২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ব্যাংকিং খাতের আড়ালে থাকা বিশাল অঙ্কের খেলাপি ঋণ ও আর্থিক কেলেঙ্কারির তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে। জমতে থাকা এই লোকসানের ধাক্কায় ব্যাংকগুলোর মূলধন বা নিরাপত্তা বাফার ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে আর্থিক ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতায় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল অবস্থানেও নেমে গেছে বাংলাদেশের ব্যাংকগুলো।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্ট (আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদন) অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতের মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত (সিআরএআর) ঋণাত্মক বা মাইনাস পর্যায়ে নেমে গেছে।
মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত বা ক্যাপিটাল টু রিস্ক-ওয়েটেড অ্যাসেটস রেশিও (সিআরএআর) ব্যাংকের একটি আর্থিক শক্তিমত্তার গুরুত্বপূর্ণ সূচক। এটি দেখায়, ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ থেকে ক্ষতি হলে সেই ধাক্কা সামাল দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত মূলধন ব্যাংকের আছে কি না। অনুপাত ঋণাত্মক হয়ে যাওয়া মানে লোকসান ব্যাংকের নিরাপত্তা বাফার সম্পূর্ণ গ্রাস করেছে।
২০২৫ সালের শেষে বাংলাদেশের সিআরএআর ছিল মাইনাস ২ দশমিক ৬৪ শতাংশ। তুলনায় গত বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ভারতে এই হার ছিল ১৭ দশমিক ২০ শতাংশ, শ্রীলঙ্কায় ১৯ দশমিক ৪০ শতাংশ এবং ২০২৫ সালের শেষে পাকিস্তানে ২০ দশমিক ৮০ শতাংশ।
আন্তর্জাতিক ব্যাসেল-৩ নীতিমালা অনুযায়ী, ব্যাংকগুলোর ন্যূনতম ১০ শতাংশ মূলধন পর্যাপ্ততা বজায় রাখতে হয়। এর সঙ্গে অতিরিক্ত ২ দশমিক ৫ শতাংশ সুরক্ষা বাফারও রাখতে হয়। সেই মানদণ্ড থেকে বাংলাদেশ এখন অনেক নিচে অবস্থান করছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত তুলনামূলকভাবে শক্ত অবস্থানে ছিল। তবে ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের পতনের পর দীর্ঘদিনের আড়ালে থাকা ক্ষতি ও খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র সামনে আসতে শুরু করে। এরপর থেকেই খাতটির আর্থিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে।
২০২৪ সালে ব্যাংক খাতের মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত ছিল ৩ দশমিক ০৮ শতাংশ। একই সময়ে ভারতে ছিল ১৬ দশমিক ৭ শতাংশ, পাকিস্তানে ২০ দশমিক ৬ শতাংশ এবং শ্রীলঙ্কায় ১৮ দশমিক ৪ শতাংশ।
ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বছরের পর বছর ধরে চলা অনিয়ম, দুর্নীতি ও বড় বড় আর্থিক কেলেঙ্কারির ফলেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন এসব ক্ষতির পুরো চিত্র প্রকাশ করা হয়নি।
অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান এবং মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, বড় ধরনের আর্থিক কেলেঙ্কারির কারণেই ব্যাংকিং খাতের মূলধন পরিস্থিতি ঋণাত্মক হয়ে পড়েছে।
তিনি বলেন, বেশ কিছু ব্যাংক আবার ‘রেগুলেটরি ডেফারেল’ বা বিশেষ ছাড়ের সুবিধা নিয়েছে। এটি একটি সাময়িক ব্যবস্থা যার মাধ্যমে ব্যাংকগুলো তাদের লোকসান বা নির্দিষ্ট কিছু নিয়ম মেনে চলার বাধ্যবাধকতা স্থগিত রাখতে পারে, যা মূলত ব্যাংকের ব্যালেন্স শিটের তাৎক্ষণিক চাপ কমাতে ব্যবহৃত হয়।
তবে এই সুবিধার মেয়াদ শেষ হলে বা প্রত্যাহার করা হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে বলেও সতর্ক করেন তিনি।
দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের ব্যাংক খাত দীর্ঘদিন ধরেই কম মূলধন নিয়ে পরিচালিত হচ্ছিল। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গড়ে মূলধন পর্যাপ্ততার হার ছিল প্রায় ১১ শতাংশ। কিন্তু মাত্র এক বছরে তা ১১ দশমিক ৬৪ শতাংশ থেকে ৮ দশমিক ৫ শতাংশীয় পয়েন্টেরও বেশি কমে মাইনাস ২ দশমিক ৬৪ শতাংশে নেমে আসে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের শেষে ৪২টি ব্যাংক ব্যাসেল-৩ এর শর্ত পূরণ করতে সক্ষম হয়েছে। এসব ব্যাংকের দখলে রয়েছে দেশের ব্যাংকিং খাতের মোট সম্পদের ৬০ শতাংশের বেশি।
অন্যদিকে শরিয়াহভিত্তিক কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংক, বিশেষায়িত উন্নয়ন ব্যাংক এবং কয়েকটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের দুর্বল মূলধন অবস্থাই সামগ্রিক পতনের প্রধান কারণ।
ব্যাংক খাতের সবচেয়ে বড় চাপের উৎস হয়ে উঠেছে খেলাপি ঋণ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ। চলতি বছরের মার্চ শেষে তা বেড়ে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ।
ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইএনএম) নির্বাহী পরিচালক এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরি বলেন, ঋণাত্মক মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত ব্যাংক খাতের গভীর কাঠামোগত দুর্বলতারই প্রতিফলন।
তিনি বলেন, সর্বশেষ পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে যে আগের বছরের তুলনায় ব্যাংকিং খাতের স্বাস্থ্য আরও খারাপ হয়েছে। সমস্যাগুলো দিন দিন আরও জটিল ও গুরুতর হয়ে উঠছে।
মুজেরির মতে, এই সংকট একদিনে তৈরি হয়নি; বহু বছরের জমে থাকা সমস্যার ফল এটি।
তিনি বলেন, ব্যাংকিং খাতকে টেকসই ও সুস্থ অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে হলে কঠোর ও কার্যকর সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নেওয়ার কোনো বিকল্প নেই।
এদিকে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের সিইও রহমান বলেন, বর্তমান সরকার এমন সময়ে দায়িত্ব নিয়েছে যখন আর্থিক খাতের দুর্বলতা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই সরকারকে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে। ব্যাংকগুলোর মূলধন পুনর্গঠন ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু সরকারেরও পর্যাপ্ত আর্থিক সক্ষমতা নেই।
মূলধন পুনর্গঠন বা রিক্যাপিটালাইজেশন হলো লোকসানে পড়া ব্যাংককে নতুন মূলধন দিয়ে আর্থিকভাবে স্থিতিশীল করা। সাধারণত সরকার বা শক্তিশালী আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে দুর্বল ব্যাংক একীভূত করার পথও বেছে নেওয়া হয়।
গত সপ্তাহে বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে চলতি অর্থবছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করছে সরকার।
এর মধ্যে ২০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে পাঁচটি সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংক একীভূত করে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের জন্য।
সৈয়দ মাহবুবুর রহমান মনে করেন, শুধু মূলধন জোগান দিলেই হবে না, ব্যাংক একীভূতকরণসহ আরও বিস্তৃত কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন।
তিনি উদাহরণ হিসেবে গ্রিসের কথা উল্লেখ করে বলেন, দেশটি একই ধরনের ব্যাংকিং সংকটের মুখোমুখি হয়েছিল। কিন্তু ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহায়তায় বড় ধরনের মূলধন পুনর্গঠনের মাধ্যমে তারা ঘুরে দাঁড়াতে পেরেছিল। তবে বাংলাদেশের সেই ধরনের আর্থিক সক্ষমতা নেই বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

