কোন ‘শক্তি’র জোরে আবার হরমুজ বন্ধ, মাইন ছাড়া আর কী রেখেছে ইরান

পারস্য উপসাগরের উপকূলে নৌ-বন্দরগুলোতে ইরানি যুদ্ধজাহাজের ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকার দৃশ্য এখন খুব স্পষ্ট। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরানের ১৫৫টি যুদ্ধজাহাজ ধ্বংস করা হয়েছে।

৮ এপ্রিল দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর যুক্তরাষ্ট্রের জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন জানান, ইরানের নৌবাহিনীর প্রধান যুদ্ধজাহাজসহ প্রায় ৯০ শতাংশ বহর এখন সমুদ্রের তলদেশে।

প্রশ্ন হলো, প্রায় সব যুদ্ধজাহাজ ধ্বংসের পরও কীভাবে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ এখনো ইরানের হাতে? এর কারণ কি শুধু সামুদ্রিক মাইন? নাকি অন্য কিছু?

সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমস ও ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে আড়ালে লুকিয়ে থাকা ইরানের সেই শক্তির তথ্য।    

নিউইয়র্ক টাইমস বলছে, পারস্য উপসাগরের উপকূলে ইরানি যুদ্ধজাহাজের ধ্বংসাবশেষের আড়ালে লুকিয়ে আছে ভিন্ন একটি বাহিনী, যাকে প্রয়োজন ছাড়া সাধারণত দেখা যায় না।  

ইরানের নিয়মিত নৌবাহিনী থেকে সম্পূর্ণ আলাদা এই বাহিনী ‘মসকিউটো ফ্লিট’ নামেই বেশি পরিচিত। ছোট, দ্রুতগামী ও অত্যন্ত ক্ষিপ্র অস্ত্রধারী এই বোটের বহর এখন বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

হরমুজ প্রণালির তদারকির দায়িত্বে থাকা ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী (আইআরজিসি) নৌবাহিনীর প্রাণকেন্দ্র এটি।

মার্কিন নৌবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত প্রধান অ্যাডমিরাল গ্যারি রুগহেড বলেন, ইরানের ক্ষুদ্রাকৃতির এই ‘ফ্লিট’ একটি বিধ্বংসী শক্তি, যা এখনো টিকে আছে। তারা কখন কী করতে যাচ্ছে বা তাদের উদ্দেশ্য কী, তা কখনোই নিশ্চিতভাবে জানা যায় না।

আইআরজিসির এই বহরের বোটগুলো আকারে খুবই ছোট। তবে গতি অনেক বেশি। ঘণ্টায় ১১৫ মাইলের বেশি বেগে ছুটতে পারে এ বোটগুলো।

বিশ্লেষকদের মতে, বোটগুলো এতই ছোট যে স্যাটেলাইট ইমেজে অনেক সময় ধরা পড়ে না। এগুলো পাথুরে উপকূলের গভীরে খনন করা গুহার ভেতর জেটিতে রাখা থাকে এবং মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে মোতায়েন করা যায়। এদের অস্ত্র বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর জন্য বিশাল হুমকি।

লুকিয়ে থাকা এসব বোট থেকে আইআরজিসি গোপনে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎক্ষেপণ করতে পারে।

নিউইয়র্ক টাইমস জানায়, সামুদ্রিক মাইনের পাশাপাশি এগুলোই মূলত হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মার্কিন জেনারেল ড্যান কেইন জানিয়েছেন, আইআরজিসির দ্রুতগামী ও হামলাকারী বোটগুলোর আনুমানিক অর্ধেক ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে এগুলোর সঠিক সংখ্যা কত, তা জানাননি তিনি।

তবে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের ইরান বিষয়ক সিনিয়র ফেলো ফারজিন নাদিমি ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে বলেন, ‘রেভল্যুশনারি গার্ডের দ্রুত আক্রমণকারী নৌযান ও স্পিডবোট বহরের ৬০ শতাংশের বেশি অক্ষত রয়েছে। সেগুলো এখনও হুমকি সৃষ্টি করে চলেছে।’

বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এসব নৌযানের সংখ্যা কয়েকশ থেকে কয়েক হাজার হতে পারে।

নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, আইআরজিসির নৌবাহিনীর সদস্য আনুমানিক ৫০ হাজার। তারা উপসাগরীয় অঞ্চলকে পাঁচটি সেক্টরে ভাগ করেছে। ইরানের নিয়ন্ত্রণে থাকা ৩৮টি দ্বীপের অধিকাংশগুলোতেই তাদের উপস্থিতি রয়েছে। সব মিলিয়ে তারা অন্তত ১০টি সুরক্ষিত বোট বেস বা ঘাঁটি তৈরি করেছে।

এর মধ্যে একটি হলো ‘ফারুর’, যা নৌবাহিনীর বিশেষ কার্যক্রমের মূলকেন্দ্র। তাদের সরঞ্জাম, এমনকি সানগ্লাস পর্যন্ত মার্কিন নৌবাহিনীর আদলে তৈরি।

যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ও আইআরজিসি বিশেষজ্ঞ সাঈদ গোলকার নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, ‘আইআরজিসির নৌবাহিনী সমুদ্রে অনেকটা গেরিলা বাহিনীর মতো কাজ করে। এটি মূলত “অ্যাসিম্যাট্রিকাল ওয়ারফেয়ার” বা অসম যুদ্ধের ওপর গুরুত্ব দেয়, বিশেষ করে পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালিতে। তাই বড় যুদ্ধজাহাজ বা ধ্রুপদী নৌ-যুদ্ধের বদলে তারা “হিট অ্যান্ড রান” বা অতর্কিত হামলা চালিয়ে পালিয়ে যাওয়ার কৌশলের ওপর নির্ভর করে।’

জাতিসংঘের সমুদ্রবিষয়ক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম এজেন্সির মতে, যুদ্ধ শুরুর পর অন্তত ৫০টি জাহাজে হামলা হয়েছে। আইআরজিসির নৌবাহিনী খুব কমই এসব হামলার দায় স্বীকার করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, হামলাগুলো সম্ভবত ড্রোন দিয়ে করা হয়েছে যা উপকূলে ভ্রাম্যমাণ লঞ্চার থেকে উৎক্ষেপণ করা হয়। এই ড্রোনগুলোর সিগন্যাল এতটাই ক্ষীণ যে তা শনাক্ত করা কঠিন।

সামুদ্রিক গোয়েন্দা সংস্থা নেপচুন পিটুপির প্রধান ক্রিস লং বলেন, ‘পাথুরে উপকূলের ভূগর্ভে শতশত ছোট আক্রমণকারী নৌযান মজুদ করে রেখেছে আইআরজিসি। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে সব নৌযান নির্মূল করা কঠিন এবং অনেক সময় লাগবে।’

বিশেষজ্ঞদের মতে, মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলো তাদের অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে ‘মসকিউটো ফ্লিটের’ ঝাঁক মোকাবিলা করতে পারলেও, বাণিজ্যিক জাহাজের এ ধরনের কোনো প্রতিরোধ ব্যবস্থা নেই।

১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পরপরই আইআরজিসির স্থলবাহিনী গঠিত হয়। নৌবাহিনী যুক্ত করা হয় ১৯৮৬ সালের দিকে। তবে নৌবাহিনীর বিশেষ ফোর্স গঠনের বিষয়টি আসে আরও পরে। এর পেছনে রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।

ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল বলছে, ১৯৮৮ সালের এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একদিনের নৌ-যুদ্ধে ইরান তার প্রায় সব নৌবহর হারায়। এরপরই নীতি পরিবর্তন করে নৌবহরকে আরও শক্তিশালী করে তোলার উদ্যোগ নেয় ইরান।

ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ ফারজিন নাদিমি বলেন, ইরান-ইরাক ও প্রথম পারস্য উপসাগরীয় যুদ্ধের ঘটনাগুলো থেকে ইরান বুঝতে পারে তারা কখনোই মার্কিন সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সরাসরি লড়াইয়ে জিততে পারবে না। তাই তারা উপসাগরে জাহাজগুলোকে ক্লান্ত করতে একটি ছদ্মবেশী বাহিনী গড়ে তোলে।

২০১৬ সালের শুরুতে একটি ভিডিও বা ছবি পুরো বিশ্বে ব্যাপক হইচই ফেলে দিয়েছিল। পারস্য উপসাগরে দুটি ছোট নৌ-বোটে হাঁটু গেড়ে বসে ছিল ১০ মার্কিন নাবিক।

আইআরজিসির নৌবাহিনীর বিশেষ ফোর্সের প্রতিষ্ঠাতা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ নাজেরির নেতৃত্বে ওই ১০ মার্কিন নাবিককে আটক করা হয়। যদিও পরে তাদের অক্ষত অবস্থায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল।

আইআরজিসির নৌবাহিনী দীর্ঘদিন ধরে পারস্য উপসাগরের ভেতর মার্কিন সামরিক বাহিনীর সঙ্গে চোর-পুলিশ খেলা খেলে আসছে।

মার্কিন নৌবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত প্রধান অ্যাডমিরাল গ্যারি রুগহেড বলেন, ‘৯০ ও ২০০০ এর দশকে ছোট আক্রমণকারী বোটগুলো মার্কিন যুদ্ধজাহাজের দিকে তীব্র গতিতে ধেয়ে আসত এবং মাত্র আধা মাইল দূরে থাকতেই দিক পরিবর্তন করে চলে যেত।

তিনি বলেন, ‘ড্রোন যুদ্ধ এই বিপদের মাত্রা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। ড্রোন সস্তা ও অনেক ক্ষেত্রে শনাক্ত করা কঠিন। কিন্তু এগুলো শতকোটি ডলার মূল্যের যুদ্ধজাহাজের ব্যাপক ক্ষতি করতে পারে।’

নৌ-বিশ্লেষকদের মতে, ইরান প্রথমদিকে এই বোটগুলোতে রকেটচালিত গ্রেনেড বা মেশিনগান রাখত। বছরের পর বছর ধরে গবেষণা চালিয়ে তারা বিশেষভাবে নকশা করা ছোট বোট, ক্ষুদ্র সাবমেরিন ও মেরিন ড্রোন তৈরি করেছে।

এর মধ্যে রয়েছে—

দ্রুতগতির আক্রমণকারী বোট (ফাস্ট অ্যাটাক ক্রাফট): এগুলো রকেট লঞ্চার, মেশিনগান, ক্ষেপণাস্ত্র বহন করতে পারে। এর গতি ঘণ্টায় ১০০ থেকে ১১৫ মাইলের বেশি। হঠাৎ আক্রমণ করে দ্রুত সরে যেতে সক্ষম।

জাহাজ বিধ্বংসী বোট: এই বোট থেকে থেকে দূরপাল্লার জাহাজ বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়া যায়।

সামুদ্রিক ড্রোনবাহী বোট: মানুষবিহীন বিস্ফোরকবাহী নৌযান বা ড্রোন। এটি লক্ষ্যবস্তুতে ধাক্কা দিয়ে বিস্ফোরণ ঘটায়। শনাক্ত করা কঠিন।

সামুদ্রিক মাইনবাহী বোট: সমুদ্রপথে গোপনে মাইন পাতে এটি। জাহাজের শব্দ বা চৌম্বকীয় সংকেত পেলে বিস্ফোরিত হয়।

ক্ষুদ্র সাবমেরিন: এটি গোপনে টর্পেডো হামলা চালায়। অগভীর পানিতে চলতে পারে। সহজে শনাক্ত করা যায় না।

২০২০ সালে প্রকাশিত মার্কিন ম্যাগাজিন ফোর্বসের একটি প্রতিবেদনে উঠে আসে ইরানের ১০০টি নতুন নৌযানের বিস্তারিত তথ্য। 

আইআরজিসির নৌবাহিনীর একটি প্রদর্শনীর স্যাটেলাইট ইমেজ বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, নৌযানগুলোর মধ্যে ৯টি মিসাইল বোট ছিল। দেখতে ছোট হলেও জাহাজ-বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র বহন করতে পারে এসব বোট। এরা মূলত ‘সোয়ার্ম ট্যাকটিক’ বা ঝাঁক বেঁধে আক্রমণ চালাতে পারে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, অনেক রকেট ছুঁড়তে পারে এমন ৩৮টি গানবোট ছিল আইআরজিসির। এগুলো ট্যাংকারের কাছকাছি গিয়ে তার উপরিভাগে রকেট নিক্ষেপ করতে পারে। এছাড়া মেশিনগান সজ্জিত আরও ১০টি ছোট ইন্টারসেপ্টর বোটও ছিল।

টেকসই, দ্রুতগতিসম্পন্ন রিজিড-ইনফ্ল্যাটেবল বোট ছিল ৩২টি, যা মেশিনগান ও রকেট বহন করত।

সবচেয়ে বিশেষ একটি ধরন হলো রোবোটিক মিনি-সাব প্রোটোটাইপ। নৌবাহিনীর ভাষায় একে বলা হয় ‘এক্সট্রা-লার্জ আনক্রুড আন্ডারওয়াটার ভেহিকল’। ধারণা করা হয়, গোপন অভিযান চালানোর জন্য এটি ব্যবহার করে আইআরজিসি।

এছাড়া, দুটি সুইমার ডেলিভারি ভেহিকল বা সাবমেরিন, মিসাইলবাহী টহল নৌযান ও পানির উপর দিয়ে উড়তে পারে এমন ৩টি ছোট ফ্লাইং বোটও ছিল প্রদর্শনীতে। উইংস ইন গ্রাউন্ড ইফেক্ট নামে পরিচিত ফ্লাইং বোটগুলো ইরান ২০১০ সালে প্রথম তৈরি করে।

নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানি বন্দরগুলো থেকে আসা জাহাজের ওপর নৌ-অবরোধ আরোপ করলেও হরমুজ প্রণালি বা তার আশেপাশে টহল দিতে পারছে না মার্কিন যুদ্ধজাহাজ।

কারণ, সেখানে একদিকে যেমন মাইন বিস্ফোরণের ঝুঁকি রয়েছে, তেমনি ‘মসকিউটো ফ্লিট’ বা ছোট নৌযান থেকে ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর সম্ভাবনাও বেশি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অবরোধ কার্যকর করতে মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলো সম্ভবত প্রণালির বাইরে ওমান উপসাগর বা আরব সাগরে অবস্থান করছে এবং সেখান থেকেই তারা জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণ করছে।

Related Articles

Latest Posts