স্বাস্থ্য বিভাগে টিকাদান কর্মসূচিতে জনবল সংকট, ইপিআই স্বাস্থ্যকর্মীদের ৯ মাস ধরে বেতন বন্ধের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করে হাম নিয়ন্ত্রণে সরকারের উদ্যোগ জানতে চেয়েছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল-আশুগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা।
আজ বুধবার সকালে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অধিবেশনে জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এ প্রশ্ন তোলেন।
রুমিন ফারহানা বলেন, ‘গবেষণায় দেখা গেছে, একবার হাম আক্রান্ত হলে শিশুর শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বছরের পর বছর দুর্বল থাকে। যার ফলে অন্য কোনো সাধারণ রোগেও সে মারা যেতে পারে।’
এর জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘জাতিকে যদি আমরা খুব ভয় দেখিয়ে ফেলি, তাহলে কিন্তু জাতি রোগাগ্রস্ত হয়ে যায়। রোগীর পাশে ইতিবাচক কথা বলতে হবে। হাম কিন্তু আমারও ছোটবেলায় হয়েছে। নিশ্চয়ই আপনারও হয়েছে। সব শিশুর হাম হয়, আমরা কিন্তু সব মরে যাইনি। আমাদের গড় আয়ু বৃদ্ধি পেয়েছে। আমাদের শরীরে একদিক দিয়ে পুষ্টি ঘাটতি হয়, অন্যদিক দিয়ে আসে। আল্লাহ তাআলা আমাদের প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়।’
‘আমাদের যে হাম হচ্ছে, এটা বিগত দুটি সরকারের ব্যর্থতার কারণে। রিকোভারও হচ্ছে, আমরা মোকাবিলা করছি,’ যোগ করেন তিনি।
এর আগে রুমিন ফারহানা বলেন, ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, একটি জনপদে হামের মহামারি রুখতে হলে ৯৫ শতাংশের বেশি শিশুকে দুই ডোজ এমআর টিকা দিতে হয়। কিন্তু করোনা পরবর্তী সময়ে আমাদের নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে যে গ্যাপ তৈরি হয়েছে, তার সুযোগ নিচ্ছে এই ভাইরাস।’
‘এর মধ্যে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব পালন করেছে দেড় বছর এবং এই দেড় বছরে কর্মকর্তাদের মধ্যে পরিবর্তন এসেছে, নতুন করে টিকার কোনো অর্ডার দেওয়া হয়নি। আমাদের যারা স্বাস্থ্যকর্মী আছেন, যারা টিকা পরিবহন করেন, গত ৯ মাস ধরে তারা কোনো বেতন পাননি। আমাদের প্রায় ৩৫টি জেলাতে ৪৫ শতাংশ স্বাস্থ্যকর্মী বা টিকাদান কর্মসূচিতে যুক্ত—এমন জনবলের অভাব আছে। প্রায় অর্ধেক জেলায় এ সংক্রান্ত স্বাস্থ্যকর্মীর অভাব আছে। সব কিছু মিলিয়ে আজকে হামের এই ভয়াবহতা,’ যোগ করেন তিনি।
এই সংসদ সদস্য আরও বলেন, ‘সম্প্রতি ইউনিসেফ ও ডব্লিউএইচও সতর্ক করেছে বিশ্বজুড়ে হামের সংক্রমণ ৭৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশেও তার ঢেউ এসেছে। বিশেষ করে ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী এলাকা এবং ঘনবসতিপূর্ণ শহরের বস্তিগুলোতে, যেখানে একটি ঘরে অনেক বেশি সংখ্যক লোক থাকে এবং একটি ঘরের সঙ্গে আরেকটি ঘরের দূরত্ব নেই। সেই জায়গাগুলো এখন হামের হটস্পটে পরিণত হয়েছে।’
এ সময় রুমিন ফারহানা মাঠ পর্যায়ের চিত্র, টিকার মজুত ও বিতরণের পরিসংখ্যান সম্পর্কে জানতে চান।
জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘৯ মাস আগে থেকে পোর্টাররা বেতন পান না, এটা সত্যি। আমরা ক্ষমতায় এসেছি আজকে ৫১ দিন চলছে। ৫ এপ্রিল টিকাদান কর্মসূচি শুরুর আগে আমরা ইপিআই স্বাস্থ্যকর্মীদের সঙ্গে বসেছি। আমরা তাদের সন্তুষ্ট করেছি, আজকে সকালে সচিবালয়ে বৈঠক করেছি। দুএকদিনের মধ্যে বেতন দেওয়া শুরু করব।’
অ্যাসিস্ট্যান্ট হেলথ অফিসার, ওয়ার্কার, সহকারী কর্মকর্তা ও ইনস্পেকটর (হেলথ) এবং পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের আর্থিক সুবিধা ছাড়াই গ্রেড উন্নীত করার দাবি বিবেচনা করা হচ্ছে বলে জানান সাখাওয়াত।
টিকাদান কর্মসূচির জন্য মাঠ পর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মীর অভাব নেই জানিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘সার্বিকভাবে স্বাস্থ্য খাতে লোকবল সংকট আছে। প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনায় আমরা বিভিন্ন পদে ১ লাখ নিয়োগ দিতে যাচ্ছি।’
ভ্যাকসিনের মজুত এখন স্থিতিশীল আছে জানিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী কোল্ড চেইন বজায় রেখে ইপিআই টিকা সংরক্ষণ ও পরিবহন করছে।’
সিঙ্গেল ডোজ ভায়েলের পরিবর্তে মাল্টি ডোজ ভায়েল ব্যবহারের কথা জানান তিনি। বলেন, ‘যাতে সংরক্ষণ আমাদের জন্য সহজ হয়। একটি ভায়েল থেকে ১০টি ডোজ দেওয়া হবে।’
ইউনিসেফের মাধ্যমে ৪১৯ কোটি টাকার ভ্যাকসিন কেনার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে জানিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘সরকার ইতোমধ্যে ২০০ কোটি টাকার ভ্যাকসিন কিনেছে। এছাড়া মাঠ পর্যায়ে ৩৪ লাখ ৮৩ হাজার ডোজ টিকা দেওয়া হয়েছে। গ্যাভির মাধ্যমে সরকার ২ কোটি ১৯ লাখ ডোজ টিকা পেয়েছে।’
‘টিকার কোনো ঘাটতি ইনশাআল্লাহ আমাদের হবে না,’ বলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
সম্পূরক প্রশ্নে রুমিন ফারহানা বলেন, ‘আমাদের স্বাস্থ্যমন্ত্রী বললেন, রোগীকে ভয় দেখাতে হয় না, সাহস দিতে হয়। আমি তো জানতাম ৩০০ জন সংসদ সদস্যের সামনে কথা বলছি, ৩০০ জন হামের রোগীর সামনে তো আমি কথা বলছি না। সংসদে আমি যদি স্বাস্থ্যের প্রশ্নে কথা বলতে না পারি, সংসদ সদস্যরা যদি ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে রোগাক্রান্ত হয়ে যান, তাহলে আর এই সংসদ চালাবো কেমন করে!’
গণমাধ্যমে প্রকাশিত পরিসংখ্যান তুলে ধরে হামের উপসর্গ রয়েছে এমন শিশুর সংখ্যা বেড়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘শুধু হাম নয়, ১০ রোগের টিকার সংকট দেখা দিয়েছে দেশে। ইপিআইয়ের কেন্দ্রীয় গুদামে বিসিজি, পেন্টা, বিওপিভি, পিসিভি, এমআর ও টিডি—এই ছয়টি টিকার মজুত শূন্য। আইপিভি ও টিসিভি টিকার যে মজুত আছে সেটা চলবে জুন পর্যন্ত।’
এর পরে কী হবে জানতে চান রুমিন ফারহানা। জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘একটা পত্রিকায় উঠলেই…আমি আপনাকে দোষ দিচ্ছি না। একটু ক্রস চেক করবেন।’
সাখাওয়াত বলেন, ‘আমি কিন্তু আপনাকে সংসদে বলতে নিষেধ করিনি!’
‘আশঙ্কা থাকবে, কিন্তু মানুষকে আশঙ্কায় ভুগতে আমরা দেবো না। এটাই সংসদ সদস্যদের দায়িত্ব,’ যোগ করেন তিনি।
স্পিকার টিকার ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের টিকার মজুত আমরা শূন্য থেকে শুরু করেছি, এটা খুবই সত্যি। তবে ইতোমধ্যে আমরা সমৃদ্ধ হয়েছি। আমাদের হাতে আছে, আমাদের (সাপ্লাই) চেইনে আছে। আমাদের টাকা আছে, ইতোমধ্যে আমরা ৬০৪ টাকা কেবিনেট মিটিং থেকে পাস করে দিয়েছি।’
টেন্ডারে টিকা কিনতে বিলম্ব ও দুর্নীতি এড়াতে ইউনিসেফ থেকে টিকা কেনা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

