মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের সঙ্গে দ্রুত একটি সমঝোতা সম্ভব হলে তিনি আপাতত দেশটিতে নতুন করে সামরিক হামলা চালাবেন না। সম্ভাব্য ওই সমঝোতার মূল বিষয় হবে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি বন্ধ করা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, শনিবার রাতে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প দাবি করেন, ইরান এবং ‘মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশ’ একটি চুক্তি সম্পন্ন করার জন্য সময় চেয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে তিনি পরিকল্পিত হামলা আপাতত বাতিল করেছেন।
ট্রাম্প লেখেন, ‘বিশ্বের ভবিষ্যৎ এবং একটি সফল ও সমৃদ্ধ ইরানের টিকে থাকার স্বার্থে আমি হামলা বাতিল করতে সম্মত হয়েছি। তবে দ্রুত একটি চুক্তি হতে হবে।’
তিনি আরও দাবি করেন, এ সিদ্ধান্তে ইসরায়েলও তার সঙ্গে রয়েছে। যদিও এ বিষয়ে ইসরায়েল তাৎক্ষণিকভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেনি।
তবে ট্রাম্প একইসঙ্গে ইরানের প্রতি অনাস্থার কথাও জানান। শুক্রবার ক্যাম্প ডেভিডে মন্ত্রিসভার বৈঠকে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের আলোচক দল যার মধ্যে তার জামাতা জ্যারেড কুশনার, মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও রয়েছেন, এখনো একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন।
কিন্তু ইরান বারবার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে বলে অভিযোগ করে ট্রাম্প বলেন, ‘তাদের ওপর আমার আস্থা কমে যাচ্ছে।’
অন্যদিকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলাই ইরানকে আলোচনায় বসতে বাধ্য করেছে।
আল জাজিরার তথ্য অনুযায়ী, ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রুবিও দাবি করেন, মার্কিন হামলায় ইরানের নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, উৎক্ষেপণ প্ল্যাটফর্ম এবং অস্ত্র উৎপাদন সক্ষমতা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
রুবিওর ভাষ্য, ইরানের কাছে এখনো ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন রয়েছে এবং তারা ক্ষতি করার সক্ষমতাও রাখে। তবে আগের মতো শক্তিশালী প্রচলিত সামরিক প্রতিরক্ষা আর নেই।
তার দাবি, এ কারণেই ইরান এখন পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ এবং হরমুজ প্রণালি নিয়ে চুক্তি করতে আগ্রহী।
তবে তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের এ বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করেছে।
রয়টার্স জানায়, শনিবার তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরবের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে পৃথক ফোনালাপে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র নতুন কোনো হামলা চালালে তার ‘দৃঢ় ও সমানুপাতিক জবাব’ দেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের যেকোনো সামরিক অভিযানে আঞ্চলিক কোনো দেশ অংশ নিলে তারও জবাব দেওয়া হবে।
এদিকে আল জাজিরার খবরে বলা হয়, ট্রাম্পের হামলা বন্ধের ঘোষণার আগে ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিশনের মুখপাত্র হাসান ঘাশঘাভি অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্র একদিকে প্রকাশ্যে হামলার হুমকি দিচ্ছে, অন্যদিকে গোপন যোগাযোগের মাধ্যমে আলোচনার চেষ্টা করছে।
তিনি বলেন, ‘গণমাধ্যমে তারা উত্তেজনা বাড়ানোর কথা বলে, কিন্তু বিদ্যমান কূটনৈতিক চ্যানেলে আলোচনার দাবি জানায়। ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানকে তারা প্রতারিত করতে পারবে না।’
তার দাবি, যুদ্ধ হোক বা আলোচনা, হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল কীভাবে পরিচালিত হবে, সে সিদ্ধান্ত তেহরানই নেবে।
একই প্রতিবেদনে ইরান-চীন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মাজিদরেজা হারিরির বক্তব্যও তুলে ধরা হয়েছে। তিনি দাবি করেন, ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা চালানোর ‘সাহস’ যুক্তরাষ্ট্রের নেই। কারণ, ইরানের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামো অত্যন্ত বিস্তৃত ও বিকেন্দ্রীভূত হওয়ায় তা সম্পূর্ণ অচল করে দেওয়া সহজ নয়।
এর মধ্যেই আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও বেড়েছে। রয়টার্স জানায়, কুয়েতের সেনাবাহিনী শনিবার দেশটির গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার দিকে ছোড়া কয়েকটি ড্রোন ভূপাতিত করেছে। ওমান উপকূলের কাছেও দুটি পৃথক সামুদ্রিক হামলার খবর দিয়েছে যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস। এর একটিতে একটি তেলবাহী জাহাজের ইঞ্জিন কক্ষে অজ্ঞাত বস্তুর আঘাতে ক্ষতি হয়েছে। অন্য ঘটনায় একটি জাহাজের কাছাকাছি বিস্ফোরণ ঘটলেও বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।
রয়টার্স আরও জানিয়েছে, ইরানের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা সংস্থার ঘনিষ্ঠ সংবাদমাধ্যম নুরনিউজ সতর্ক করেছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা চালায়, তাহলে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও ইসরায়েলের জ্বালানি স্থাপনাগুলোও ইরানের পাল্টা হামলার লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।
এই সংঘাতের বিরূপ প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর থেকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
জুলাই মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ২৪ শতাংশ বেড়েছে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে।
এ ছাড়া, ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুতি গোষ্ঠী লোহিত সাগরের বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ওপর নতুন হুমকি দেওয়ায় মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিশ্ববাজারে জ্বালানি রপ্তানি নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

