চামড়া শিল্পনগরীর বর্জ্য শোধনাগারের ত্রুটি সংশোধন করা হবে: বাণিজ্যমন্ত্রী

সাভারের চামড়া শিল্পনগরীর কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগারের (সিইটিপি) ত্রুটিগুলো সংশোধন করা হবে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।

আজ শনিবার দুপুরে সাভারে চামড়া শিল্পনগরীর সিইটিপি পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ কথা জানান। এর আগে তিনি ট্যানারি মালিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা করেন।

বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, নির্মাণকারী চীনা প্রতিষ্ঠান সিইটিপির সক্ষমতা ২৫ হাজার কিউবিক মিটার বলে দাবি করলেও যাচাই-বাছাইয়ে এর প্রকৃত সক্ষমতা ১৪ থেকে ১৮ হাজার কিউবিক মিটার পাওয়া গেছে। অর্থাৎ নির্মাণ ও যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে ঘোষিত পরিমাণ বর্জ্য পরিশোধন করতে পারছে না সিইটিপি। এ ছাড়া প্রয়োজনের তুলনায় কম সক্ষমতা রেখে কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগারটি নির্মাণ করা হয়েছে। ফলে সিইটিপি থেকে নির্গত তরল বর্জ্যে পার্শ্ববর্তী ধলেশ্বরী নদী দূষিত হচ্ছে। এ দূষণ রোধে সিইটিপির ত্রুটিগুলো সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। 

আব্দুল মুক্তাদির বলেন, চামড়া খাত অত্যন্ত সম্ভাবনাময় একটি খাত ছিল ও এখনো আছে। কিন্তু হাজারীবাগ থেকে যে উপায়ে এই শিল্প এখানে স্থানান্তরিত হয়েছে এবং এই শিল্পের প্রতি যেভাবে অবহেলা করা হয়েছে বা সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটার মধ্যে যে অব্যবস্থাপনা ছিল, সে কারণেই চামড়া শিল্প কাঙ্ক্ষিত পথে এগোয়নি। বরং বিগত বছরগুলোতে এই খাতের সম্ভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে যে পরিমাণ চামড়া আহরিত হয়, তার পুরোটা যদি রপ্তানি খাতে কাজে লাগানো যেত, তাহলে এটি অন্তত ১২ বিলিয়ন ডলারের একটি রপ্তানি খাতে পরিণত হতো। যে চামড়া এখন আমরা কাজে লাগাই, তা মাত্র শূন্য দশমিক ২৬ শতাংশ। অর্থাৎ ১ শতাংশেরও এক-চতুর্থাংশের মতো। অথচ এর তুলনায় প্রায় ১২ থেকে ১৪ গুণ বেশি চামড়া আহরণ ও রপ্তানিতে ব্যবহার করার সুযোগ রয়েছে।

আব্দুল মুক্তাদির আরও বলেন, এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য ভবিষ্যতে যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হবে, সেগুলো হলো—সিইটিপিতে এখন যে পরিমাণ বর্জ্য পরিশোধন করা হয়, তা ১৪ থেকে ১৮ হাজার সিবিএম পর্যন্ত, প্রিট্রিটমেন্টের সক্ষমতা অনুযায়ী। কিন্তু কোরবানির ঈদের পর পিক টাইমে প্রায় ৪৫ হাজার সিবিএম বর্জ্য পরিশোধনের প্রয়োজন পড়ে। এ কারণে পরিকল্পনা করা হচ্ছে, সক্ষম ট্যানারিগুলো নিজেদের উদ্যোগে ইটিপি স্থাপন করবে, প্রয়োজনে সরকারও সহায়তা দেবে।

তিনি আরও বলেন, ছোট ট্যানারিগুলো সিইটিপির আওতায় থাকবে। তাদের নিজস্ব সেডিমেন্টেশন ট্যাংকের মাধ্যমে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক প্রক্রিয়ার পর বর্জ্য সিইটিপিতে পাঠানো হবে। এতে করে এসব ট্যানারিকে অন্তর্ভুক্ত করে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যের কাছাকাছি পৌঁছানো সম্ভব হবে। এ ছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহায়তায় সিইটিপির সক্ষমতা ও কার্যকারিতা বাড়ানোর একটি স্টাডি চলছে, যা একটি ইতালিয়ান কোম্পানি পরিচালনা করছে। এর প্রতিবেদন আমরা ২-১ সপ্তাহের মধ্যে পেয়ে যাব।

মন্ত্রী বলেন, সিইটিপির প্রয়োজনীয় সংস্কার করা হবে। সক্ষম ট্যানারিগুলোর অধীনে নতুন ইটিপি স্থাপনেও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। পাশাপাশি পুরো সেক্টরের উন্নয়নে সাভারে একটি বিশ্বমানের সেন্টার গড়ে তোলা হচ্ছে। সেখানে ইঞ্জিনিয়ারিং, ডিজাইন, থ্রিডি ডিজাইনিং ও স্কিল ডেভেলপমেন্টে আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে এই খাতে ধারাবাহিক অগ্রগতি নিশ্চিত হবে।

কোরবানির ঈদের মৌসুমে বিপুল পরিমাণ চামড়া এখানে পরিশোধন করা হলে পরিবেশ দূষণের আশঙ্কা রয়েছে, এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সিইটিপির বর্তমান সক্ষমতায় ঈদের সময়ের পুরো বর্জ্য পরিশোধন সম্ভব নয়। এ কারণে বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে ঈদের সময়ে যেন সব চামড়া এখানে না আসে, সে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, মফস্বল জেলা ও মহানগরের এতিমখানা ও মাদ্রাসাগুলোতে সরকার বিনামূল্যে লবণ সরবরাহ করছে। প্রতিটি গরুর চামড়ায় ৮ থেকে ১০ কেজি এবং ছাগলের চামড়ায় ৩ থেকে ৪ কেজি লবণ ব্যবহার করতে হয়। চামড়া সংরক্ষণে কীভাবে লবণ মাখাতে হবে, কীভাবে চর্বি ও রক্ত পরিষ্কার করতে হবে—এসব বিষয়ে লিফলেট ছাপানো হয়েছে প্রায় ৮ লাখ কপি। পাশাপাশি জেলা ও উপজেলা প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে সংশ্লিষ্টদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে। এছাড়া রেডিও-টেলিভিশনে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হবে ও আগামী ২ জুমার খুতবায় ইমামরা বিষয়টি নিয়ে মুসল্লিদের সচেতন করবেন।

তিনি আরও বলেন, চামড়া জাতীয় সম্পদ, এটি সংরক্ষণ করা সবার দায়িত্ব। সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সিইটিপির বর্তমান সক্ষমতার মধ্যেও প্রতিটি চামড়া যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে।

Related Articles

Latest Posts