চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ: আতঙ্কের নাম ব্রাহ্মণবাড়িয়ার রেলপথ

রাত তখন দেড়টার কিছু বেশি। চট্টগ্রামগামী তূর্ণা এক্সপ্রেস ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ উপজেলার তালশহর রেলস্টেশন অতিক্রম করছে। জানালার পাশের আসনে বসে ছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের কান্দিপাড়ার বাসিন্দা আয়কর আইনজীবী শ্যামল চন্দ্র দাস। হঠাৎ বাইরে থেকে ছুড়ে মারা একটি পাথর জানালার কাচ ভেঙে তার ডান চোখে এসে আঘাত করে।

গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে প্রথমে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকার জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে পাঠানো হয়। দীর্ঘ অস্ত্রোপচারের পরও চিকিৎসকেরা তার চোখটি রক্ষা করতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত সেটি অপসারণ করতে হয়।

ঘটনাটি গত ২৩ জুনের। এর ২৪ ঘণ্টা না পেরোতেই ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলস্টেশনের কাছে মহানগর এক্সপ্রেসে ভ্রমণরত নাইমুল হাসান বাইরে থেকে ছোড়া পাথরের আঘাতে মাথায় গুরুতর আহত হন। তার মাথায় পাঁচটি সেলাই দিতে হয়। কয়েক দিনের ব্যবধানে জেলার কলেজপাড়া এলাকায় পারাবত এক্সপ্রেসে ভ্রমণের সময় একইভাবে আহত হন আরেক যাত্রী মোহাম্মদ আজাদ।

মাত্র ছয় দিনের ব্যবধানে চলন্ত ট্রেনে তিন যাত্রীর ওপর হামলার ঘটনায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—চলন্ত ট্রেনে ঢিল ছুড়ছে কারা?

পূর্বাঞ্চলীয় রেলপথে শত শত হামলা

বাংলাদেশ রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের পুরো বছর এবং ২০২৬ সালের প্রথম পাঁচ মাসে পূর্বাঞ্চলীয় রেলপথে চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ২২৪টি ঘটনা ঘটেছে। রেলওয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, এসব ঘটনার মধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়া অংশ বর্তমানে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ রেলপথগুলোর একটি।

তবে সমস্যা শুধু ব্রাহ্মণবাড়িয়াতেই সীমাবদ্ধ নয়। টঙ্গী, নরসিংদী, ভৈরব, আশুগঞ্জ, আখাউড়া, কসবা ও কুমিল্লার বিভিন্ন এলাকাতেও একই ধরনের ঘটনার অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ধারাবাহিক হামলা এবং একজন আইনজীবীর চোখ হারানোর ঘটনায় বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ নিয়ে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয়ভাবে অপরাধীদের দ্রুত শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিও উঠেছে।

দুই দশকেও বদলায়নি চিত্র 

চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা নতুন নয়। দুই দশকেরও বেশি আগে আখাউড়ার রাধানগর এলাকার সঞ্জীত শীল ধর্মীয় অনুষ্ঠানে যোগ দিতে ট্রেনে সিলেট যাওয়ার পথে বাইরে থেকে ছোড়া পাথরের আঘাতে একটি চোখ হারান।

আখাউড়া শ্রীশ্রী লোকনাথ সেবাশ্রম শান্তিবন মহাশ্মশান কমিটির সাধারণ সম্পাদক আশীষ ব্রহ্মচারী বলেন, সঞ্জীতকে ওই সফরে আমিই পাঠিয়েছিলাম। ঘটনাটি মনে হলে আজও নিজেকে অপরাধী মনে হয়।

নিয়মিত যাত্রীরা বলছেন, সময়ের সঙ্গে ট্রেনের গতি ও যাত্রীর সংখ্যা বেড়েছে, রেলপথের অবকাঠামোরও উন্নয়ন হয়েছে। কিন্তু চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের প্রবণতা কমেনি; বরং সাম্প্রতিক সময়ে এটি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে।

যাত্রীদের সঙ্গী এখন ‘আতঙ্ক’

গত শনিবার ঢাকা থেকে চট্টগ্রামগামী চট্টলা এক্সপ্রেসে ভ্রমণের সময় আখাউড়ার বাসিন্দা মাহমুদা আক্তারকে বারবার তার ছোট সন্তানকে জানালার পাশ থেকে সরিয়ে নিতে দেখা যায়।

তিনি বলেন, এখন ট্রেনে উঠলেই ভয় লাগে। দুই দিন পরপরই শুনি কোথাও না কোথাও ট্রেনে ঢিল মারা হচ্ছে।

একই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন আরও অনেক যাত্রী। তাদের অনেকে এখন ইচ্ছা করেই জানালার পাশের আসন এড়িয়ে চলেন। অনেক অভিভাবক পুরো যাত্রাপথে সন্তানদের জানালার কাছে যেতে দেন না।

একসময় দেশের সবচেয়ে নিরাপদ ও আরামদায়ক পরিবহন হিসেবে পরিচিত রেলযাত্রা এখন অনেকের কাছেই উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পূর্বাঞ্চলীয় রেলপথের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ অংশ

ঢাকা-সিলেট রুটের আশুগঞ্জ-বিজয়নগর এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের আশুগঞ্জ-কসবা অংশ মিলিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার প্রায় ৭২ কিলোমিটার রেলপথ এখন পূর্বাঞ্চলীয় রেল নেটওয়ার্কের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ অংশ হিসেবে পরিচিত।

আতঙ্ক শুধু যাত্রীদের নয়; ট্রেনচালক, গার্ড ও রেলওয়ে কর্মীদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছে।

গত বছরের আগস্টে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের কলেজপাড়া এলাকায় মহানগর গোধূলী এক্সপ্রেসে পাথর নিক্ষেপে আহত হন লোকোমাস্টার আব্দুল্লাহ আল বাকি।

চট্টগ্রাম-ময়মনসিংহ রুটে চলাচলকারী বিজয় এক্সপ্রেসের লোকোমাস্টার আবুল কালাম আজাদ বলেন, সূর্য ডুবে যাওয়ার পর ভয়টা আরও বেশি কাজ করে। অনেক সময় নির্দিষ্ট কিছু এলাকা অতিক্রম করার সময় দরজা-জানালা বন্ধ রেখেই ট্রেন চালাতে হয়।

কারা জড়িত?

বছরের পর বছর একই ধরনের ঘটনা ঘটলেও খুব কম ক্ষেত্রেই প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করা গেছে। ফলে কারা এর পেছনে রয়েছে, তা নিয়ে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

রেলভিত্তিক ফেসবুক প্ল্যাটফর্ম ‘দ্য ট্রেন’-এর অ্যাডমিন সোহেল রানা ভূঁইয়া বলেন, এসব ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন দুষ্টুমি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। 

তার মতে, এর পেছনে কোনো সংঘবদ্ধ চক্র রয়েছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা উচিত। একই সঙ্গে রেলপথসংলগ্ন এলাকার স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও জনগণকে সম্পৃক্ত করে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ারও পরামর্শ দেন তিনি।

সচেতন মহলের কেউ কেউ মনে করছেন, যাত্রীদের মধ্যে ভীতি তৈরি করে রেলপথ থেকে সড়কপথে যাত্রী সরিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে কোনো অসাধু স্বার্থসংশ্লিষ্ট গোষ্ঠী জড়িত কি না, সেটিও তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।

তবে এখন পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এ ধরনের অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ পাওয়ার কথা জানায়নি। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর পেছনেও কোনো সংঘবদ্ধ চক্রকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।

ক্ষোভ ও প্রতিবাদ চলছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়

শ্যামল চন্দ্র দাসের চোখ হারানোর ঘটনার পর ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মানববন্ধন করে জেলা আয়কর আইনজীবী সমিতি। কর্মসূচি থেকে দ্রুত অপরাধীদের গ্রেপ্তার এবং রেলপথে নিরাপত্তা জোরদারের দাবি জানানো হয়।

পরে স্থানীয় সামাজিক সংগঠন ‘ঐক্যবদ্ধ সদর ব্রাহ্মণবাড়িয়া’ রেলস্টেশন প্রাঙ্গণে জনসচেতনতামূলক আলোচনা সভার আয়োজন করে।

বক্তারা বলেন, চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ কোনো দুষ্টুমি নয়; এটি প্রাণঘাতী অপরাধ, যা স্থায়ী পঙ্গুত্ব এমনকি মৃত্যুর কারণও হতে পারে।

তাদের মতে, শুধু পুলিশের পক্ষে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং সামাজিক সংগঠনগুলোকেও একযোগে কাজ করতে হবে।

পুলিশের আশ্বাস

রেলওয়ে পুলিশ বলছে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মো. শাহ আলম বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং জড়িতদের শনাক্তে তদন্ত চলছে।

আখাউড়া রেলওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুল কুদ্দুস বলেন, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো নিয়ে তিনটি মামলা হয়েছে। তার ভাষায়, শুধু পুলিশি ব্যবস্থা দিয়ে এ সমস্যা দূর করা সম্ভব নয়। স্থানীয় বাসিন্দা, অভিভাবক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সমাজের সবাইকে একসঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে।

আখাউড়া রেলওয়ে সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মো. ফয়সাল তানভীর বলেন, চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ মানুষের জীবন ও সরকারি সম্পত্তি—উভয়ের জন্যই হুমকি এবং এটি একটি ফৌজদারি অপরাধ।

তিনি বলেন, বেশির ভাগ মামলাই অজ্ঞাতনামা আসামির বিরুদ্ধে হয়। ফলে অপরাধীদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। তবে শুধু গ্রেপ্তার করলেই এ অপরাধ বন্ধ হবে না। এটি মূলত একটি সামাজিক সমস্যা। জনসচেতনতা ও সমাজের সবার সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া এর স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

 

 

 

Related Articles

Latest Posts