জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে তাপপ্রবাহের তীব্রতা ও স্থায়িত্ব বাড়ছে। এতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ছেন সন্তানসম্ভবা নারী ও তাদের গর্ভের শিশুরা। গবেষণায় দেখা গেছে, সন্তানসম্ভবা নারীর বসবাসের এলাকায় গড় তাপমাত্রা ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লে অকাল প্রসবের আশঙ্কা বাড়ে ৪ শতাংশ। একইসঙ্গে গর্ভপাত, মৃত সন্তান প্রসব, জন্মগত ত্রুটি ও উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকিও বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে।
সম্প্রতি ২০০টিরও বেশি গবেষণার তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে ‘তাপপ্রবাহ কীভাবে সন্তানসম্ভবা নারী ও তার গর্ভের শিশুর ক্ষতি করছে’ তা তুলে ধরেছে রয়টার্স।
প্রতিবেদনে বলা হয়, এ ঝুঁকি শুধু বিশ্বের উষ্ণতম অঞ্চলে বসবাসকারী নারীদের জন্য নয়। তুলনামূলক শীতল বা নাতিশীতোষ্ণ এলাকাতেও তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বাড়লে গর্ভাবস্থায় জটিলতা দেখা দিতে পারে।
তাপপ্রবাহের সঙ্গে সবচেয়ে স্পষ্ট সম্পর্ক পাওয়া গেছে অকাল প্রসবের। একইসঙ্গে সময়ের আগে জন্ম নেওয়া শিশুর দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকতে পারে।
মেক্সিকোর ২০০৮ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ৮০ লাখের বেশি শিশুর জন্মের তথ্য বিশ্লেষণ করে রয়টার্স জানায়, গর্ভাবস্থার শেষ মাসে গরমের মৌসুমে তাপপ্রবাহের সংস্পর্শ যত বেড়েছে, অকাল প্রসবের হারও তত বেড়েছে। এ ক্ষেত্রে অকাল প্রসবের হার সর্বোচ্চ ১৮ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।
যেসব নারী গরমের মৌসুমে কোনো তাপপ্রবাহের মুখে পড়েননি, তাদের ক্ষেত্রে অকাল প্রসবের হার ছিল ৭ দশমিক ২ শতাংশ।
প্রতিবেদনে বলা হয়, তাপপ্রবাহের কারণে গর্ভাবস্থায় জটিলতা শুধু কোনো নির্দিষ্ট দেশ বা জলবায়ু অঞ্চলের সমস্যা নয়। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে এ ঝুঁকি দেখা যাচ্ছে।
মেক্সিকোর মরুভূমি, আর্দ্র বনাঞ্চল ও নাতিশীতোষ্ণ পাহাড়ি অঞ্চলের তথ্য বিশ্লেষণ করে রয়টার্স জানায়, তাপপ্রবাহের সঙ্গে অকাল প্রসবের সম্পর্ক রয়েছে। চীন, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা ও যুক্তরাষ্ট্রের সন্তানসম্ভবা নারীদের ওপর করা গবেষণাতেও তাপজনিত নানা জটিলতার প্রমাণ মিলেছে।
কোনো অঞ্চল তুলনামূলক শীতল কিংবা আর্দ্র হলেও সেখানকার নারীরা তাপপ্রবাহের ঝুঁকি থেকে পুরোপুরি নিরাপদ নন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, অতিরিক্ত গরম সন্তানসম্ভবা নারী ও তাদের গর্ভের শিশুর শরীরে ঠিক কীভাবে ক্ষতি করে, তা নিয়ে এখনো গবেষণা চলছে।
কিছু গবেষকের ধারণা, শরীরকে ঠান্ডা রাখতে অতিরিক্ত তাপমাত্রায় মায়ের শরীর প্লাসেন্টা বা গর্ভফুল থেকে রক্তপ্রবাহ সরিয়ে নিতে পারে। এতে গর্ভের শিশুর ওপর প্রভাব পড়তে পারে। আবার অতিরিক্ত গরমে শিশুর হৃদযন্ত্রের ওপর চাপ বাড়তে পারে বলেও ধারণা করছেন অনেকে।
তবে কোন প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয় এবং কী ধরনের ব্যবস্থা নিলে সন্তানসম্ভবা নারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা যাবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
বিভিন্ন দেশের স্বাস্থ্যকর্মীরা সন্তানসম্ভবা নারীদের সুরক্ষায় নানা উদ্যোগ নিচ্ছেন। দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের মায়ামি পর্যন্ত সন্তানসম্ভবা নারীদের তাপ থেকে বাঁচাতে প্রশস্ত কিনারার টুপি ব্যবহারের পরামর্শ দিচ্ছেন স্বাস্থ্যকর্মীরা।
এ ছাড়া, ভবনের ছাদ সাদা রং করা এবং শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র ব্যবহারের পরামর্শও দিচ্ছেন তারা।
তাপপ্রবাহের কারণে গর্ভাবস্থায় ঝুঁকি নিয়ে গবেষণা চালায় দক্ষিণ আফ্রিকার ইউনিভার্সিটি অব দ্য উইটওয়াটারসরান্ডের একটি দলও। এই দলে রয়েছেন চিকিৎসক দর্শনিকা লাখু। যিনি নিজেই গবেষণার সময় সন্তানসম্ভবা ছিলেন এবং তীব্র তাপপ্রবাহের মধ্যে অনেকটা সময় পার করেছেন। তার গর্ভে যমজ সন্তান ছিল।
গবেষণায় দেখা গেছে, তাপপ্রবাহ আগে থেকে থাকা স্বাস্থ্যঝুঁকিও আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
গর্ভাবস্থায় তিনটি গুরুতর জটিলতায় ভুগছিলেন লাখু। শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত সময়ের ছয় সপ্তাহ আগেই তার সন্তান জন্ম হয়। রয়টার্সকে তিনি বলেন, ‘উষ্ণ হয়ে ওঠা পৃথিবীতে কেউই নিরাপদ থাকবেন না। বিশেষ করে সন্তানসম্ভবা নারীরা।’
রয়টার্সের অনুসন্ধান বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তাপপ্রবাহের বিস্তার ও স্থায়িত্ব বাড়তে থাকায় সন্তানসম্ভবা নারী ও নবজাতকের স্বাস্থ্যঝুঁকিও নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। তবে এই ঝুঁকি মোকাবিলায় কী ধরনের সুরক্ষাব্যবস্থা সবচেয়ে কার্যকর, তা জানতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

