দেশজুড়ে এত এত সংকট, ‘রাগ করলা?’

নানা সংকটে এক কঠিন সময় পার করছে দেশ। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সংকট, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, হামে শিশুমৃত্যু, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন বাণিজ্য চুক্তির কারণে দেশের বাণিজ্যিক ভবিষ্যৎ নিয়ে আশঙ্কায় এক অনিশ্চয়তায় রয়েছে মানুষ।

শিক্ষাঙ্গনগুলোতেও চলছে অস্থিরতা, ধর্ষণচেষ্টার প্রতিবাদে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী আন্দোলন, ডুয়েটে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষের মধ্যেই ঈদের আগে বকেয়া বেতনের দাবি জানাচ্ছে পোশাক শ্রমিকরা।

পাশাপাশি সামনে পবিত্র ঈদুল আজহা, ঈদযাত্রায় রয়েছে দুর্ভোগের আশঙ্কা। কিন্তু বড় বড় সব জাতীয় সমস্যা, জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যু, অর্থনৈতিক চাপ আর সামাজিক অস্থিরতাকে ছাপিয়ে হঠাৎ সবাই মেতে উঠেছে একটি হালকা বিষয় নিয়ে—

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন মিম পেজ থেকে শুরু করে কনটেন্ট ক্রিয়েটর, ইনফ্লুয়েন্সার, মিডিয়া এজেন্সি, রাজনৈতিকভাবে সচেতন ব্যক্তি, শিক্ষার্থী, সাধারণ মানুষের কাছে এখন সবচেয়ে জনপ্রিয় শব্দযুগল—‘রাগ করলা?’

শুধু হালকা রসবোধ নয়, বিভিন্ন করপোরেট হাউসের বিজ্ঞাপন, সামাজিক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুও প্রকাশ করা হচ্ছে এই দুটি শব্দ দিয়ে। এমনকি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনও খালে ময়লা না ফেলার আহ্বান জানিয়ে ফেসবুকে ‘রাগ করলা’ ব্যবহার করে সচেতনতামূলক পোস্ট দিয়েছে।

কোথা থেকে এলো

গত কয়েকদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঝড় তোলা ‘রাগ করলা’ শব্দযুগলের উৎপত্তি ‘ইমান আলী (Iman Alli)’ নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকে শেয়ার করা কিছু ভিডিও থেকে। ভিডিওতে একজন কবিরাজ, গণক কিংবা জ্যোতিষীর মতো দেখতে একজন মানুষের হাত দেখে ভাগ্য গণনা করেন। কোনো বাসস্ট্যান্ডে, বাজারে কিংবা কোনো সড়কের পাশে কাউকে পেলে তার পথ আটকে অতীত ও বর্তমানের সুখ, দুঃখ, কষ্ট, মনস্তাত্ত্বিক পরিস্থিতির বিবরণ দিতে দিতে বলছেন ‘কথাটা ঠিক না বেঠিক?’ উত্তর পেলে আবারও জিজ্ঞাসা করছেন, ‘কী, রাগ করলা?’

পেজটির ফলোয়ার প্রায় এক লাখ ৪০ হাজারের বেশি। পেজটিতে গত ১২ মে পোস্ট করা একটি ভিডিও দেখা হয়েছে প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখের বেশি বার। ভিডিওটিতে দেখা যায়, থেমে থাকা একটি বাসের পাশে ওই কবিরাজ এক যুবকের ভাগ্য গণনা করছেন। সহজ-সরল চেহারার ওই যুবকের অতীত-বর্তমানের ব্যক্তিজীবন, আর্থিক বিষয়াদি নিয়ে সাধারণ কিছু কথা বলে তাকে একপ্রকার ‘বশ’ করে ৫০০ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন ওই ‘কবিরাজ’। আরেকটি ভিডিওতে দেখা গেছে আরেক যুবকের কাছ থেকে প্রায় ৫ হাজার হাতিয়ে নিতে।

ইমান আলী কে

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে প্রথম ওই ভিডিওটি ধারণ করা হয়েছে গাজীপুরের চন্দ্রা ত্রিমোড় এলাকায়। আরও জানা যায়, ওই এলাকার কাছেই সফিপুর এলাকাতেই থাকেন ওই ‘কবিরাজ’, যার প্রকৃত নাম ইমান আলী। পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন কনটেন্ট তৈরি। 

 ইমান আলীর মতে, ভাগ্য গণনার নামে প্রতারণা থেকে মানুষকে সচেতন করতেই এ ধরনের ভিডিও তৈরি করছেন তিনি। এর পেছনে তার নিজের প্রতারিত হওয়ার ঘটনাও আছে।

ইমান আলী দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, ঘটনাটি ৬-৭ বছর আগে, ঘটেছিল ঢাকার যাত্রাবাড়ী এলাকায়। সেসময় তিনি রিকশা চালাতেন। 

হঠাৎ গ্যারেজের সামনে তার সঙ্গে দেখা হয় এক লোকের। তিনি ইমান আলীকে একটি গাছের ডাল দিয়ে বলেছিলেন সেটি তার অনেক উপকারে আসবে এবং এর বিনিময়ে তিনি সরল ইমান আলীর কাছ থেকে ৭ হাজার টাকা হাতিয়ে নেন।

‘আমি প্রতারিত হওয়ার পর বেশ ভেঙে পড়ি। পরে একবার মনে হলো মানুষকে সচেতন করা প্রয়োজন, যেন আর কেউ আমার মতো এভাবে বিপদে না পড়ে। আমার একজন গুরু ছিলেন, তিনি আমাকে বলেছিলেন মোবাইল ফোনে ভিডিও তৈরি করে মানুষকে বলা যায়। তারপর থেকে এই ভিডিওটি তৈরি শুরু করি,’ বলেন তিনি।

ইমান আলী তার পরিবার নিয়ে সফিপুর এলাকাতেই থাকেন। প্রায় ২০ বছর আগে তিনি ঢাকা এসেছিলেন লালমনিরহাটের হাতিবান্ধা থেকে। রিকশা চালিয়েছেন, মাটি কেটেছেন, দিনমজুরের কাজ করেছে। তারপর ভাগ্যের সন্ধান করতে করতে একসময় গাজীপুরে বসবাস শুরু করেন।

ভিডিওতে তার বলা ‘রাগ করলা’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে যাওয়ায় বেশ খুশি তিনি। ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘সবাই খুঁজতেছে আমাকে, ফোন দিচ্ছে, সাংবাদিকরা আসছেন, আমার গল্প শুনতে চাচ্ছেন। এটা তো আমার অনেক বড় পাওয়া।’

‘রাগ করলা’ যেভাবে ট্রেন্ড 

ইমান আলীর ভাগ্য গণনার ভিডিও ‘ট্রেন্ড’ হওয়ার অন্যতম কারণ সেগুলোর অনুকরণে কনটেন্ট ক্রিয়েটর, সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সারদের বিভিন্ন ভিডিও। বিভিন্ন ধরনের সামাজিক, রাজনৈতিক ইস্যু ছাড়াও মানুষের একদম ব্যক্তি ও পারিবারিক জীবনের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ভিডিও হচ্ছে, তার তার সঙ্গে যোগ হচ্ছে ‘রাগ করলা’।

এই শব্দ দুটি কেন কনটেন্টে এলো—সে বিষয়ে লেখক ও ক্রিয়েটর সোহাইল রহমান ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘বাংলাদেশে কোন জিনিস কখন “ভাইরাল” হবে তা আগে থেকে কেউ বলতে পারে না বা আন্দাজ করতে পারে না। অনেক কিছু ২০ বছর পর জনপ্রিয় হয়, আবার কোনোটা প্রথমদিনেই হয়ে যায়। মূলত “রাগ করলা” শব্দ দুটি একটু নতুন, যিনি প্রথম এটা ব্যবহার করেছেন তার বলার ভঙ্গীর মধ্যে কিছুটা আবেগ আছে। আর হুট করে অল্প সময়ে বেশ কয়েকজন তাকে অনুকরণ করে ভিডিও তৈরি করায় এটা দ্রুত সবার মাঝে ছড়িয়ে গেছে।’

‘আরেকটা বিষয়ে হলো গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে দেশের জনগণ রাজনীতি নিয়ে আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন। তাই যেকোনো মিম বা কনটেন্ট পলিটিক্যালি বা রাজনৈতিকভাবে ব্যবহৃত হলে সেটি দ্রুত জনপ্রিয় হয়,’ বলেন তিনি।

কতদিন থাকবে এই ‘ট্রেন্ড’

সোহাইলের ধারণা, এই ‘রাগ করলা’ ট্রেন্ডটি বেশিদিন স্থায়ী হবে না। তিনি বলেন, ‘আগে যেমন তরমুজ বা আগারগাঁওয়ের কেক নিয়ে একটা ট্রেন্ড এসে আবার দ্রুত হারিয়ে গেছে, তেমনি নতুন কোনো ইস্যু এলে এই শব্দ দুটিও হয়তো মানুষ ভুলে যাবে।

বিশ্লেষকদের মতে, হামের প্রাদুর্ভাব, আসন্ন ঈদ কিংবা অর্থনৈতিক-বাণিজ্যিক ইস্যুর কারণে মানুষের মাথা ভারী হয়ে যাওয়ায় ‘রাগ করলা’র মতো হালকা মেজাজের মিম মগজকে একটু বিশ্রাম দেয়। মানুষ যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে থাকে, তখন মগজকে আরাম দিতে এই হালকা কনটেন্টগুলোতে বেশি সময় ব্যয় করে।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সামিনা লুৎফা ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘মূলত সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদমের কারণে “হালকা” বিষয়গুলোই মানুষ বেশি দেখে এবং ভাইরাল হয়। এ ধরনের ট্রেন্ডের জন্য শুধু মানুষকে দোষ দিয়ে লাভ নেই।

‘কিন্তু দেশ ভাইরালের ওপর ভিত্তি করে চলতে পারে না। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো ভাইরালের তোয়াক্কা না করে প্রকৃত গুরুত্ব ও অগ্রাধিকার অনুযায়ী পরিচালনা করা উচিত। কারণ ভাইরাল বিষয় অল্প সময় ট্রেন্ড থাকলেও মাঝের অনেক গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সমস্যা বা ইস্যু আড়ালে রয়ে যায় বা চাপা পড়ে যায়,’ বলেন তিনি।

তবু, ইমান আলী তার কাজ নিয়ে বেশ আশাবাদী। তিনি মনে করেন, মানুষকে সচেতন করার মধ্য দিয়ে যেভাবে তার ‘রাগ করলা’ যেভাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে, জনগণের ভালোবাসা নিয়ে তিনি এভাবে ভিডিও তৈরির কাজ করে যাবেন।

ডেইলি স্টারকে ইমান আলী বলেন, ‘আমি যেহেতু এটা নিয়ে নেমেছি, মানুষ আমাকে চিনেছে, এখন এটা নিয়েই পড়ে থাকতে চাই। মানুষের এই ভালোবাসাই আমার কাছে অনেক বড়। রাগ করলা?’

Related Articles

Latest Posts