সাম্প্রতিক ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর প্রচলিত ত্রাণ বা মানবিক সহায়তার বদলে চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের কাছে জলবায়ু ক্ষতিপূরণ দাবি করছে নেপাল।
দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনে নেপালের দায় খুবই সামান্য হলেও এর ভয়াবহ প্রভাব সবচেয়ে বেশি ভোগ করতে হচ্ছে দেশটিকে। তাই এটি দয়া বা দানের বিষয় নয়, বরং ন্যায়বিচার ও ক্ষতিপূরণের দাবি।
নেপালের সংবাদমাধ্যম কাঠমান্ডু পোস্টকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে খানাল বলেন, বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে নেপালের অবদান প্রায় নগণ্য। অথচ জলবায়ু সংকটের কারণে হিমালয়ের হিমবাহ গলে যাওয়া, পাহাড়ি এলাকায় আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের মতো বিপর্যয় বাড়ছে। এর সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হচ্ছে নেপালের মতো ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোকে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষ্য, এই বাস্তবতায় নেপাল তার কূটনৈতিক অবস্থানেও পরিবর্তন আনছে। আগে যেখানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে ত্রাণ ও সহায়তা চাওয়া হতো, এখন সেখানে জলবায়ু ন্যায়বিচার ও ক্ষতিপূরণের দাবি সামনে আনা হবে।
খানাল বলেন, নেপাল আর দাতব্য সাহায্যের জন্য হাত পাততে চায় না। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ পাওয়া দেশটির আইনি ও নৈতিক অধিকার।
নেপালের অর্থ মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের কাছে জলবায়ু ক্ষতিপূরণের আনুষ্ঠানিক দাবি জানিয়ে চিঠি পাঠিয়েছে বলে জানান তিনি। আগামী দিনগুলোতে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামেও এই দাবি জোরালোভাবে তুলে ধরবে কাঠমান্ডু।
এই দাবির পেছনে সাম্প্রতিক দুর্যোগের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি বড় ভূমিকা রাখছে। নুয়াকোট, রসুয়া ও ধাদিংসহ হিমালয়ের পাদদেশের বিভিন্ন এলাকায় ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে বিস্তীর্ণ এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
কাঠমান্ডু পোস্টকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে খানাল এই দুর্যোগকে ‘হিমালয় সুনামি’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
তিনি বলেন, এটি প্রচলিত অর্থে কোনো সাধারণ বন্যা ছিল না। বিশাল ঢেউয়ের মতো পানির স্রোত এবং ভয়াবহ গতিতে ধেয়ে আসা জলরাশি পাহাড়ি জনপদ ও অবকাঠামোয় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে।
নুয়াকোট, রসুয়া ও ধাদিংয়ের ১০টি পৌরসভার অন্তত ৩০ থেকে ৩২টি ওয়ার্ড ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নিম্নাঞ্চলের গোর্খা ও চিতওয়ান জেলাতেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। হাজার হাজার ঘরবাড়ির পাশাপাশি বেশ কয়েকটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন কোনো দুর্যোগ নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে হিমালয়ের পরিবেশ দ্রুত বদলে যাচ্ছে এবং এর প্রভাব কেবল নেপালের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না।
খানাল সতর্ক করে বলেন, হিমালয়ের হিমবাহগুলো দ্রুত গলে গেলে পুরো দক্ষিণ এশিয়ায় এর প্রভাব পড়বে। গঙ্গা ও ত্রিশূলীর মতো নদীগুলোর পানিপ্রবাহের ওপর নির্ভরশীল বিপুল জনগোষ্ঠীর পানি নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়তে পারে।
তিনি আরও বলেন, নেপাল যে ক্ষতিপূরণের দাবি তুলছে, তা শুধু একটি দেশের স্বার্থের বিষয় নয়। এর সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার দীর্ঘমেয়াদি পানি, পরিবেশ ও মানুষের নিরাপত্তার বিষয়ও জড়িত।
কাঠমান্ডু পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, দুর্যোগের পর দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় মাটির নিচে চাপা পড়া জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর সুড়ঙ্গেও উদ্ধার অভিযান চলছে। ত্রিশূলী ৩এ, চিলিম ও আপার ত্রিশূলী জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের সুড়ঙ্গে আটকা পড়াদের উদ্ধারে বিভিন্ন দেশের বিশেষায়িত দল কাজ করছে।
ভারতের বিশেষায়িত টানেল উদ্ধারকারী দল চিলিম ও লাংতাং এলাকায় কাজ করছে। চীনের একটি উদ্ধারকারী দল রয়েছে ত্রিশূলী ৩এ প্রকল্প এলাকায়। আর দক্ষিণ কোরিয়ার একটি দল আপার ত্রিশূলী প্রকল্পে উদ্ধার তৎপরতায় যুক্ত হয়েছে।
দুর্গম পাহাড়ি এলাকা, ভূমিধস ও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে উদ্ধার অভিযান অত্যন্ত জটিল হয়ে উঠেছে। এরপরও শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত উদ্ধারকাজ চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন নেপালের কর্মকর্তারা।
একইসঙ্গে দুর্যোগের পর ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রমও চালিয়ে যাচ্ছে নেপালের সরকার। প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে ইতোমধ্যে ৫ বিলিয়নের বেশি রুপি জমা হয়েছে বলে জানিয়েছে সরকার। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে সহায়তা ও দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনে এই অর্থ ব্যয় করা হবে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসব তাৎক্ষণিক সহায়তার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে চায় নেপাল।
এদিকে বার্তাসংস্থা এএফপির তথ্য অনুযায়ী, নেপাল ও তিব্বতে বন্যা-ভূমিধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে এক হাজার ৬৬ জনে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে নেপালে এক হাজার ৫০ জন এবং তিব্বতে ১৬ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন অন্তত চার হাজার ৪৬২ জনের বেশি।

