মার্কিন ভিসা পাওয়ার ক্ষেত্রে কয়েক দফায় কঠোর বিধি-নিষেধ আরোপ করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। সেই তালিকায় যুক্ত হলো আরও এক শর্ত।
নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, যারা আবেদনে নিজ দেশে নির্যাতন বা নিপীড়নের আশঙ্কা রয়েছে বলে উল্লেখ করবেন, তাদের যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা দেওয়া হবে না।
সিএনএন বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের সরকারের এই সিদ্ধান্ত অভিবাসন নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের অংশ হিসেবে এসেছে, যা ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনা ও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
কী বলা হয়েছে নতুন নির্দেশনায়
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক কূটনৈতিক বার্তায় বিশ্বজুড়ে সব দূতাবাস ও কনস্যুলেটকে জানানো হয়েছে যে—ভিসা আবেদনকারীদের দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন করা হবে: আপনি কি আপনার দেশে কোনো ক্ষতি বা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন? নিজ দেশে ফিরে গেলে আপনি কি এমন ক্ষতি বা নির্যাতনের আশঙ্কা করছেন?
নির্দেশনায় স্পষ্ট বলা হয়েছে, আবেদনকারীকে এই দুটি প্রশ্নের উত্তর মৌখিকভাবে ‘না’ দিতে হবে। অন্যথায় ভিসা প্রক্রিয়া এগোবে না।
কোন ভিসার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য
এই নিয়ম মূলত নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা আবেদনকারীদের জন্য প্রযোজ্য। এর মধ্যে রয়েছে: পর্যটক ভিসা, শিক্ষার্থী ভিসা ও অস্থায়ী কর্মসংস্থান ভিসা।
অর্থাৎ যারা অল্প সময়ের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যেতে চান, তাদের ক্ষেত্রেই এই নতুন শর্ত কার্যকর হবে।
কেন এই সিদ্ধান্ত
ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন দীর্ঘদিন ধরেই অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। নতুন এই পদক্ষেপের মাধ্যমে তারা এমন আবেদনকারীদের ঠেকাতে চাইছে, যারা অস্থায়ী ভিসা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করে পরে আশ্রয় দাবি করতে পারেন।
নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ‘ভিসা আবেদনকারীরা যেন ভ্রমণের উদ্দেশ্য সম্পর্কে ভুল তথ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করে আশ্রয় প্রার্থনা করতে না পারেন, তা নিশ্চিত করতে হবে।’
মার্কিন কর্তৃপক্ষের মতে, কনস্যুলার কর্মকর্তারাই জাতীয় নিরাপত্তার প্রথম প্রতিরক্ষা লাইন।
আশ্রয় পাওয়ার শর্ত
মার্কিন আইনে আশ্রয় চাইতে হলে একজন ব্যক্তিকে যুক্তরাষ্ট্রে শারীরিকভাবে উপস্থিত থাকতে হবে এবং নিজ দেশে রাজনৈতিক, ধর্মীয় বা জাতিগত নিপীড়নের আশঙ্কা থাকতে হবে।
এই প্রেক্ষাপটে নতুন নিয়মটি কার্যত এমন ব্যক্তিদের জন্য ভিসা পাওয়ার পথ বন্ধ করে দিতে পারে, যারা নিরাপত্তাহীনতার কারণে দেশ ছাড়তে চান।
সমালোচনা ও উদ্বেগ
অভিবাসন নীতি বিশেষজ্ঞরা এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছেন।
নীতিবিশ্লেষক ক্যামিলি ম্যাকলার বলেন, ‘এই নিয়ম মানুষকে অত্যন্ত কঠিন অবস্থায় ফেলবে, যেখানে তাদের নিজেদের নিরাপত্তা ও পরিবারের ভবিষ্যতের মধ্যে কোনো একটিকে বেছে নিতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এতে মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ ও অনিরাপদ পথে দেশ ছাড়তে বাধ্য হতে পারে, কারণ যখন বাঁচার প্রশ্ন আসে, তখন মানুষ যেকোনো পথ বেছে নেয়।’
অভিবাসন নীতিতে বড় পরিবর্তন
এই নতুন নিয়ম একক কোনো পদক্ষেপ নয়। এর আগে শিক্ষার্থী ভিসার ক্ষেত্রে যাচাই-বাছাই বাড়ানো হয়েছে, কিছু অভিবাসন আবেদনের সিদ্ধান্ত সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়েছে এবং জানুয়ারিতে ৭৫টি দেশের জন্য অভিবাসী ভিসা প্রক্রিয়া স্থগিত করা হয়।
এসব পদক্ষেপ একসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ব্যবস্থাকে আরও কঠোর করে তুলেছে।
সম্ভাব্য প্রভাব
বিশ্লেষকদের মতে, এই নীতি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। যেমন: প্রকৃত আশ্রয়প্রার্থীরা বৈধ পথে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে আরও বাধার মুখে পড়বেন, অনিয়মিত বা ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসন পথ বাড়তে পারে এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর সমালোচনা বাড়তে পারে।
উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্বজুড়ে আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য। তবে নতুন এই নীতির ফলে সেই পথ আরও সংকুচিত হচ্ছে।
নিরাপত্তা ও অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের যুক্তি সামনে রেখে নেওয়া এই সিদ্ধান্ত মানবিক বিবেচনা ও আন্তর্জাতিক আইন—দুইয়ের মধ্যেই নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এর প্রভাব শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং বৈশ্বিক অভিবাসন প্রবণতা ও নীতিতেও এর প্রতিফলন দেখা যেতে পারে।

