কাগজে-কলমে শ্রীমঙ্গল বিসিক শিল্পনগরী, বাস্তবে জঙ্গল

কাগজে-কলমে এটি একটি পূর্ণাঙ্গ শিল্পনগরী। পাকা রাস্তা, প্রশাসনিক ভবন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ—সবই আছে এখানে। তবে বাস্তবে চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। 

মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে ২০ একর জায়গাজুড়ে গড়ে ওঠা এই বিসিক (বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন) এস্টেট আজ জঙ্গলে পরিণত হয়েছে। এখানে প্রতিনিয়ত চুরি হচ্ছে বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার ও গ্যাসের পাইপ। দিনে-দুপুরেও সেখানে একা চলাচল করা নিরাপদ মনে করছেন না স্থানীয়রা।

নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার সাত বছর পেরিয়ে গেলেও ১২২টি প্লটের এই শিল্প এলাকায় এখন পর্যন্ত চালু হয়েছে মাত্র একটি কারখানা। সিলেট অঞ্চলের চা-সমৃদ্ধ অর্থনীতিতে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পকে চাঙ্গা করতে নেওয়া প্রায় ৫০ কোটি টাকার এই প্রকল্প এখন মূলত সাপ, ব্যাঙ আর লতাগুল্মের অভয়ারণ্য।

সরেজমিনে দেখা যায়, শিল্পনগরীর অধিকাংশ প্লটই ঝোপঝাড়ে ঢাকা পড়েছে। পিচঢালা সড়কের দুই পাশ দিয়ে গজিয়ে উঠেছে ঘাস ও ছোট-বড় গাছপালা। দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকায় দ্বিতীয় প্রবেশদ্বারটি গাছপালায় এমনভাবে ঢেকে গেছে যে, সেখানে কোনো পথ ছিল কি না তা বোঝার উপায় নেই।

খুঁটি থেকে সাতটি বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার এবং গ্যাস সাবস্টেশনের গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম চুরি হয়ে যাওয়ায় পুরো এলাকা এখন বিদ্যুৎ ও গ্যাসবিহীন। ভবনগুলোর ভেতরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে খুলে নেওয়া যন্ত্রাংশ, আর বিদ্যুতের মিটারগুলো ঢাকা পড়েছে লতাগুল্মে। মানুষের আনাগোনা না থাকায় জায়গাটি এখন সাপ, শেয়াল ও বনবিড়ালসহ বন্য প্রাণীর নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে।

শ্রীমঙ্গল বিসিক শিল্পনগরীর কর্মকর্তা মোহাম্মদ মুনায়েম ওয়ায়েছ বলেন, ২০১২ সালে প্রকল্পটি পরিকল্পনা করা হয় এবং ২০১৬ সালে এর নির্মাণকাজ শুরু হয়। ২০১৯ সালের মধ্যে এর অবকাঠামো—প্রশাসনিক ভবন, আবাসিক কোয়ার্টার, পাম্প হাউস, গ্যাস সাবস্টেশন, পুকুর ও অভ্যন্তরীণ পাকা রাস্তা প্রস্তুত হয়ে যায়।

চা-শিল্পপ্রধান এই উপজেলার স্থানীয় উদ্যোক্তাদের প্ল্যাটফর্ম দিতে তিনটি ক্যাটাগরিতে ১২২টি প্লটের এই এস্টেট ডিজাইন করা হয়। যার প্রতিটির মূল্য ৯৯ বছরের ইজারায় প্রতি বর্গফুট নির্ধারণ করা হয়েছিল ৭৯৯ টাকা ৫১ পয়সা।

তবে বিসিকের সেই উদ্দেশ্য সফল হয়নি। কারণ প্লটের দাম আশেপাশের বাজারদরের চেয়ে অনেক বেশি নির্ধারণ করা হয়েছিল এবং এর প্রচারও ছিল নগণ্য। ফলে কাজ শেষ হওয়ার পর সাত বছর ধরে অবহেলায় পড়ে থাকে এস্টেটটি।

সংশ্লিষ্টরা জানান, কেবল ২০২৩-২৪ অর্থবছরের শেষের দিকে ১২২টি প্লটের মধ্যে ৫৬টি বরাদ্দ দেওয়া হয়, যার প্রায় পুরোটাই পেয়েছেন জেলার বাইরের উদ্যোক্তারা। তবে এই বরাদ্দের পর আর কোনো দৃশ্যমান কার্যক্রম দেখা যায়নি।

বিসিক কর্মকর্তা মুনায়েম ওয়ায়েছ আরও জানান, বর্তমানে প্রতি ডেসিমেল প্লটের দাম ৩ লাখ ৪৮ হাজার টাকা। এই ২০ একরের বিশাল সরকারি অবকাঠামো পাহারা দেওয়ার জন্য নিয়োজিত আছেন মাত্র একজন নৈশপ্রহরী।

নৈশপ্রহরী বিশ্বজিৎ সরকার তার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেন, পুরো জায়গাটা জঙ্গল হয়ে গেছে। এত বড় এলাকা একজনের পক্ষে পাহারা দেওয়া অসম্ভব। ট্রান্সফরমার চুরির পর থেকে কোনো বিদ্যুৎ নেই। রাতে একাধিকবার ডাকাতদের মুখোমুখি হতে হয়েছে।

চুরির ফলে প্রায় ২ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে জানিয়ে কর্মকর্তা মুনায়েম ওয়ায়েছ বলেন, ইতোমধ্যে সাতটি ট্রান্সফরমার এবং বেশ কিছু গ্যাস লাইনের যন্ত্রাংশ চুরি হয়েছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। আমরা আশা করছি, দ্রুতই প্রয়োজনীয় অবকাঠামো পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে।

এদিকে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিনিয়োগকারীরা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে আসাদ এগ্রো ফুডের এক ব্যবস্থাপক বলেন, কোম্পানিকে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, যার কোনোটিই বাস্তবায়ন করা হয়নি। বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করে আমরা এখন ফাঁদে পড়ে গেছি। এখান থেকে চলেও যেতে পারছি না, আবার পুরোপুরি কার্যক্রমও শুরু করতে পারছি না। আমরা সীমিত পরিসরে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছি। তাদের প্রতিশ্রুতি শুধু কাগজে কলমে।

অনেকে আবার বিসিকের ওপর আস্থা হারিয়ে চলেও গেছেন। উদ্যোক্তা মিফতাউল ইসলাম একটি প্লট কিনেছিলেন, কিন্তু কোনো সুযোগ-সুবিধা না পেয়ে তা ফেরত দেন। 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক বিনিয়োগকারী জানান, দীর্ঘ সময় নিষ্ক্রিয় থাকার পর বরাদ্দকৃত দুটি প্লট ফেরত দিলেও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে এখন পর্যন্ত তার টাকা ফেরত পাননি।

স্থানীয় ব্যবসায়ী পুলক সূত্রধর বলেন, বিসিকে জমির দাম অনেক বেশি। তাই আমি বিসিক এস্টেটের বাইরে কম দামে জমি কিনে কারখানা স্থাপন করেছি।

বিসিকের মৌলভীবাজার এলাকার আরেক কারখানা মালিক, যিনি শ্রীমঙ্গলে ব্যবসা সম্প্রসারণের কথা ভেবেছিলেন, তিনিও দুর্বল নিরাপত্তা ও অতিরিক্ত দামের কারণে সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছেন। 

মৌলভীবাজারের তরুণ বিনিয়োগকারী শফিকুল ইসলাম বলেন, জমির দাম প্রচলিত বাজারদরের চেয়ে দুই থেকে তিন গুণ বেশি হওয়ায় উদ্যোক্তারা আগ্রহ হারাচ্ছেন।

শ্রীমঙ্গল ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক কামাল মিয়া বলেন, শ্রীমঙ্গল বিসিক শিল্পনগরীকে সচল করতে হলে প্রথমেই প্লটের মূল্য বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। পাশাপাশি চুরি হওয়া ট্রান্সফরমার ও গ্যাস সরঞ্জাম দ্রুত প্রতিস্থাপন করে বিদ্যুৎ-গ্যাস সংযোগ ফিরিয়ে আনা জরুরি। নিরাপত্তার স্বার্থে পর্যাপ্ত নিরাপত্তারক্ষী নিয়োগ করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, ইতোমধ্যে বরাদ্দ পাওয়া অথচ নিষ্ক্রিয় প্লটগুলো চিহ্নিত করে প্রকৃত উদ্যোক্তাদের পুনর্বণ্টন করা উচিত। দ্রুত সমন্বিত পদক্ষেপ না নিলে সরকারের বিপুল অঙ্কের এই বিনিয়োগ পুরোপুরি অকেজো হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

Related Articles

Latest Posts