অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে নামার আগে বাংলাদেশ দলের প্রস্তুতিতে কোনো কমতি ছিল না। বরং ম্যাচের আগে প্রতিটি মুহূর্তে নিজেদের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন ক্রিকেটাররা। মাথায় ছিল একটাই কথা, ফলাফল নিয়ে ভাবা যাবে না, নিজেদের প্রক্রিয়ায় থাকতে হবে। পাঁচ দিনের টেস্টের শেষ পর্যন্ত লড়াই করার মানসিক প্রস্তুতি নিয়েই মাঠে নেমেছিলেন হাসান মাহমুদরা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত চার দিনেই ইতিহাস লিখে ফেলল বাংলাদেশ।
ডারউনের মারারা স্টেডিয়ামে অস্ট্রেলিয়াকে ৯ উইকেটে হারিয়ে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ২৩ বছর পর টেস্ট জয়ের স্বাদ পেয়েছে বাংলাদেশ। আর এই ঐতিহাসিক জয়ের অন্যতম নায়ক ম্যাচসেরা হাসান মাহমুদ। দুই ইনিংস মিলিয়ে ৯ উইকেট নেওয়া এই পেসার ম্যাচ শেষে জানালেন, জয়ের ভিতটা আসলে তৈরি হয়েছিল মাঠে নামার আগেই।
‘ম্যাচের আগে অনুশীলনেও আমরা প্রতিদিন, প্রতিটি মুহূর্তে নিজেদের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করেছি। আমরা সবসময় মাথায় রেখেছি, যা-ই ঘটুক না কেন, নিজের ওপর বিশ্বাস রাখতে হবে, প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে এবং ফলাফল নিয়ে চিন্তা করা যাবে না। যা হওয়ার হবে, আমাদের পাঁচ দিন খেলতে হবে, এরপর ফলাফল আসবে,’ বলেন হাসান।
কথাগুলো বলার সময় হাসানের জানা ছিল না, সেই পাঁচ দিনের পরীক্ষায় তারা মাত্র চার দিনেই সাফল্যের সিলমোহর এঁকে দেবেন। তবে বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের আত্মবিশ্বাসের পেছনে ছিল সুপরিকল্পিত প্রস্তুতি।
অস্ট্রেলিয়ার শক্তিশালী ব্যাটিং লাইনআপ নিয়ে ম্যাচের আগে আলাদা করেই কাজ করেছিলেন তারা। নির্দিষ্ট কোনো ব্যাটারকে ঘিরে নয়, পুরো ব্যাটিং ইউনিটকে মাথায় রেখে পরিকল্পনা সাজানো হয়েছিল। সতীর্থ ও কোচদের সঙ্গে আলোচনা, ভিডিও বিশ্লেষণ, সবকিছু মিলিয়ে ঠিক করা হয়েছিল কোথায় এবং কীভাবে বল করতে হবে।
হাসানের ভাষায়, ‘আমাদের কিছু দলীয় পরিকল্পনা ছিল। দলের খেলোয়াড় ও কোচদের সঙ্গে বসে আমরা সেগুলো ঠিক করেছি। ভিডিও দেখেছি, কোথায় কীভাবে বল করতে হবে, সেসব নিয়ে পরিকল্পনা করেছি। এরপর মাঠেও ঠিক সেটাই করার চেষ্টা করেছি।’
মাঠে সেই পরিকল্পনার বাস্তবায়নই যেন বাংলাদেশের জয়ের গল্পটাকে আরও সুন্দর করে দিয়েছে। প্রথম ইনিংসে অস্ট্রেলিয়াকে মাত্র ১৯৮ রানে অলআউট করার পথে ৬ উইকেট নেন হাসান। বাংলাদেশ নিজেদের প্রথম ইনিংসে ৪২৬ রান করে বড় লিড নেওয়ার পর ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ চলে আসে তাদের হাতে।
দ্বিতীয় ইনিংসে অস্ট্রেলিয়া কিছুটা লড়াইয়ের চেষ্টা করলেও বাংলাদেশের বোলিংয়ের সামনে দীর্ঘ সময় টিকতে পারেনি। ক্যামেরন গ্রিনের ১০৪ রানের দুর্দান্ত ইনিংস অস্ট্রেলিয়াকে ইনিংস পরাজয় থেকে বাঁচায়। কিন্তু হাসানই শেষ পর্যন্ত তাকে ফিরিয়ে দিয়ে বাংলাদেশের জয়ের পথ আরও পরিষ্কার করে দেন।
দুই ইনিংসে ৯ উইকেট নেওয়ার পরও হাসানের কাছে এটি একার কোনো অর্জন নয়। বরং পুরো বোলিং ইউনিটের সম্মিলিত শৃঙ্খলাকেই তিনি সাফল্যের মূল কারণ হিসেবে দেখছেন, ‘আমি মনে করি প্রতিটি বোলারই ধৈর্য ধরে এবং নিজেদের প্রক্রিয়া অনুসরণ করে খুব ভালো করেছে। সবাই লাইন ও লেংথ ঠিক রেখে ধারাবাহিকভাবে বল করে গেছে। আর এখন তার ফলাফল আমাদের সামনে।’
সেই ফলাফল ছিল অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের দ্বিতীয় টেস্ট জয় এবং অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথম জয়। ২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ায় টেস্ট খেলতে এসে এমন জয় হয়তো ম্যাচের আগে কেউই চার দিনের মধ্যে আশা করেননি। কিন্তু হাসানদের পরিকল্পনা, মিরাজের ঘূর্ণি, বোলারদের ধৈর্য আর ব্যাটারদের দৃঢ়তায় সেই অসম্ভবই সম্ভব হয়েছে।
শেষ পর্যন্ত ৫৭ রানের লক্ষ্য পেয়ে বাংলাদেশ এক উইকেট হারিয়েই জয় নিশ্চিত করে। মুমিনুল হকের ব্যাট থেকে আসা বাউন্ডারিতে জয়সূচক রান আসার সঙ্গে সঙ্গে ডারউইনের গ্যালারি ভেসে যায় ‘বাংলাদেশ, বাংলাদেশ’ ধ্বনিতে।
সেই মুহূর্তে শুধু ডারউইনের বাংলাদেশি দর্শকরাই আনন্দে ভাসেননি, দূর বাংলাদেশেও নিশ্চয়ই শুরু হয়ে গিয়েছিল উদযাপন। হাসানও জানেন, তার এই সাফল্যে দেশের মানুষ খুশি হবেন, ‘অবশ্যই তারা আমার জন্য খুব খুশি হবে। আর শহরের আমার পরিচিত মানুষজনও খুব খুশি হবে। তারা আমাকে বাংলাদেশে ফিরে যেতে দেখবে এবং উদযাপন করবে।’

