গ্যাস সংকটে বাড়ছে সারের আমদানি নির্ভরতা, রাষ্ট্রায়ত্ত ৭ কারখানার পাঁচটিই বন্ধ

বারবার গ্যাস সংকট, পুরোনো কারখানা ও বৈশ্বিক কাঁচামাল সরবরাহে বিঘ্নের কারণে দেশে রাসায়নিক সারের উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ফলে সারের বার্ষিক চাহিদা মেটাতে আমদানি নির্ভরতা ক্রমেই বাড়ছে।

রাষ্ট্রায়ত্ত ৭টি সার কারখানার সম্মিলিত বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা ৩৭ লাখ টনের বেশি। তবে উৎপাদন করতে পারে দুই-তৃতীয়াংশের কম।

বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সারের চাহিদা ছিল ৬৬ লাখ টন। এর বিপরীতে এসব কারখানায় উৎপাদন হয়েছে মাত্র ১১ লাখ ৬ হাজার টন। ফলে সারের মোট চাহিদার ৮৩ শতাংশের বেশি আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হয়েছে।

এর আগের অর্থবছরে ৬৭ লাখ ৪৭ হাজার টন চাহিদার বিপরীতে দেশে উৎপাদন হয়েছিল ১২ লাখ ৪৪ হাজার টন সার।

উৎপাদন ও চাহিদার এই ক্রমবর্ধমান ব্যবধান বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। পাশাপাশি দেশের কৃষি খাতকে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার বিঘ্ন ও মূল্য অস্থিরতার ঝুঁকির মুখে ফেলছে।

রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানাগুলোর বাইরে বহুজাতিক যৌথ উদ্যোগ কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানী লিমিটেড (কাফকো) প্রতিবছর বিসিআইসিকে প্রায় ৫ থেকে ৬ লাখ টন ইউরিয়া সরবরাহ করে। তবে এ বছর পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় তাদের উৎপাদনও ব্যাহত হয়েছে।

ইউরিয়া, ডাই-অ্যামোনিয়াম ফসফেট (ডিএপি), ট্রিপল সুপার ফসফেট (টিএসপি) ও মিউরেট অব পটাশের (এমওপি) বাকি চাহিদা আমদানির মাধ্যমে পূরণ করা হয়।

বিসিআইসির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৩৮ লাখ ৬৭ হাজার টন সার আমদানি করা হয়েছিল। ২০২১-২২ অর্থবছরে আমদানি বেড়ে প্রায় ৪৭ লাখ ৮০ হাজার টনে পৌঁছে।

২০২২-২৩ অর্থবছরে আমদানি সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়—৪৮ লাখ টনেরও বেশি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৪৭ লাখ ৭৭ হাজার টন ও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৪৪ লাখ ৭৮ হাজার টন সার আমদানি হয়েছে।

বর্তমানে রাষ্ট্রায়ত্ত ৭টি সার কারখানার মধ্যে মাত্র দুটি চালু রয়েছে। গ্যাস ও অন্যান্য কাঁচামালের সংকটে বাকি ৫টি কারখানা গত ৪ মার্চ থেকে ২৮ জুনের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে উৎপাদন বন্ধ করে দেয়। এখনো সেগুলো চালু হয়নি।

বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক নির্বাহী সচিব রিয়াজ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা ও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অনিশ্চয়তার মধ্যে দেশের ক্রমবর্ধমান আমদানি নির্ভরতা আরও বেশি উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে।

তিনি বলেন, ‘দেশীয় ইউরিয়া উৎপাদন নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহের ওপর নির্ভর করে। গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে ইউরিয়া কারখানাগুলো বন্ধই থাকবে এবং আরও বড় ঘাটতি তৈরি হবে। ইউরিয়া ও নন-ইউরিয়া সার—উভয় ধরনের সার বিবেচনায় বাংলাদেশ একটি কঠিন সময়ের দিকে এগোতে পারে।’

বিসিআইসি ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলেছেন, পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় দেশে সারের উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে। ফলে সরকারকে বেশি পরিমাণে সার আমদানি করতে হচ্ছে।

এমওপির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পুরোপুরি আমদানি নির্ভর, আর ডিএপি ও টিএসপির দেশীয় উৎপাদন চাহিদার তুলনায় অনেক কম।

আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। ফেব্রুয়ারি থেকে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার কারণে এলএনজি সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। ফলে সরকারকে সার কারখানার পরিবর্তে অন্য খাতে গ্যাস সরিয়ে নিতে হয়েছে। একইসঙ্গে আমদানিকৃত কাঁচামালের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় দামও বেড়েছে।

বিসিআইসির পরিচালক (বাণিজ্য, উৎপাদন ও গবেষণা) মো. মনিরুজ্জামান বলেন, সংস্থার গ্যাসভিত্তিক সার কারখানাগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চালাতে দৈনিক প্রায় ১৯৭ মিলিয়ন ঘনফুট প্রাকৃতিক গ্যাস প্রয়োজন।

তার ভাষ্য, সাধারণত প্রয়োজনীয় গ্যাসের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ পাওয়া যায়।

তিনি বলেন, ‘গ্যাস সংকটের মধ্যেও গত অর্থবছরে আমরা ১১ লাখ ৬ হাজার টন সার উৎপাদন করেছি। সারা বছর নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস পেলে আরও ২২ থেকে ২৫ লাখ টন অতিরিক্ত সার উৎপাদন করা সম্ভব হতো।’

তিনি বলেন, অধিকাংশ কারখানার যন্ত্রপাতি পুরোনো হয়ে যাওয়ায় নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের প্রয়োজন হয়। সে কারণেও উৎপাদন সক্ষমতা সীমিত হয়।

রাষ্ট্রায়ত্ত ৫টি কারখানা ১৯৬৫ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত। এই বাইরে শাহজালাল ফার্টিলাইজার কোম্পানী লিমিটেড ২০১৬ সালে চালু হয় এবং ঘোড়াশাল-পলাশ ফার্টিলাইজার পিএলসি ২০২৩ সালে উৎপাদন শুরু করে।

বিসিআইসি সারা দেশে প্রায় ৬ হাজার অনুমোদিত ডিলারের মাধ্যমে সার বিতরণ করে। ইউরিয়া এখনো দেশের সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত সার। বিশেষ করে বোরো ও আমন মৌসুমে এর বার্ষিক চাহিদা থাকে ২৬ থেকে ২৭ লাখ টন।

জমি প্রস্তুতের সময় মূলত ডিএপি ও টিএসপি ব্যবহার করা হয়। অন্যদিকে ধান, আলু, শাকসবজি ও ফলের উৎপাদন এবং গুণগত মান বাড়াতে ব্যাপকভাবে এমওপি ব্যবহার করা হয়।

গ্যাস সংকটে গত ৪ মার্চ থেকে বন্ধ রয়েছে চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড (সিইউএফএল)।

কারখানাটির প্রধান রসায়নবিদ উত্তম চৌধুরী বলেন, ‘পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় গত অর্থবছরে কারখানাটি মাত্র ৪ থেকে ৫ মাস চালু ছিল। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আমরা প্রায় ৬৫ হাজার টন ইউরিয়া উৎপাদন করেছি। আগের বছর এই উৎপাদন ছিল ১ লাখ ৫ হাজার টন। নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস পেলে উৎপাদন প্রায় দেড় লাখ টনে পৌঁছাতে পারতো।’

১৯৮৭ সালে যখন এই কারখানা স্থাপন করা হয়, তখন বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা ছিল ৫ লাখ ৬১ হাজার টন। যন্ত্রপাতি পুরোনো হয়ে যাওয়ায় উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমে গেছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।

তবে গ্যাস সংকট দেশীয় সার উৎপাদনের একমাত্র বাধা নয়।

একাধিক আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করার পরও ফসফরিক অ্যাসিড সংগ্রহ করা সম্ভব না হওয়ায় দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত ডিএপি উৎপাদনকারী কারখানাটি গত ২৮ জুন থেকে বন্ধ রয়েছে।

‘আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার কারণে ফসফরিক অ্যাসিড সংগ্রহ করতে কারখানাটি হিমশিম খাচ্ছে,’ বলেন ডিএপি ফার্টিলাইজার কোম্পানী লিমিটেডের (ডিএপিএফসিএল) উপমহাব্যবস্থাপক (বাণিজ্য) রবিউল আলম খান।

তিনি বলেন, ‘জানুয়ারিতে ২০ হাজার টন ফসফরিক অ্যাসিড আমদানির জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল। কিন্তু নির্বাচিত সরবরাহকারী সেই চালান দিতে পারেনি।’

‘এরপর ৮ জুন ও ২৩ জুন বিসিআইসি নতুন করে দরপত্র আহ্বান করে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতার কারণে একটি প্রতিষ্ঠানও দরপত্রে অংশ নেয়নি,’ যোগ করেন তিনি।

এরপর বিসিআইসি নতুন করে আরও দুটি দরপত্র আহ্বান করেছে। সেগুলো যথাক্রমে ৮ আগস্ট ও ৯ সেপ্টেম্বর খোলা হবে।

রবিউল জানান, সিইউএফএল ও কাফকো উৎপাদন বন্ধ করে দেওয়ার পর অ্যামোনিয়ার সংকটে কারখানাটি এর আগে ২ মাসের বেশি বন্ধ ছিল।

তিনি বলেন, ‘এখন আবার আমদানিকৃত ফসফরিক অ্যাসিডের সংকটে উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে।’

২০০৬ সালে ৬ লাখ ৬০ হাজার টন বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা নিয়ে চালু হওয়া ডিএপিএফসিএল ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মাত্র ৮৫ হাজার টন ডিএপি উৎপাদন করেছে।

মহেশখালীর একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটি দেখা দেওয়ায় দেশীয় উৎপাদনের ভবিষ্যৎ আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

পেট্রো বাংলা গত বুধবার জানিয়েছে, স্বাভাবিক সময়ে দৈনিক এলএনজি সরবরাহ থাকে ৯৫০ থেকে ১ হাজার ৫০ মিলিয়ন ঘনফুট। এই সমস্যার কারণে সেটি কমে ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুটের নিচে নেমে এসেছে। ফলে সারা দেশে আবাসিক, শিল্প ও সিএনজি ফিলিং স্টেশনে গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে।

চট্টগ্রামে, যেখানে দুটি বড় সার কারখানা অবস্থিত, সেখানে শিল্পকারখানাগুলো গ্যাস পাচ্ছে কম।

কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানী লিমিটেডের উপমহাব্যবস্থাপক (বিপণন, দক্ষিণ বিভাগ) অনুপম দত্ত জানান, এ অঞ্চলে দৈনিক গ্যাসের ঘাটতি প্রায় ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট।

‘তাই সরকারের নির্ধারিত খাতে গ্যাস সরবরাহ সীমিত করতে হচ্ছে। তবে শহরের দুটি সার কারখানার অন্তত একটি সচল রাখার চেষ্টা করছি,’ বলেন তিনি।

চলমান আমন মৌসুমের চাহিদা মেটাতে বর্তমানে পর্যাপ্ত সার মজুত রয়েছে বলে জানিয়েছেন কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।

গত ২৩ জুলাই পর্যন্ত সরকারের মজুত ছিল মোট ১৬ লাখ ১৯ হাজার টন সার। এর মধ্যে ইউরিয়া ৬ লাখ ২০ হাজার টন, টিএসপি ৩ লাখ ৫২ হাজার, ডিএপি ৪ লাখ ৫১ হাজার ও এমওপি ২ লাখ ২৫ হাজার টন।

ইউরিয়া ও টিএসপির মজুত প্রত্যাশিত পর্যায়ে থাকলেও ডিএপি ও এমওপির মজুত কাঙ্ক্ষিত মাত্রার চেয়ে কিছুটা কম।

মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের আমন মৌসুমে জুলাই ও আগস্ট মাসে সারের চাহিদা ছিল ৮ লাখ ৭৩ হাজার টন।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের সার ব্যবস্থাপনা ও পর্যবেক্ষণ শাখার অতিরিক্ত সচিব আহমেদ ফয়সাল ইমাম বলেন, ‘জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বরের জন্য আমাদের পর্যাপ্ত সার মজুত রয়েছে, অক্টোবর পর্যন্ত চাহিদা মেটানো সম্ভব হবে।’

তিনি বলেন, আমদানি উৎস বহুমুখীকরণের কৌশলের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ নিয়মিত মরক্কো, কানাডা ও রাশিয়া থেকে সারের চালান পাচ্ছে।

সৌদি আরবের সঙ্গে ১২ লাখ টন সার আমদানির চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ ইতোমধ্যে প্রায় ৬ লাখ ৪০ হাজার টন সার পেয়েছে।

ফয়সাল বলেন, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে বাকি চালান আসতে দেরি হচ্ছে। সেগুলো লোহিত সাগর হয়ে আনার বিষয়ে আলোচনা চলছে।

গ্যাস সংকটে প্রায় ১ মাস উৎপাদন বন্ধ থাকার পর রক্ষণাবেক্ষণে ১৭ দিন সময় নিয়ে আগামী বৃহস্পতিবার থেকে কাফকো আবার উৎপাদন শুরু করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

Related Articles

Latest Posts