বিশ্বখ্যাত টেক জায়ান্ট অ্যাপলের কথা উঠলেই প্রথম যার কথা মনে পরে, তিনি স্টিভ জবস। প্রায় ১৪ বছর দায়িত্ব সামলানো জবস অ্যাপলের জন্য এতটাই অপরিহার্য ছিলেন যে, তিনি প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার (সিইও) পদ ছাড়ার পর প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারের দাম প্রায় ৫ শতাংশ কমে ১৪ ডলারের নিচে নেমে আসে।
এমনই এক পরিস্থিতিতে ২০১১ সালের আগস্টে প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্ব নেন টিম কুক। প্রায় ১৫ বছর সিইওর চেয়ার সামলে সেই ১৪ ডলারের শেয়ারের দাম ২৭৩ ডলারে নিয়ে এসেছেন কুক। সিএনএনের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, অ্যাপল ২০১৮ সালে প্রথম এক ট্রিলিয়ন ডলারের কোম্পানিতে পরিণত হয় এবং বর্তমানে এর মূল্য চার ট্রিলিয়ন ডলার। শুধু তাই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মূল্যবান কোম্পানি এখন অ্যাপল। তাদের উপরে রয়েছে কেবল চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এনভিডিয়া।
‘অপরিহার্য’ জবসের হাত ধরে অ্যাপলে আসা কুক নিজের এই সফলতা দিয়েই হয়তো আবারও প্রমাণ করে দিয়েছেন—এ দুনিয়ায় কেউই অনিবার্য নয়।
১৯৭৬ সালের ১ এপ্রিল স্টিভ জবস, স্টিভ ওজনিয়াক ও রোনাল্ড ওয়েনের হাত ধরে যাত্রা শুরু হয় অ্যাপলের। মাঝে জবসকে অ্যাপল ছাড়তে হলেও প্রতিষ্ঠান বাঁচাতে আবারও ফিরিয়ে আনা হয়। ১৯৯৭ সালে পুনরায় ফেরার পর থেকেই কার্যত সিইওর দায়িত্ব সামলেছেন তিনি।
ফেরার এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যেই কুককে নিয়োগ দেন জবস। কুকের কাজ ছিল সাপ্লাইচেইন ও অপারেশন পরিচালনা। একদিকে জবস যখন নতুন ও রঙিন আইম্যাকের মতো আকর্ষণীয় বিষয়গুলোর সামলাতেন, অন্যদিকে কুক প্রয়োজনীয় সব যন্ত্রাংশ নিশ্চিত করার মতো নীরস কাজগুলো নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন।
জবসের সঙ্গে তাল মিলিয়ে অ্যাপলে নিজের দায়িত্ব সুনিপুণভাবে সামলেছেন কুক। অ্যাপলের পণ্য নিজস্ব কারখানায় উৎপাদনের বদলে সরবরাহকারীদের ওপর নির্ভর করেন, যার দরুন নোকিয়ার মতো পরিণতি বরণের ঝুঁকি থেকে মুক্ত হয়ে যায় প্রতিষ্ঠানটি। পণ্য মজুত না করে বরং যত দ্রুত সম্ভব সেগুলো বাজারে দিয়ে দেওয়ার ওপর তিনি জোর দিতেন। বলতেন, পণ্য ‘তাজা’ থাকতেই বিক্রি করা উচিত।
সময়ের সঙ্গে জবস অসুস্থ হয়ে পড়তে থাকলে ধীরে ধীরে কুকের কাঁধে দায়িত্ব বাড়তে থাকে। ২০০৪ সালে জবস অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারের অস্ত্রোপচারের জন্য ছুটিতে গেলে কুককে অন্তর্বর্তীকালীন সিইও করা হয়। ছুটি শেষে জবস ফিরলে ২০০৫ সালে কুক হন চিফ অপারেটিং অফিসার (সিওও)।
২০০৯ সালের জানুয়ারিতে জবস আবারও দীর্ঘ ছুটি নিয়ে কুককেই অন্তর্বর্তীকালীন সিইও করে যান। শেষ পর্যন্ত ২০১১ সালের আগস্টে জবস সরে দাঁড়িয়ে পুরোপুরি দায়িত্ব তুলে দেন কুকের কাঁধে।
এই লেখার শুরু থেকেই বারবার যেভাবে স্টিভ জবসের নাম আসছে, একইভাবে টিম কুকের সিইওর দায়িত্ব সামলানো ১৫ বছরের একটি বড় অংশজুড়ে বারবারই শুনতে হয়েছে, তিনি জবসের মতো আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব নয়, যুগান্তকারী উদ্ভাবন তুলে ধরার সক্ষমতার অভাব রয়েছে ইত্যাদি। তার দায়িত্ব গ্রহণের শুরুর দিকে অ্যাপল যখন নতুন কোনো পণ্যই বাজারে আনছিল না, তখন প্রশ্ন উঠতে থাকে—জবসের মতো কুক ক্যারিশমাটিক নেতৃত্ব দিয়ে অ্যাপলের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারবেন তো?
সেই একই ব্যক্তিকে নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, প্রথম মেয়াদে প্রেসিডেন্ট থাকাকালে একটি অজ্ঞাত সমস্যায় সহায়তার জন্য অ্যাপলের প্রধান (টিম কুক) তাকে ফোন করেছিলেন এবং এতে তিনি ‘নিজের ওপর খুবই গর্বিত’।
ট্রাম্প লেখেন, ‘টিম কুকের ক্যারিয়ার অসাধারণ। প্রায় তুলনাহীন। তিনি অ্যাপল ও ভবিষ্যতে যেকোনো কাজে আরও চমৎকার অবদান রেখে যাবেন। সহজভাবে বললে, টিম কুক একজন অবিশ্বাস্য মানুষ!!!’
‘অবিশ্বাস্য’ তো বটেই। অ্যাপলের সঙ্গে সম্পর্কিত সংখ্যাগুলোও সেই সাক্ষ্যই দিচ্ছে। কুকের সময়কালে অ্যাপলের বিক্রি, মুনাফা ও প্রতিষ্ঠানের দাম বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে।
২০১১ সালে কুক যখন দায়িত্ব নেন, তখন অ্যাপলের বিক্রি ছিল ১০৮ বিলিয়ন ডলারের কিছু বেশি। এর প্রায় অর্ধেকই আসে আইফোন থেকে। কুকের নেতৃত্বে অ্যাপল আয়ের দুটি নতুন খাত তৈরি করে—সার্ভিসেস ও ওয়্যারেবলস। এরপর ২০১২ সালে প্রতিষ্ঠানটির বিক্রি দেড়শ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়। এরপর প্রায় প্রতি বছরই ক্রমান্বয়ে বাড়তে বাড়তে ২০২৫ সালে অ্যাপলের মোট বিক্রি ছাড়িয়েছে ৪১৬ বিলিয়ন ডলার।
বিক্রির সঙ্গে সঙ্গে যথারীতি বেড়েছে মুনাফা। ২০১১ সালে যেখানে অ্যাপলের মুনাফা হয়েছিল প্রায় ২৬ বিলিয়ন ডলার, সেখানে ২০২৫ সালে এই অংকটি ঠেকেছে ১১২ বিলিয়ন ডলারে।
অর্থাৎ, কুক তার সময়কালে অ্যাপলের মুনাফা চারগুণেরও বেশি বাড়িয়েছেন। অ্যাপল টিভি ও অ্যাপল পে-সহ বিভিন্ন সার্ভিস এই মুনাফা বৃদ্ধিতে বড় অবদান রেখেছে।
সবমিলিয়ে অ্যাপল ইনকরপোরেটেডে টিম কুকের অবদান বিশাল—অ্যাপলের বাজারমূল্য বাড়িয়েছেন, আর্থিক সাফল্য এনে দিয়েছেন, সেবা খাত বাড়িয়েছেন, অ্যাপল ওয়াচ ও এয়ারপডসের মতো নতুন পণ্য এনে বাজার মাত করেছেন, ম্যাক কম্পিউটারে ইন্টেল প্রসেসর ছেড়ে অ্যাপলের নিজস্ব চিপ ব্যবহার শুরু করেছেন এবং সবকিছুর পাশাপাশি পরিবেশ ও সামাজিক দায়বদ্ধতাতেও পিছিয়ে থাকেননি।
নির্দ্বিধায় টিম কুকের এই ১৫ বছরের নেতৃত্বকে সফল বলা যায়। আগামী ১ সেপ্টেম্বর তিনি এই ভার ছাড়তে যাচ্ছেন, যোগ দেবেন অ্যাপলের এক্সিকিউটিভ চেয়ারম্যান হিসেবে। তার জায়গায় সিইও পদ সামলাবেন প্রায় ২৫ বছর ধরে অ্যাপলে কর্মরত জন টার্নাস।
অ্যাপলের যাত্রায় স্টিভ জবসের মতো ব্যক্তিত্বকে ছাপিয়ে উঠে নিঃসন্দেহে জন টার্নাসের জন্য দায়িত্ব কঠিন করে দিয়ে গেলেন টিক কুক। সফল হতে হলে টার্নাসকে টপকাতে হবে কুকের সব গ্রাফ।

