তুরস্ক-কুর্দির ৪ দশকের সংঘাতের অবসান হচ্ছে যেভাবে

তুরস্কের পার্লামেন্টে একটি যুগান্তকারী বিল পাস হয়েছে, যা দেশটির চার দশকের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসান ঘটাতে পারে।

বার্তাসংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত সোমবার সশস্ত্র গোষ্ঠী কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টির (পিকেকে) সঙ্গে তুরস্ক সরকারের এই দীর্ঘস্থায়ী দ্বন্দ্ব নিরসনে বিপুল ভোটে বিলটি পাস হয়।

নিউইয়র্ক টাইমস জানায়, তুরস্কের পার্লামেন্টের ৬০০ আসনের মধ্যে ৪৬৮-৮৮ ভোটে অনুমোদিত হয় এই ঐতিহাসিক আইন।

সরকারের পক্ষ থেকে এই উদ্যোগকে একটি ‘সন্ত্রাসমুক্ত তুরস্ক’ গড়ার রূপকল্প হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

ফিনান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন এই আইনের অধীনে হাজারো কুর্দি যোদ্ধার পুনর্বাসনের উদ্দেশ্যে শর্তসাপেক্ষ ক্ষমার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এই ক্ষমার প্রথম ও প্রধান শর্ত হলো, পিকেকে-কে তাদের সব অস্ত্র সমর্পণ করতে হবে এবং নিজেদের সাংগঠনিক কাঠামো সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত করতে হবে।

তুর্কি পার্লামেন্টের স্পিকার নুমান কুরতুলমুশ এই বিল পাসের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেছেন।

তিনি বলেন, ‘সশস্ত্র সংগঠনটির অস্ত্র সমর্পণ ও বিলুপ্তির মাধ্যমে আমরা শান্তি, ভ্রাতৃত্ব ও সংহতির যুগ গড়ে তুলব।’

তুরস্ক ও কুর্দিদের মধ্যকার এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের ইতিহাস প্রায় ৪২ বছরের পুরোনো।

এএফপির তথ্য অনুযায়ী, কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টি বা পিকেকে ১৯৭৮ সালে আঙ্কারা বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থীর হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী থাকা অবস্থায় দলটি প্রতিষ্ঠা করেন আবদুল্লাহ ওজালান।

শুরুর দিকে পিকেকের রাজনৈতিক আদর্শ ছিল মূলত মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী ভাবধারার ওপর ভিত্তি করে গড়া। আর তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল একটি স্বাধীন কুর্দি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা।

১৯৮০ সালে তুরস্কে সামরিক অভ্যুত্থানের পর পিকেকের নেতারা দেশ ছেড়ে সিরিয়া ও লেবাননে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। পরবর্তী সময়ে ১৯৮৪ সালে তারা তুরস্ক সরকারের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক সশস্ত্র লড়াই শুরু করে। তাদের যোদ্ধারা লেবাননের পূর্ব বৈরুতের বেকা উপত্যকায় সামরিক প্রশিক্ষণ নেয় এবং দক্ষিণ-পূর্ব তুরস্কে তুর্কি সামরিক চৌকি ও কনভয়ের ওপর হামলা চালাতে থাকে।

এর জবাবে তুর্কি সামরিক বাহিনীও কঠোর সামরিক অভিযান চালায়, যা তুরস্কের কুর্দি-অধ্যুষিত দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলে এক বিশাল সহিংসতার জন্ম দেয়।

নিউইয়র্ক টাইমসের তথ্য অনুযায়ী, চার দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা এই সহিংসতায় এ পর্যন্ত প্রাণ হারিয়েছেন ৪০ হাজারের বেশি মানুষ।

দীর্ঘমেয়াদি এই সংঘাতের ফলে তুরস্কের অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে এক বিরাট ধাক্কা লেগেছে, যার আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির আনুমানিক পরিমাণ প্রায় ২ ট্রিলিয়ন (২ লাখ কোটি) মার্কিন ডলার।

তুরস্কের সাধারণ জনগণের বড় অংশও এই দ্বন্দ্বের ফলে রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন।

রয়টার্স জানায়, পিকেকেকে একটি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে তুরস্ক, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন।

শুরুর দিকে দলটির লক্ষ্য ছিল স্বাধীন কুর্দি রাষ্ট্র গঠন। তবে পরবর্তীতে আবদুল্লাহ ওজালান পিকেকের আদর্শিক পরিবর্তন ঘটান। তারা এখন তুরস্কের সার্বভৌমত্ব মেনে নিয়ে কুর্দিদের সাংস্কৃতিক অধিকার, কুর্দি ভাষায় শিক্ষা লাভ ও গণমাধ্যম চালু এবং রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি জানিয়ে আসছেন।

এপির তথ্য অনুযায়ী, তুরস্ক সরকারের সঙ্গে আগেও কয়েকবার শান্তি আলোচনা হয়েছিল, যার মধ্যে ২০১৫ সালের শান্তি প্রক্রিয়াটি শেষ মুহূর্তে ব্যর্থ হয়।

তবে ২০২৪ সাল থেকে নতুন করে গোপনে আবারও এই শান্তি প্রক্রিয়ার সূচনা শুরু হয় বলে জানায় নিউইয়র্ক টাইমস।

এপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, তুর্কি পার্লামেন্টে পাস হওয়া এই নতুন আইনে মোট ১২টি অনুচ্ছেদ আছে। এতে মিলিট্যান্ট বা যোদ্ধাদের নিরস্ত্রীকরণ এবং সামাজিক পুনর্বাসনের জন্য সুনির্দিষ্ট আইনি রূপরেখা দেওয়া হয়েছে।

বিলটির প্রধান শর্ত হলো, পিকেকে-কে অবশ্যই সম্পূর্ণভাবে তাদের অস্ত্র সমর্পণ করতে হবে এবং নিজেদের বিলুপ্ত করতে হবে।

ফিনান্সিয়াল টাইমস জানায়, তুরস্কের জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিল (এনএসসি) যোদ্ধাদের অস্ত্র সমর্পণের বিষয়টি মাঠ পর্যায়ে পরীক্ষা করে দেখার পর এটি চূড়ান্তভাবে কার্যকর হবে।

পুরো প্রক্রিয়া নিখুঁতভাবে তদারকি করার জন্য দেশের ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তা, মন্ত্রী এবং তুর্কি গোয়েন্দাপ্রধানের সমন্বয়ে বিশেষ গোয়েন্দা ও সংসদীয় কমিটি গঠনের বিধানও রাখা হয়েছে।

আইনের ধারা অনুযায়ী, আত্মসমর্পণকারী যোদ্ধাদের ওপর চলমান সব তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া স্থগিত রাখা হবে। অপরাধের তীব্রতার ওপর ভিত্তি করে এই বিচার কার্যক্রম স্থগিত থাকবে ৫ থেকে ১০ বছরের জন্য।

এই নির্দিষ্ট স্থগিতকালীন সময়ে যদি কোনো মিলিট্যান্ট নতুন কোনো সন্ত্রাসী বা আইনবিরোধী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত না হন, তবে তাদের পূর্বের সব মামলা এবং আইনি প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ প্রত্যাহার বা নিষ্পত্তি করে নেওয়া হবে।

ফিনান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরাক, সিরিয়া কিংবা বিশ্বের অন্যান্য দেশে নির্বাসিত জীবনযাপন করা যোদ্ধারাও এই নতুন আইনের অধীনে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সুযোগ পাবেন। জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত সরকারি গেজেটে প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে নির্বাসিত যোদ্ধারা আবেদন করার জন্য সর্বোচ্চ ৬ মাস সময় পাবেন।

যারা পরবর্তীতে নতুন কোনো অপরাধে জড়াবেন না, তারা আইনের মাধ্যমে মূলধারার রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার এবং রাজনৈতিক অধিকার লাভ করার যোগ্যতা অর্জন করবেন। এর ফলে তুরস্কের সুপরিচিত কুর্দি রাজনীতিক সেলাহাতিন দেমিরতাশের কারাগার থেকে মুক্তির পথ সুগম হতে পারে। তিনি ২০১৬ সাল থেকে কারাবন্দি আছেন।

তবে সরকার বা সরকারি কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে দেমিরতাশের মুক্তির বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক বা প্রকাশ্য বিবৃতি দেওয়া হয়নি।

এই ঐতিহাসিক আইনটি কোনো ঢালাও বা সাধারণ ক্ষমা নয়। এতে সুনির্দিষ্ট কিছু কঠোর ব্যতিক্রমও রাখা হয়েছে।

এপি জানায়, বিশেষ করে যেসব মিলিট্যান্ট সরাসরি পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বা খুনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তারা কোনোভাবেই এই আইনের সুবিধা পাবেন না।

এছাড়া নিউইয়র্ক টাইমসের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৫ সালের জুনের আগে আদালত কর্তৃক যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিরাও এই আইনের সুবিধা থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত থাকবেন।

এই নিয়মের কারণে পিকেকের অন্যতম প্রধান নেতা আবদুল্লাহ ওজালান নতুন এই আইন থেকে সরাসরি বাদ পড়েছেন। তিনি ১৯৯৯ সাল থেকে ইস্তাম্বুলের দক্ষিণে ইমরালি নামের একটি দ্বীপ কারাগারে সম্পূর্ণ নিঃসঙ্গ বন্দিজীবন কাটাচ্ছেন বলে জানায় নিউইয়র্ক টাইমস।

৭৭ বছর বয়সী ওজালান গত বছর কারাগার থেকেই পিকেকের প্রতি জনসমক্ষে অস্ত্র ত্যাগ করার একটি আহ্বান জানান।

তার যুক্তি ছিল, সশস্ত্র লড়াইয়ের দিন এখন শেষ। আর কুর্দিদের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই এখন কেবল রাজনৈতিক উপায়েই এগিয়ে নিয়ে যাওয়া উচিত।

এই আহ্বানের প্রতি সম্মান জানিয়ে পিকেকে গত বছরের মে মাসে তাদের সশস্ত্র লড়াই বন্ধের চূড়ান্ত ঘোষণা দেয়। জুলাইয়ে উত্তর ইরাকে এক প্রতীকী অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাদের ভারী ও মাঝারি অস্ত্র আগুনে পুড়িয়ে দেয়।

নতুন এই আইন পাস হওয়ার পর পিকেকে-সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যম ‘এএনএফ’-এ প্রকাশিত এক বিবৃতিতে দলটি জানায়, আইনটি চমৎকার একটি ‘শুরু’ হলেও এর মধ্যে মারাত্মক কিছু রাজনৈতিক ও আইনি সীমাবদ্ধতা আছে।

পিকেকের দাবি, তাদের সর্বোচ্চ নেতা আবদুল্লাহ ওজালানকে কারাগার থেকে মুক্তি দিয়ে তাকে এই শান্তি প্রক্রিয়ায় সরাসরি ও মুক্তভাবে নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ দেওয়া উচিত। তারা আরও সতর্ক করেছে, কুর্দিদের মৌলিক রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার নিশ্চিত না করা হলে এবং তুরস্কের মাটিতে তাদের রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের রাজনৈতিক অধিকার না থাকলে যোদ্ধারা সম্পূর্ণভাবে অস্ত্র ত্যাগ করে ফিরে আসবে না।

এপি জানায়, তুরস্কের বর্তমান প্রধান কুর্দিপন্থী দল ডেম (ডিইএম) পার্টিও ওজালানকে মুক্তি দিয়ে তাকে এই শান্তি প্রক্রিয়া পরিচালনার জন্য আনুষ্ঠানিক মর্যাদা দেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছে।

তবে সরকারের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো ইঙ্গিত দিয়েছে যে, ওজালানের মুক্তির কোনো সম্ভাবনা না থাকলেও ইমরালি কারাগারে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ ও যোগাযোগের সুযোগ আগের চেয়ে আরও বাড়ানো হতে পারে।

ফিনান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, এই শান্তি বিল পাসের পেছনে প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের একটি বড় দূরদর্শী রাজনৈতিক ও নির্বাচনী উদ্দেশ্য আছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

তুরস্কের বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি দুই মেয়াদের বেশি প্রেসিডেন্ট পদে দায়িত্ব পালন করতে পারেন না।

তবে এপি জানায়, পার্লামেন্ট যদি তার মেয়াদের মধ্যে আগাম সাধারণ নির্বাচনের ডাক দেয়, তাহলে এরদোয়ানের সামনে পুনরায় নির্বাচনে লড়ার একটি সাংবিধানিক সুযোগ তৈরি হবে।

কুর্দিপন্থী ডেম পার্টির সঙ্গে সুসম্পর্ক স্থাপন এবং এই শান্তি বিলের মাধ্যমে তাদের সমর্থন আদায় করতে পারলে এরদোয়ানের দল একে পার্টি পার্লামেন্টে আগাম নির্বাচনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন অর্জন করতে সক্ষম হবে।

২০২৮ সালের মে মাসে দেশটির পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে বলে জানায় এপি।

নিউইয়র্ক টাইমস জানায়, তুরস্কের উগ্র জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক দলগুলো এই পুরো শান্তি প্রক্রিয়ার কড়া সমালোচনা ও তীব্র বিরোধিতা করছে। দেশটির ডানপন্থী দল আইয়ি পার্টির চেয়ারম্যান মুসাভাত দেরভিশোগ্লু পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে এই আইনকে চরম ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ বা ‘দেশদ্রোহিতা’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।

তিনি বলেন, ‘এই আইনের মাধ্যমে সন্ত্রাসীদের পুরস্কৃত করা হচ্ছে। পিকেকে চার দশক ধরে অস্ত্রের মুখে যা অর্জন করতে পারেনি, তা এখন তারা রাজনীতির মাধ্যমে অর্জনের সুযোগ পাচ্ছে। এই বিলের মূল উদ্দেশ্য পিকেকে দমন করা নয়, বরং এরদোয়ানের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার পথ প্রশস্ত করা।’

তাছাড়া তুরস্কের অন্যতম বড় বিরোধী দল সিএইচপি এবং দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক বিশ্লেষক এরদোয়ান সরকারের এই শান্তি উদ্যোগের সততা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

বিশেষ করে ২০২৫ সালের মার্চে তুরস্কের অন্যতম প্রভাবশালী বিরোধী নেতা ও ইস্তাম্বুলের মেয়র একরেম ইমামোগলুকে দুর্নীতি ও রাজনৈতিক মামলায় গ্রেপ্তারের কঠোর সমালোচনা করা হচ্ছে।

আঙ্কারার মেয়র এবং বিরোধী নেতা মনসুর ইয়াভাশ মন্তব্য করেছেন, ‘কেবল একটি আইন পাসের মাধ্যমে দেশে প্রকৃত শান্তি ফিরিয়ে আনা অসম্ভব। গণতন্ত্র, আইন এবং স্বাধীনতা যদি দেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য সমান না হয়, তবে সেই শান্তির কোনো মূল্য নেই।’

এই নতুন আইনের ভূরাজনৈতিক প্রভাব কেবল তুরস্কের সীমানার ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং এটি সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক দৃশ্যপটকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করতে পারে।

ফিনান্সিয়াল টাইমস জানায়, পিকেকের সঙ্গে তুরস্কের দীর্ঘস্থায়ী এই রক্তাক্ত সংঘাতের অবসান ঘটলে আঙ্কারা মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অন্যান্য বড় সংকটে আরও গভীরভাবে রাজনৈতিক মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ পাবে। এটি ইতোমধ্যে তুরস্ক ও ইরাকের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ককে অনেক বেশি শক্তিশালী করে তুলেছে। বিশেষ করে দীর্ঘকাল বন্ধ থাকা কিরকুক-জেহান পাইপলাইনের মাধ্যমে ইরাকি তেল পুনরায় তুরস্কে সরবরাহ করার ব্যাপারে দুই দেশের মধ্যে সই হয়েছে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি।

এই শান্তি প্রক্রিয়া যুদ্ধবিধ্বস্ত প্রতিবেশী রাষ্ট্র সিরিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও শান্তি ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। সিরিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে কুর্দি নেতৃত্বাধীন সিরীয় ডেমোক্রেটিক ফোর্সেস (এসডিএফ) যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে একটি বড় এলাকা শাসন করে আসছিল, যাকে আঙ্কারা গণ্য করে পিকেকের সরাসরি একটি সিরীয় শাখা হিসেবে।

এপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই নতুন আইনের কারণে পিকেকের বিলুপ্তি ঘটলে সিরিয়া সরকারের জন্য কুর্দি-অধ্যুষিত উত্তর-পূর্বাঞ্চলে পুনরায় নিজেদের রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার প্রক্রিয়া অনেক সহজ ও নির্বিঘ্ন হবে।

ফিনান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, এটি সিরিয়া সংকটের স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য নীতিতে এক বিরাট বদল নিয়ে আসবে, যা পুরো মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা আনার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্যের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ।

তুরস্কের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেভদেত ইয়িলমাজ আশা প্রকাশ করেছেন যে, এই দ্বন্দ্বের চিরতরে সমাপ্তি তুরস্ককে ‘উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের এক নতুন ধাপে’ নিয়ে যাবে।

চার দশকের রক্তক্ষয়ী ইতিহাসের পর তুর্কি পার্লামেন্টের এই আইন শেষ পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যের এই অংশে টেকসই শান্তি বয়ে আনতে পারে কি না, এখন সেটিই দেখার বিষয়।

Related Articles

Latest Posts