নদী তীরবর্তী দেবীঘাটে এখন আর কোনো মানুষের কোলাহল নেই। আছে শুধু কাদা, ভাঙা ভবন আর ধ্বংসস্তূপ। অথচ চীন-নেপাল সীমান্তের কাছে এই জনপদ কয়েকদিন আগেও ছিল জমজমাট বাণিজ্যকেন্দ্র। ২৬ আগস্টের ভয়াবহ বন্যা কয়েক মিনিটেই চিরচেনা সেই চেহারাটা বদলে দিয়েছে।
এখন নদীর পাড়জুড়ে পড়ে আছে পাথর, ভাঙা কংক্রিট আর নানা ধরনের ধ্বংসাবশেষ। সড়কের দুই পাশে কাদার স্তূপ। তার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে ভাঙাচোরা ভবনগুলো।
নুয়াকোট জেলার দেবীঘাটে ত্রিশূলী ও তাদি নদীর মিলনস্থলে গড়ে উঠেছিল এই বাণিজ্যিক কেন্দ্র। রাজধানী কাঠমান্ডু থেকে জায়গাটির দূরত্ব প্রায় ৬০ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে।
এখানকার ভবনগুলো এখন কঙ্কালের মতো দাঁড়িয়ে আছে। দরজা-জানালা ভেসে গেছে। ভবনের চতুর্থ তলা পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে কাদার দাগ। কোথাও দেয়াল ধসে পড়েছে, কোথাও ভবনের ভিত্তি বেরিয়ে এসেছে। ২৬ আগস্টের বন্যা কতটা ভয়াবহ ছিল, ধ্বংসাবশেষগুলো যেন তারই সাক্ষ্য দিচ্ছে।
অনেক বাড়িতেই এখন আর একজন মানুষও নেই। ধ্বংসস্তূপজুড়ে পচনের দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। এর কারণ জানতে চাইলে স্থানীয় বাসিন্দা দেবিকা পোদেল জানান, ত্রিশূলী নদীর স্রোতে অনেক কাদা, বড় বড় পাথর আর বিভিন্ন জিনিসের ধ্বংসাবশেষ এসেছিল। ভেসে এসেছিল অনেক লাশও। কাদার স্তরের নিচে এখনো মানুষ ও পশুর মরদেহ চাপা পড়ে থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।
দেবিকা বলেন, পানি আসার সময় মাটি কাঁপতে শুরু করেছিল। ২০১৫ সালের ভূমিকম্পে যেমনটা হয়েছিল।
একসময় এখানে ছোট একটা ব্যবসা পরিচালনা করতেন দেবিকা। এখন তার কিছুই নেই। দেবিকার ভাষ্য, দেবীঘাটে প্রায় ৬০০টি বাড়ি ও অন্যান্য স্থাপনা ধ্বংস হয়েছে।
বন্যার কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, সকাল ৯টার দিকে উজানের বেত্রাবতী বাজার এলাকা থেকে বাসিন্দাদের ফোন করে সতর্ক করা হয়েছিল। কিন্তু শুরুতে কেউ বিষয়টা গুরুত্বের সঙ্গে নেয়নি।
এর আগের বছরও তারা একই ধরনের সতর্কবার্তা পেয়েছিলেন। তবে সেবার তেমন বন্যা হয়নি। তাই এবারও অনেকে বিষয়টাকে গুরুত্ব দেননি। বরং অনেকে নদীর পাড়ে গিয়ে বন্যার ভিডিও ধারণ করতে শুরু করেছিলেন। দেবিকা জানান, তাদের অনেকেই এখন নিখোঁজ।
তিনি বলেন, আমার পূর্বসুরিদেরও কেউ এমন কিছু আগে দেখেননি।
গতকাল মঙ্গলবার দেবীঘাটে দুর্যোগ নিয়ে কথা বলছিলেন দেবিকা। তার সামনে ছিলেন ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্টের (আইসিআইএমওডি) ২০ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল। এই দলে বাংলাদেশ, ভারত, জাপান ও ভুটানের সরকারি কর্মকর্তা, ত্রাণকর্মী ও সাংবাদিকেরা ছিলেন।
নদীর দুই স্রোতের মিলনস্থলের দিকে যাওয়ার সময় পানিতে ভেঙে পড়ে থাকা একটা স্টিলের বেইলি ব্রিজ দেখতে পায় দলটি।
ভূমি থেকে অন্তত ২০ ফুট ওপরে তখনো কাদা-পানির দাগ দেখা যায়। নদীর পাড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে স্যান্ডেল, লেপ, গদি, প্লাস্টিকের চেয়ার ও ভাঙা গ্যাসের সিলিন্ডার।
এক বৃদ্ধ জানান, একসময় ওই এলাকায় কয়েক হাজার মানুষ থাকতেন। জায়গাটা গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র ছিল।
ব্যবসায়ী গোবিন্দ প্রসাদ ধাহাল বলেন, ‘এখন সবকিছু শেষ।’
তিনি বলেন, আমার চাল ও শস্যের বড় ব্যবসা ছিল। পানিতে সবকিছু ভেসে গেছে। আমার দোকান এখন ধ্বংসস্তূপের নিচে।
দেবীঘাটের অন্য বাসিন্দাদের সঙ্গে গোবিন্দ প্রসাদও কাছের একটা স্কুলে অস্থায়ী তাঁবুতে আশ্রয় নিয়েছেন।
আইসিআইএমওডির ক্রায়োস্ফিয়ার (বরফ আচ্ছাদিত অঞ্চল) বিভাগের দূর অনুধাবন বিশ্লেষক সুদান বিকাশ মহার্জন বলেন, দেবীঘাট থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার উজানে এই দুর্যোগের সূত্রপাত। কিছুক্ষণের মধ্যেই পানি শহরে পৌঁছে যায়।
বর্ষায় এই এলাকায় ত্রিশূলী নদীতে সাধারণত প্রতি সেকেন্ডে ২০০ থেকে ৫০০ ঘনমিটার পানি প্রবাহিত হয়। তবে ওই দিন পানির প্রবাহ বেড়ে প্রতি সেকেন্ডে ১৭ হাজার ঘনমিটার হয়েছিল। সেই সঙ্গে বিপুল পরিমাণ কাদা ও বড় বড় পাথর নেমে এসেছিল।
সুদান বিকাশ বলেন, ত্রিশূলী নদীর পানির প্রবল স্রোত একটি পাহাড়ে ধাক্কা খেয়ে দিক পরিবর্তন করে। পরে সেই স্রোতে তাদি নদীর ওপর থাকা স্টিলের সেতুটা ভেসে যায়।
তিনি বলেন, যে ভবনগুলো এখনো দাঁড়িয়ে আছে, সেগুলোর অবস্থা যাচাই করবে সরকার। এরপর মানুষকে নিজেদের বাড়িতে ফেরার অনুমতি দেওয়া হবে।
দেবীঘাট থেকে ১৩ কিলোমিটার উজানে ত্রিশূলী বাজারেও প্রতিনিধি দলটি যায়। সেখানে ধ্বংসযজ্ঞ আরও ভয়াবহ। ত্রিশূলী বাজার ও নুয়াকোট বাজারের মধ্যে সংযোগকারী দুটি সেতুই পুরোপুরি ভেসে গেছে।
সুদান বিকাশ বলেন, নুয়াকোট সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত পৌরসভাগুলোর একটি। সেখানে প্রায় ৭ হাজার বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়েছে।
তিনি বলেন, এখানে একটা বিদ্যুৎকেন্দ্র ছিল। এখন সেটা ধ্বংসস্তূপের নিচে। এর বড় অংশ পানিতে ভেসে গেছে। দুর্যোগের আগে ও পরে তোলা উপগ্রহচিত্র দেখিয়ে তিনি এসব তথ্য জানান।
বন্যায় নুয়াকোট থেকে চীন সীমান্ত পর্যন্ত ৪২ কিলোমিটার সড়কও ভেসে গেছে। এটা চীনের সঙ্গে বাণিজ্য রক্ষার গুরুত্বপূর্ণ পথ ছিল। সুদান বিকাশ জানান, ওই এলাকার সব বাসিন্দা ও ব্যবসায়ী অন্যদিকে চলে গেছেন।
নেপালের ন্যাশনাল ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অথরিটির (এনডিআরআরএমএ) সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেদিনের বন্যায় এখন পর্যন্ত ১ হাজার ৩৮৬ জনের মৃত্যু সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া গেছে। নিখোঁজ আছেন অন্তত ৫ হাজার ১৩০ জন। উদ্ধারকর্মীরা ১৩ হাজার ৭২৮ জনকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিয়েছেন।
১২ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ৪ হাজার ৮০০টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, ১৩টি জলবিদ্যুৎকেন্দ্র, ৬৮টি ঝুলন্ত সেতু, ৩৭টি যান চলাচলের উপযোগী সেতু এবং ৬৯ কিলোমিটার সড়ক পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে।
এনডিআরআরএমএর ফোকাল পারসন বাদ্রি প্যাকুরেল বলেন, দুর্যোগে মোট কত ক্ষতি হয়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ তথ্য আমাদের কাছে নেই। এটা নির্ধারণ করতে সময় লাগবে।
তিনি বলেন, নেপাল সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে আমাদের উদ্ধার অভিযান এখনো চলছে। ধ্বংসস্তূপের মধ্যে মরদেহ খোঁজা হচ্ছে। দুর্গম কিছু এলাকায় এখনো উদ্ধার অভিযান শুরু করা সম্ভব হয়নি।
নেপালের ঘুরে দাঁড়ানোর পথ দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল হবে। প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতি ও প্রয়োজন নিরূপণ-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পুনরুদ্ধার ও পুনর্গঠন কার্যক্রম পুরোপুরি বাস্তবায়নে ৪৭৭ কোটি ডলার লাগতে পারে।
এই অর্থের বড় অংশই ব্যয় করতে হবে অবকাঠামো খাতে। আগস্টের বন্যায় গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, সেতু ও জলবিদ্যুৎকেন্দ্র ধ্বংস হওয়ায় এই খাত ভয়াবহ ক্ষতির মুখে পড়েছে।
দেবীঘাটের মতো বিধ্বস্ত এলাকাগুলোর জন্য বাড়িঘর, স্থানীয় অর্থনীতি ও মানুষের জীবন আবার গড়ে তোলার প্রথম ধাপ হবে প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান করা।

