গুম থেকে ফিরেও ‘মুক্তি’ মেলে কি?

চোখ বাঁধা অবস্থায় চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি মহাসড়কের পাশের একটি সেগুনবনে পাওয়া গিয়েছিল মাইকেল চাকমাকে। দিনটি ছিল ২০২৪ সালের ৭ আগস্ট, শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার দুদিন পর। এর আগে পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে মাইকেলের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। পরিবার ধরে নিয়েছিল, তিনি হয়তো আর বেঁচে নেই। কিন্তু মাইকেল বেঁচে ফিরেছেন। গোপন বন্দিশালা থেকে বেরিয়ে এসেছেন। তাহলে কি তিনি মুক্ত? মাইকেলের উত্তর, ‘না।’ 

তিনি বলেন, ‘আমি এখনো একা; লুকিয়েই আছি। পরিবার থেকে দূরে থাকছি। যেকোনো সময় আমাকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে।’

মাইকেলের বিরুদ্ধে এখনো ১০টি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা। দুটি মামলায় তার সাজাও হয়েছে। তাই পাঁচ বছর গুম থাকার পরও মাইকেলের মনে হয়, তিনি যেন আরেকটা ‘আয়নাঘরে’ বাস করছেন।

তিনি বলেন, ‘আমি দ্বিতীয় আয়নাঘরে বাস করছি।’

আজ আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস। এই দিনে গুমের শিকার মানুষদের কথা স্মরণ করার পাশাপাশি সামনে আসে তাদের ফিরে আসার পরের জীবনও। কারণ গুমের অন্ধকার থেকে ফিরে এলেও যে তাদের দুর্ভোগ শেষ হয়েছে, এমন নয়। মামলা, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, কারাগার, আদালতে হাজিরা, অর্থনৈতিক সংকট, পড়াশোনা বা চাকরি হারানো এবং সমাজের চোখে বদলে যাওয়া পরিচয়ের সঙ্গে তাদের যুঝতে হয়।

দিবসটিকে সামনে রেখে দ্য ডেইলি স্টার কথা বলেছে গুম থাকা কয়েকজন ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে। তাদের অভিজ্ঞতায় উঠে এসেছে, বছরের পর বছর গোপন বন্দিত্বের পর মুক্তি পেলেও তারা স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারছেন না। তাদের ঘটনা গুম-সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে নথিভুক্ত ও বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) সংগঠক মাইকেল চাকমাকে ২০১৯ সালের ৯ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকায় যাওয়ার পথে তুলে নেওয়া হয়। 

তিনি জানান, এরপর পাঁচ বছরেরও বেশি সময় তাকে জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেলে (জেআইসি) রাখা হয়। এদিকে তার অনুপস্থিতিতেই তার বিরুদ্ধে মামলাগুলো চলেছে।

রাঙ্গামাটি ও চট্টগ্রামে তার বিরুদ্ধে আটটি মামলা করা হয়। এসব মামলার ঘটনা ২০০৭, ২০১১ ও ২০১৮ সালের। ২০২৩ সালে একটি মামলায় তার অনুপস্থিতিতেই সাজা দেওয়া হয়। তখনও তিনি গোপন বন্দিশালায়।

২০২৫ সালের অক্টোবরে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আরেক মামলায়ও তিনি সাজা পান। এ ছাড়া ২০২০ সালে আরও দুটি মামলায় পুলিশ অভিযোগপত্র দেয়। তখনো তিনি জেআইসিতে আটক ছিলেন।

মাইকেলের দাবি, যেসব মামলায় তার সাজা হয়েছে, সেগুলো সাজানো। তার অভিযোগ, এসব মামলা দায়েরের আগেও তাকে একবার এক সপ্তাহের জন্য গুম করা হয়েছিল।

তিনি বলেন, ‘২০০৭ সালের ঘটনা। তারা আমাকে এমনভাবে মারধর করে যে আমি অজ্ঞান হয়ে যাই। কানের লতিতে বৈদ্যুতিক শক দেয়। এরপর আমাকে কাপ্তাই লেকের মাঝখানে নিয়ে যাওয়া হয়। বন্দুকের নল আমার মুখের ভেতর ঢুকিয়ে দেওয়া হয়।’

‘এক সপ্তাহ পর আমাকে লংগদু থানায় নেওয়া হয়। সেখানে আমাকে সেই একই বন্দুক রাখার অভিযোগে মামলা দেওয়া হয়, যে বন্দুক দিয়ে আমাকে ভয় দেখানো হয়েছিল।’

দ্বিতীয় মামলায় সাজা হওয়ার ১০ মাস আগে মাইকেল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ করেন। তিনি ন্যায়বিচার ও ক্ষতিপূরণ দাবি করেন।

এখন তার মনে হচ্ছে, গুম থেকে ফিরে আসার পরও তার বিরুদ্ধে সেই একই চাপ অব্যাহত রয়েছে। তিনি বলেন, ‘পাঁচ বছর আমাকে মৃত্যুর মুখে রাখার পরও তাদের রাগ কমেনি। আমি এই রাষ্ট্রের কাছে ন্যায়বিচার পাব না।’

শরিফুল ইসলামের ক্ষেত্রে গুমের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও আইনি জটিলতা। তিনি এখন কাশিমপুর কারাগারে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দী। আর তার পরিবার তার বিরুদ্ধে করা সাতটি মামলা নিয়ে লড়ছে।

তার ভাই আরিফুল বলেন, ২০১৬ সালের মার্চ-এপ্রিলের দিকে পর্যটন ভিসায় ভারতে গিয়েছিলেন শরিফুল। সেখানে যাওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই পরিবারের সঙ্গে তার যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। প্রায় তিন বছর পরিবার ভেবেছিল, তাকে হয়তো ‘বন্দুকযুদ্ধে’ হত্যা করা হয়েছে।

এদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তার অবস্থান জানতে পরিবারের সদস্যদের বারবার আটক করেছে, জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। একই সময়ে তার বিরুদ্ধে হত্যা মামলাও চলছিল। আদালতে তার অনুপস্থিতিতে বিচার চলে।

২০১৯ সালের জানুয়ারিতে চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল থেকে শরিফুলকে গ্রেপ্তারের কথা জানায় র‌্যাব। কিন্তু শরিফুল পরিবারকে জানান, ২০১৬ সালের মে মাসে ভারতে তাকে আটক করা হয়। পরে তাকে বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থার হাতে তুলে দেওয়া হয়। এরপর ৩২ মাস তাকে গোপন বন্দিশালায় আটকে রাখা হয়েছিল। পরে তাকে নাচোলে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।

তার ভাই আরিফুল বলেন, ‘তাকে নাচোলে নেওয়াই হয়নি। পুরো সময় সে ঢাকায় ছিল।’

জেলে গিয়ে শরিফুল জানতে পারেন, যখন তাকে গোপনে আটকে রাখা হয়েছিল, তখনই আদালতে তার বিচার হয়ে গেছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রেজাউল করিম সিদ্দিকী হত্যা মামলায় তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তাকে হোলি আর্টিজান হামলার মামলাতেও অভিযুক্ত করা হয়েছে।

আরিফুলের প্রশ্ন, গুমের শিকার একজন মানুষ কীভাবে একই সময়ে নিজের বিরুদ্ধে চলা মামলায় আত্মপক্ষ সমর্থন করবেন?

শেখ আহমেদ মামুনের গুম-পরবর্তী জীবনও কঠিন যাচ্ছে। সিলেটের লিডিং ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী মামুন বলেন, ২০২১ সালের ১৫ নভেম্বর তাকে তুলে নেওয়া হয়। প্রায় দুই বছর গোপনে আটক রাখার পর ২০২৩ সালের ৯ আগস্ট একটি মামলায় আনুষ্ঠানিকভাবে তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।

তার ভাষ্য, এটা ছিল সাজানো আত্মসমর্পণের ঘটনা। মামুন শেষ পর্যন্ত মুক্তি পেয়েছেন। কিন্তু সমাজে তার পরিচয়ের সঙ্গে জুড়ে গেছে ‘জঙ্গি’ তকমা।

তিনি বলেন, ‘সেই অন্ধকার দিনগুলো পেছনে ফেলে এসেছি। কিন্তু সমাজের মানুষ যেভাবে আমাকে দেখে, তা খুব কষ্ট দেয়। আমার নামে জঙ্গি তকমা থাকায় আমার বোনের বিয়েও আটকে গিয়েছিল।’

শেষ পর্যন্ত বাড়ি ছেড়ে কিশোরগঞ্জে নতুন করে জীবন শুরু করার চেষ্টা করেন মামুন। কিন্তু দীর্ঘদিন গুম ও কারাগারে থাকার কারণে পড়াশোনা শেষ করতে পারেননি।

তিনি বলেন, ‘আমার বাবা সামান্য বেতনের চাকরি করেন। ছয় ভাইবোনের মধ্যে আমি সবার বড়। কিন্তু এতদিন হারিয়ে যাওয়ার কারণে পড়াশোনা শেষ করতে পারিনি।’

এখনো তাকে রাঙামাটির মামলায় আদালতে হাজিরা দিতে হয়। প্রতিবার সেখানে যেতে তার খরচ হয় ৬ থেকে ৭ হাজার টাকা। তিনি বলেন, ‘এই খরচ বহন করা আমার পক্ষে সম্ভব না। মাদ্রাসার বেতন দিয়ে নিজের খরচ চালানোই কঠিন। পরিবারের জন্যও কিছু করতে পারছি না।’

কুমিল্লার ২৭ বছর বয়সী ইসমাইল হোসেনের পরিবারও গুমের পরের লড়াইয়ে আর্থিকভাবে ভেঙে পড়েছে। ইসমাইল বলেন, ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে র‌্যাবের পরিচয় দেওয়া কয়েকজন তাকে কুমিল্লা থেকে তুলে নিয়ে যায়। চোখ বাঁধা অবস্থায় তাকে বান্দরবান ও চট্টগ্রাম হয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। তার দাবি, প্রায় দুই মাস তাকে গোপনে আটক রাখা হয়েছিল।

২০২২ সালের ৪ নভেম্বর ঢাকায় আরও চারজনের সঙ্গে তাকে গণমাধ্যমের সামনে হাজির করা হয়। পরে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। কারাগারে গিয়ে ইসমাইল জানতে পারেন, রাঙামাটিতে তার বিরুদ্ধে আরও একটা মামলা করা হয়েছে। অথচ তার দাবি, তিনি কখনো রাঙামাটিতে যাননি।

পরে জামিন পেলেও প্রায় দুই বছর কারাগারে থাকা এবং এরপর আইনি লড়াই চালাতে গিয়ে তার পরিবারের খরচ হয়েছে প্রায় ১৫ লাখ টাকা। এই খরচ পরিবারটিকে আর্থিকভাবে নিঃস্ব করে দিয়েছে।

গুম ও কারাবন্দিত্বের ঘটনায় তার বাবা-মাও মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। জামিনে মুক্তির কিছুদিন পর তার বাবা মারা যান। তার মা এখনো অসুস্থ ও দুর্বল। ইসমাইল এখন রাষ্ট্রের কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করছেন।

মাদ্রাসাশিক্ষক মাওলানা হোসাইন আহমদের গল্পও প্রায় একইরকম। তিনি বলেন, ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে নওগাঁ থেকে সাদাপোশাকের কয়েকজন তাকে তুলে নিয়ে যায়। ২১ দিন তাকে গোপনে আটকে রাখা হয়। পরে নারায়ণগঞ্জ ও রাঙামাটিতে করা দুটি ফৌজদারি মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।

এরপর আরও ২১ মাস কারাগারে ছিলেন তিনি। ২০২৪ সালের জুনে জামিন পান। এখন পটুয়াখালীতে নিজের বাড়িতে ফিরেছেন তিনি। কিন্তু রাঙামাটির মামলাটি এখনো চলছে। আদালতে হাজিরা দিতে তাকে বারবার সেখানে যেতে হয়। প্রতিবারের যাতায়াতও তার জন্য বড় খরচ।

গুম ও গ্রেপ্তারের সময় তার সম্পর্কে গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরও তার জীবনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছে। হোসাইন আহমদ বলেন, ‘আমার আশপাশের সবাই মনে করে আমি একজন জঙ্গি।’

এসব গুমের ঘটনায় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গুমের ঘটনায় তিনটি মামলা বিচারাধীন। আরও কয়েকটি ঘটনার তদন্ত করছে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন (টিএফআই) সেলে অন্তত ১৪ জনকে আটক রেখে নির্যাতন করা হয়েছিল।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে রাষ্ট্রীয়ভাবে অনেক গুমের অভিযোগ উঠেছিল। শেখ হাসিনাসহ সাবেক কয়েকজন নিরাপত্তা কর্মকর্তা এসব মামলায় অভিযুক্ত। গুম-সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে এসব ঘটনার নথি ও বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে।

গুম হওয়া পরিবারগুলোর প্ল্যাটফর্ম ‘মায়ের ডাক’-এর প্রধান সমন্বয়ক সানজিদা ইসলাম তুলি বলেন, সরকার ক্ষতিপূরণ দেওয়ার পরিকল্পনা করছে। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের একটি তালিকা যাচাই করা হচ্ছে। তবে পরিবারগুলোর জন্য শুধু টাকা নয়, আইনি স্বীকৃতিও জরুরি।

তুলি বলেন, ‘অন্তত নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারকে এমন একটি সরকারি সনদ দেওয়া দরকার, যেখানে বলা থাকবে যে তাদের স্বজন গুমের শিকার। তাহলে তারা তার সম্পদ ব্যবহার করতে পারবেন। সন্তানরা বাবার টাকা ব্যবহার করতে পারছে না।’

সংসদে গুমের বিষয়ে একটি বিল নিয়ে আলোচনা চলছে। এতে ক্ষতিপূরণের জন্য আইনি কাঠামো তৈরি এবং নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারকে উপযুক্ত আদালতের মাধ্যমে গুমের সনদ দেওয়ার ব্যবস্থা রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। এই সনদ থাকলে নিখোঁজ স্বজনের সম্পদ ব্যবহার করতে পারবেন পরিবারের সদস্যরা।

প্রস্তাবিত বিলে গুমের শিকার ব্যক্তিকে সর্বোচ্চ ১ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। দণ্ডিত ব্যক্তিদের কাছ থেকে আদায় করা জরিমানার অর্থ থেকে এই টাকা দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। জরিমানা থেকে পুরো অর্থ আদায় করা সম্ভব না হলে বাকি টাকা রাষ্ট্র দেবে।

কিন্তু ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের কাছে আইনি স্বীকৃতি এখনো ন্যায়বিচার নয়। 

তুলি বলেন, ‘মায়ের ডাক’ তাদের সঙ্গে থাকা সব ভুক্তভোগীর মামলার নথি প্রায় দেড় বছর আগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জমা দিয়েছে। কিন্তু এখনো কোনো মামলার রায় হয়নি।

তার প্রশ্ন, ‘আমাদের অপেক্ষা আর কতদিন?’

 

(জায়মা ইসলাম এবং সিলেট, রাজশাহী, কুমিল্লা ও পটুয়াখালী প্রতিনিধি প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহায়তা করেছেন)

Related Articles

Latest Posts