্তিষ্কে। এই সংকেত সরাসরি মস্তিষ্কের আবেগ নিয়ন্ত্রণকারী অংশ ‘অ্যামিগডালা’ এবং স্মৃতির অংশ ‘হিপোক্যাম্পাস’কে নাড়া দেয়। তাই একটা গন্ধ একই সঙ্গে দুটি কাজ করতে পারে, কী ঘটেছিল আর কেমন লেগেছিল। 

২০০৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নায়ুবিজ্ঞানী র‍্যাচেল হার্জ ও তার সহযোগীরা একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্রেইন-ইমেজিং গবেষণা পরিচালনা করেন। তাতে দেখা যায়, চোখে দেখা বা অন্য কোনো অনুভূতির চেয়ে ঘ্রাণের মাধ্যমে মানুষের অতীত স্মৃতি বেশি মনে পড়ে। 

সহজ কথায়, চোখ দিয়ে আমরা পুরোনো একটা ছবি দেখলে হয়তো ভাবি, আরে, এটা তো সেই জায়গা! কিন্তু কোনো পুরোনো গন্ধ হঠাৎ নাকে এলে মস্তিষ্ক অনেক সময় কল্পনায় সরাসরি আবার সেই দিনগুলোতেই ফিরিয়ে নিয়ে যায়।

গন্ধ নিজে কোনো জাদুর কাঠি না। আসল জাদুটা লুকিয়ে থাকে গন্ধটার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায়।

সরকারি চাকরিজীবী রিয়াদ বলেন, ‘ছোটবেলায় প্রায় প্রতিদিন বিকালে নাশতায় চায়ের সঙ্গে নাবিস্কো বিস্কুট খেতাম। একদিন ঢাকার তেজগাঁওয়ের নাবিস্কো ফ্যাক্টরির দিকে যাওয়ার সময় সেই বিস্কুটের গন্ধ নাকে এসে লাগে। একদম ছোটবেলায় ফরে যাই। মনে হচ্ছিল সেই দিনগুলো কোথায় হারিয়ে গেছে?’

কারও কাছে হয়তো কাদার গন্ধে কিছুই মনে হয় না। আবার বেসরকারি চাকরিজীবী জাহাঙ্গীর আলমের কাছে রাজধানীর কাওরানবাজারের কাদার গন্ধ তার শৈশবে নানাবাড়ি যাওয়ার স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়।   

গন্ধ স্মৃতি তৈরি করে না, বড়জোর পুরোনো স্মৃতির দরজা খুলে দিতে পারে। এই কারণেই গন্ধের স্মৃতি ব্যক্তিভেদে এত আলাদা।

মাহমুদা খাতুন তার ছেলের স্কুলের নতুন বইয়ের গন্ধে নিজের স্কুল-জীবনে ফিরে যান। কখনো অনিক কারও গা থেকে ভেসে আসা আতরের গন্ধে শৈশবের ঈদের সকাল খুঁজে পান। 

ধান কাটা, শুকনো পাতার বা ভেজা মাটির গন্ধ, রান্নাঘরের কাঠের ধোঁয়া, এগুলো অনেকের কাছে শুধু প্রকৃতির গন্ধ নয়। এগুলো জীবনের কোনো একটা সময়ের সঙ্গে জুড়ে থাকা সংকেত। এ কারণে একই গন্ধ একজনকে আনন্দিত আবার অন্যজনকে বিষণ্নও করে তুলতে পারে।

জীবনের প্রথম দিকের অভিজ্ঞতাগুলো সব মানুষের কাছে একেবারে নতুন ও তীব্র থাকে। পৃথিবীর রূপ-রস-গন্ধ তখন আমরা প্রথম অনুভব করি। এই যেমন প্রথম স্কুলে যাওয়া, ঈদের দিনের নানা আয়োজন, স্কুলের লম্বা ছুটিতে নানাবাড়ি যাওয়া, পুকুরে সাঁতার, শীতের সকালে পিঠা বা গ্রামের মেঠোপথ। 

গবেষণায় দেখা গেছে, গন্ধের মাধ্যমে মনে পড়া ব্যক্তিগত স্মৃতিগুলো বেশিরভাগ সময়ই জীবনের তুলনামূলক পুরোনো সময়কার। অবশ্য তার মানে এই না যে সব মানুষের কাছে সব গন্ধই শৈশব স্মৃতি ফিরিয়ে আনবে। বরং যে গন্ধের সঙ্গে আমাদের ব্যক্তিগত আবেগ বা অভিজ্ঞতা জড়িয়ে আছে, সেটাই ফিরে ফিরে আসে।

আসাফ প্রায় ২০ বছর পর তার শৈশবের স্কুলের এক পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন। সেদিনের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘স্কুলের সেই একই বিল্ডিংটা যেন বদলে গেছে। মাঠটাকে বেশ ছোট লাগছিল। অথচ ছোটবেলায় কত বড়ই না লাগতো! কিন্তু হঠাৎ একটা ক্লাসরুমে ঢুকে পুরোনো কাঠের গন্ধ পাই, বেঞ্চের গা থেকে।’

সেই গন্ধ তার মনে কেমন অনুভূতি তৈরি করেছিল, সে কথাও জানান আসাফ। তার ভাষায়, ‘এক মুহূর্তের জন্য যেন আমি আমার বয়স ভুলে গিয়েছিলাম। মনে হচ্ছিল, আমি আবার সেই ছোট বালকটি হয়ে বেঞ্চে বসে আছি।’

এটা শুধু ‘মনে পড়া’ না। গবেষণায় দেখা গেছে, গন্ধের মাধ্যমে জেগে ওঠা স্মৃতি অনেক মানুষকে অতীতে ফিরে যাওয়ার অনুভূতি দেয়। যাকে গবেষকরা বলেন, বিং ব্রট ব্যাক ইন টাইম।

২০০৮ সালে কোহসুকে ইয়ামামোতো ডায়েরি-ভিত্তিক গবেষণা পরিচালনা করেন। এতে দেখা যায়, গন্ধের মাধ্যমে হঠাৎ জেগে ওঠা স্মৃতিগুলো অন্য স্মৃতির তুলনায় বেশি পুরোনো, নির্দিষ্ট ও আবেগঘন হয়। এতে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের অনেকেই জানিয়েছেন, গন্ধের কারণে তারা যেন অতীতে ফিরে গিয়েছিলেন।

গন্ধ আমাদের অতীতে ফেরায় ঠিকই, তবে স্মৃতি কোনো নির্ভুল ভিডিও রেকর্ডার নয়। প্রতিবার অতীতে ফেরার সময় মস্তিষ্ক স্মৃতিটাকে একটু নতুন করে আঁকে। তাই হয়তো স্মৃতির উঠোনটা বাস্তবে চেয়ে একটু বেশি উজ্জ্বল দেখায়, মায়ের মুখটা দেখায় আরও কোমল।

এইসব গন্ধ হয়তো অনেক আগে হারিয়ে যাওয়া নিজের সংস্করণকে মনে করিয়ে দেয়। কোথায় যেন রয়ে গেছে সেই পুরোনো মানুষটি, বর্তমানে আটকে পড়া ‘আমি’র মধ্যে। বড় হওয়ার ব্যস্ততায় ফেলে আসা ‘আমি’র কাছে পৌঁছানোর পথটা বন্ধ হয়ে গেছে। একটা গন্ধ সেই পথের দরজা খুলে দেয়।

Related Articles

Latest Posts