জামায়াতের ৮ লাখ ৩৯ হাজার কোটি টাকার ‘ছায়া বাজেট’

আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটকে সামনে রেখে ৮ লাখ ৩৯ হাজার ৫০৫ কোটি টাকার ‘ছায়া বাজেট’ দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী।

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব, করমুক্ত আয়সীমা ৫ লাখ টাকা নির্ধারণ, জাতীয় পরিচয়পত্রকে (এনআইডি) কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিন) হিসেবে ব্যবহার, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ভাতা বৃদ্ধির প্রস্তাব রাখা হয়েছে এ বাজেটে।

আজ মঙ্গলবার রাজধানীর মগবাজারে আল ফালাহ মিলনায়তনে আয়োজিত ‘জনমুখী বাজেট ২০২৬-২০২৭ প্রস্তাবনা’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে দলটির পক্ষে ছায়া বাজেট উপস্থাপন করেন ঢাকা-১২ আসনের সংসদ সদস্য ও জামায়াত নেতা সাইফুল আলম খান মিলন।

প্রস্তাবিত বাজেটের মোট আকার ধরা হয়েছে ৮ লাখ ৩৯ হাজার ৫০৫ কোটি টাকা। এর বিপরীতে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৬৫ হাজার ৯২৬ কোটি টাকা। সামগ্রিক বাজেট ঘাটতি ধরা হয়েছে ১ লাখ ৬৮ হাজার ৩২৯ কোটি টাকা, যা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ২ দশমিক ৪৩ শতাংশ।

সাইফুল আলম বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটের মূল দর্শন হলো—সাম্য, ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদাভিত্তিক একটি কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। বিগত বছরগুলোতে অর্থনীতিতে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের কারণে দেশের আর্থিক ভিত্তি দুর্বল হয়েছে। পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনা বাজেট ঘাটতি মোকাবিলার অন্যতম উপায় হতে পারে।

করব্যবস্থার সংস্কারের অংশ হিসেবে আলাদা টিন নম্বরের পরিবর্তে জাতীয় পরিচয়পত্রকে কর শনাক্তকরণ নম্বর হিসেবে ব্যবহারের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে করজাল সম্প্রসারণে ‘স্মার্ট সোশ্যাল সিকিউরিটি নম্বর’ চালুর কথাও বলা হয়েছে।

ছায়া বাজেটে ব্যক্তিশ্রেণির করমুক্ত আয়সীমা সাড়ে ৪ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫ লাখ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া কোনো করদাতার নিজের অথবা তার পরিবারের সদস্য কিংবা পোষ্যের শিক্ষা ব্যয়ের ওপর কর রেয়াতের প্রস্তাবও করা হয়েছে।

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় বয়স্ক, বিধবা ও প্রতিবন্ধী ভাতা এবং মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচির ভাতা বর্তমানে ৬৫০ থেকে ৯০০ টাকার পরিবর্তে প্রাথমিকভাবে ১ হাজার টাকা এবং পর্যায়ক্রমে ৩ হাজার টাকায় উন্নীত করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

এ ছাড়া দেশের সব মসজিদের ইমামদের মাসিক ৭ হাজার ৫০০ টাকা, মুয়াজ্জিনদের ৫ হাজার টাকা এবং খাদেমদের ৩ হাজার টাকা করে সম্মানী ভাতা দেওয়ার প্রস্তাব করেছে দলটি।

সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নেরও সুপারিশ করা হয়েছে।

প্রস্তাব অনুযায়ী, ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য ১০০ শতাংশ এবং প্রথম থেকে নবম গ্রেডের কর্মকর্তাদের জন্য ৮০ শতাংশ বেতন পর্যায়ক্রমে সমন্বয় করা হবে।

খাত ভিত্তিক বরাদ্দে জনপ্রশাসন খাত সর্বোচ্চ গুরুত্ব পেয়েছে।

এ খাতে ২ লাখ ২ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা বা মোট বাজেটের ২৪ দশমিক ০৯ শতাংশ বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে ১ লাখ ২৫ হাজার ৫৭৫ কোটি টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে, যা মোট বাজেটের প্রায় ১৫ শতাংশ।

এ ছাড়া ঋণের সুদ পরিশোধে ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, পরিবহন ও যোগাযোগ খাতে ৬৫ হাজার ৩৪০ কোটি টাকা, কৃষি খাতে ৫১ হাজার ৬৭০ কোটি টাকা, সামাজিক নিরাপত্তা ও কল্যাণ খাতে ৪৮ হাজার ১৫০ কোটি টাকা, স্বাস্থ্য খাতে ৪৫ হাজার ২৪০ কোটি টাকা এবং স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন খাতে ৪৫ হাজার ২২০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান বলেন, শুধু বাজেট প্রণয়ন নয়, এর সফল বাস্তবায়নের জন্য সততা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। এসব অনুপস্থিত থাকলে কোনো বাজেটই কার্যকর হবে না।

তিনি অভিযোগ করেন, অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বাড়ছে এবং এতে দেশের আর্থিক ব্যবস্থাপনা ঝুঁকির মুখে পড়ছে।

কর আদায়ের বর্তমান পদ্ধতিকেও ত্রুটিপূর্ণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ব্যবসায়ীদের জন্য স্বচ্ছ ও হয়রানিমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে রাজস্ব আদায় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।

শফিকুর রহমান বলেন, বর্তমানে দেশের অর্থবছর জুলাই থেকে জুন পর্যন্ত হওয়ায় বর্ষা মৌসুমের মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বড় অংশ বাস্তবায়নের তাড়াহুড়া দেখা যায়। এতে প্রকল্প বাস্তবায়নের চেয়ে অপচয় ও দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হয়। এ কারণে অর্থবছরকে ক্যালেন্ডার বছরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার প্রস্তাব সংসদে উত্থাপন করা হবে।

তিনি বলেন, ‘আমাদের ফিসকাল ইয়ার জুলাই থেকে জুন। জুন মাসে বর্ষা, খরা, ঘূর্ণিঝড়সহ বিভিন্ন দুর্যোগের কারণে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ব্যাহত হয়। কিন্তু তখনই এডিপির বড় অংশ দ্রুত বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হয়। এর সুফল জনগণ পায় না, বরং অসাধু সুবিধাভোগীরা লাভবান হয়।’

জামায়াত আমির আরও বলেন, সম্পূরক বাজেটও বছর শেষ হওয়ার অন্তত তিন মাস আগে সংসদে উপস্থাপন করা উচিত, যাতে ব্যয়ের ওপর কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করা যায়। বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে সম্পূরক বাজেট অর্থবছরের একেবারে শেষ দিকে উপস্থাপিত হয়, যখন ব্যয়ের বড় অংশ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়ে যায়। এতে সংসদীয় তদারকি ও জবাবদিহি কার্যকর থাকে না।

 

Related Articles

Latest Posts