ঢাকার গুলশানে ‘লক্ষীকুঞ্জ’ আজও বহন করছে নায়ক রাজ রাজ্জাকের স্মৃতি। বইপ্রেম, পারিবারিক বন্ধন, চলচ্চিত্রের প্রতি নিবেদন ও স্ত্রী খায়রুননেসার প্রতি ভালোবাসার অসংখ্য স্মৃতি ছড়িয়ে আছে এই বাড়িজুড়ে।
কিংবদন্তি অভিনেতা রাজ্জাক ঢাকাই সিনেমাকে সমৃদ্ধ করেছেন অসংখ্য কালজয়ী চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। রোমান্টিক, সামাজিক ও অ্যাকশনধর্মী নানা চরিত্রে অভিনয় করে পৌঁছে গেছেন অনন্য উচ্চতায়। জীবদ্দশায় স্বাধীনতা পুরস্কার, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারসহ বহু সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন তিনি।
সম্প্রতি নায়ক রাজের জীবন ও বাড়ি ঘিরে নানা অজানা তথ্য তুলে ধরেছেন তার ছোট ছেলে অভিনেতা সম্রাট।
বই ছিল নায়ক রাজের নিত্যসঙ্গী
সম্রাট জানান, রাজ্জাকের বই পড়ার প্রবল নেশা ছিল। তিনি নিয়মিত নিউমার্কেট থেকে বই কিনতেন। বাংলা সাহিত্যের বহু লেখকের প্রতি তার আগ্রহ থাকলেও শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাসের প্রতি ছিল বিশেষ দুর্বলতা।
দেশের বাইরে গেলেও বিমানবন্দরেই প্রথমে বইয়ের দোকান খুঁজতেন তিনি। কলকাতার বইপাড়া থেকে নিয়মিত বই কিনতেন। ট্রেনে, উড়োজাহাজে কিংবা বাসার অবসরে বই ছিল তার সঙ্গী।
পরিবারের সদস্যদের মধ্যেও বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলেছিলেন তিনি। সন্তান ও নাতি-নাতনীদের নিয়মিত বই উপহার দিতেন এবং পড়তে উৎসাহিত করতেন।
শরৎচন্দ্রের ‘বৈকুণ্ঠের উইল’ অবলম্বনে তিনি নির্মাণ করেছিলেন ব্যবসাসফল চলচ্চিত্র ‘সৎ ভাই’। সাহিত্যনির্ভর আরেকটি উল্লেখযোগ্য নির্মাণ ছিল ‘চাপাডাঙার বউ’।
‘সৎ ভাই’ ও ‘অভিজাত’-এর অর্থেই গড়ে ওঠে লক্ষীকুঞ্জ
সম্রাট বলেন, ‘“সৎ ভাই” ও “অভিজাত” সিনেমার অর্থ দিয়েই মূলত বর্তমান লক্ষীকুঞ্জ নির্মাণ করা হয়। এই দুটি চলচ্চিত্র বাবার জীবনে গুরুত্বপূর্ণ মোড় এনে দিয়েছিল।’
স্বাধীনতার আগে, ১৯৬৯ সালে গুলশানে বাড়ির নির্মাণকাজ শুরু করেন রাজ্জাক। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরুর আগেই পরিবার নিয়ে সেখানে ওঠেন। প্রায় এক বিঘা জমির ওপর নির্মিত হয় বাড়িটি।
তখন সেখানে ছিল আম ও কাঁঠালের বাগান। বাড়িতে একটি সুইমিংপুলও ছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় বাড়িটির কিছু ক্ষতি হয়েছিল। পরে ১৯৮৪ সালে পুরোনো বাড়ি ভেঙে নতুন করে নির্মাণ করা হয় বর্তমান লক্ষীকুঞ্জ।
স্ত্রী ছিলেন ‘লক্ষী’, আর তিনি ছিলেন ‘হিরো’
রাজ্জাকের স্ত্রী খায়রুননেসাকে সবাই ‘লক্ষী ভাবী’ নামে চিনতেন। রাজ্জাক নিজে তাকে ডাকতেন ‘লক্ষী’ বলে। অন্যদিকে, স্ত্রী তাকে ডাকতেন ‘হিরো’ নামে।
স্ত্রীর নামের সঙ্গে নিজের ‘রাজ’ মিলিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘রাজলক্ষী প্রোডাকশন’। একইভাবে আশির দশকে উত্তরায় নির্মিত ‘রাজলক্ষী কমপ্লেক্স’-এর নামও রাখা হয় দুজনের নামের সমন্বয়ে।
রাজলক্ষী প্রোডাকশন থেকে তিনি প্রায় ২০টি চলচ্চিত্র প্রযোজনা করেন। ২০০০ সালে ‘মরণ নিয়ে খেলা’ ছিল এই প্রতিষ্ঠানের শেষ চলচ্চিত্র। তবে আলোচিত চলচ্চিত্র ‘রংবাজ’-এর যৌথ প্রযোজক ছিলেন রাজ্জাক ও মজিবুর রহমান মজনু।
আড্ডা, বাগান আর পরিবারের প্রতি টান
সম্রাট জানান, বাগান করা ছিল রাজ্জাকের অন্যতম শখ। বাড়ির ছাদজুড়ে ফুল ও ফলের গাছ লাগিয়েছিলেন তিনি।
লক্ষীকুঞ্জের নিচতলার বারান্দা ছিল তার প্রিয় স্থান। সেখানে বন্ধুদের নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা দিতেন। নাতি-নাতনীদের সঙ্গেও কাটাতেন সময়।
বাড়ির একটি দোলনায় বসে নাতিদের সঙ্গে সময় কাটানোর স্মৃতিও এখনো অমলিন।
গাজী মাজহারুল আনোয়ার, আজিজুর রহমান বুলবুল, ইআর খানসহ ঘনিষ্ঠজনেরা প্রায়ই আসতেন লক্ষীকুঞ্জে। আড্ডা শেষে নায়ক রাজের স্ত্রী লক্ষীর রান্না করা রাতের খাবার খেয়ে ফিরতেন তারা।
বাজার করা থেকে একান্নবর্তী পরিবার
রাজ্জাকের বাজার করারও বিশেষ শখ ছিল। স্ত্রীকে নিয়ে নিয়মিত সোয়ারিঘাটে বাজার করতে যেতেন তিনি।
পারিবারিক বন্ধনকে সবসময় গুরুত্ব দিতেন। প্রতিবছর কলকাতায় গিয়ে একমাত্র বোনের খোঁজ নিতেন। ভাতিজারাও নিয়মিত ঢাকায় এসে লক্ষীকুঞ্জে থাকতেন।
শুটিং না থাকলে পরিবারের সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে খাওয়া ছিল তার নিয়ম। মেঝেতে বসে রাতের খাবার খেতে পছন্দ করতেন তিনি। একান্নবর্তী পরিবার ব্যবস্থার প্রতি ছিল তার গভীর অনুরাগ।
সম্রাট জানান, বাবার মৃত্যুর পরও সেই ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন তারা।
পোশাক ও চলচ্চিত্র নির্মাণে ছিল নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি
রাজ্জাক চলচ্চিত্রে পোশাক নির্বাচনেও ছিলেন সচেতন। কোন ধরনের ছবিতে কী পোশাক পরবেন, সে বিষয়ে নিজেই সিদ্ধান্ত দিতেন।
চলচ্চিত্র নির্মাণের ব্যস্ততার কারণে গুলশানের বাড়ির পেছনেই একটি এডিটিং প্যানেল স্থাপন করেছিলেন, যাতে রাজলক্ষী প্রোডাকশনের কাজ দ্রুত সম্পন্ন করা যায়।
ধর্মীয় অনুশাসন ও সমাজসেবায় সম্পৃক্ততা
রাজ্জাক ছিলেন ধর্মপ্রাণ মানুষ। ১৯৮৩ সালে প্রথম হজ পালন করেন এবং জীবনে ছয় থেকে সাতবার হজে যান।
গুলশান সোসাইটি মসজিদ, যা বর্তমানে আজাদ মসজিদ নামে পরিচিত, তার প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের একজন ছিলেন তিনি।
১৯৮৪ সালে উত্তরায় রাজলক্ষী কমপ্লেক্স নির্মাণের সময়ও শুরু থেকেই নামাজের ব্যবস্থা রেখেছিলেন। বর্তমানে ভবনটির তৃতীয় তলায় একটি মসজিদ রয়েছে।
গাড়ি, মাছ ধরা ও প্রাণীর প্রতি ভালোবাসা
সৌখিন মানুষ হিসেবে রাজ্জাকের পরিচিতি ছিল আলাদা। গাড়ি সংগ্রহ, মাছ ধরা ও পাখি শিকার ছিল তার প্রিয় শখ।
১৯৬৭ সালে তিনি প্রথম একটি ড্যাটসান ব্লুবার্ড গাড়ি কেনেন। এরপর ১৯৬৯ সালে কেনেন টয়োটা করোনা। নতুন মডেলের গাড়ির প্রতি ছিল তার বিশেষ আকর্ষণ। একসময় তার পাঁচ থেকে ছয়টি গাড়ি ছিল।
তিনি কুকুর পুষতেন এবং প্রাণীদের ভালোবাসতেন। বাসায় সবসময় কয়েকটি কুকুর থাকত। সম্রাটও সেই অভ্যাস ধরে রেখেছেন।
মাছ ধরার নেশায় তিনি কখনো কুমিল্লা, কখনো সাভারে চলে যেতেন। পাখি শিকারও করতেন নিয়মিত। একসময় বাসায় হরিণও পুষেছিলেন, যা স্বাধীনতার আগে চিড়িয়াখানায় দিয়ে দেওয়া হয়।
নীরব দান আর শিল্পীদের পাশে থাকা
সম্রাট জানান, তার বাবা নীরবে দান করতেন। অনেক শিল্পীর প্রয়োজনে বিনা পারিশ্রমিকে অভিনয় করেছেন। চলচ্চিত্রাঙ্গনের কেউ বিপদে পড়লে তিনি সবার আগে এগিয়ে যেতেন।
মেয়ে হারানোর শোক
রাজ্জাকের তিন ছেলে—বাপ্পারাজ, বাপ্পী ও সম্রাট। বাপ্পী বর্তমানে কানাডায় বসবাস করছেন।
দুই মেয়ের মধ্যে শম্পা ১৯৯৩ সালে মারা যান। সে সময় রাজ্জাক ‘প্রেম শক্তি’ ছবির শুটিংয়ে বাইরে ছিলেন।
সম্রাট বলেন, ‘আপা হাসপাতালে শুয়ে বারবার বলছিলেন, “আব্বা কি আসবে?” খবর পেয়ে আব্বা ছুটে আসেন। এসে তাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন, “কী হয়েছে মা?” কিছুক্ষণ পরই আপা পৃথিবী থেকে বিদায় নেন।’
তিনি বলেন, ‘আব্বা সেই সময় খুব কাঁদতেন। ভীষণ ভেঙে পড়েছিলেন মেয়েকে হারিয়ে। প্রায়ই তাকে কাঁদতে দেখেছি।’
নায়ক রাজ আজ নেই। কিন্তু লক্ষীকুঞ্জের প্রতিটি কোণে এখনো ছড়িয়ে আছে তার স্পর্শ, স্মৃতি ও ভালোবাসার উত্তরাধিকার।

