বিশ্বকাপের তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচটিকে অনেকেই টুর্নামেন্টের সবচেয়ে ‘অনাকাঙ্ক্ষিত ম্যাচ’ বলে থাকেন। কোনো খেলোয়াড়ই বিশ্বকাপ খেলতে এসে এই ম্যাচে নামার স্বপ্ন দেখেন না। তবে সেমিফাইনালে হেরে যাওয়া দুই দলের একটিকে অন্তত ব্রোঞ্জ পদক নিয়ে ফিরতে হয়, আর অন্য দলটিকে ফিরতে হয় খালি হাতে।
আগামী রবিবার মিয়ামিতে মুখোমুখি হচ্ছে এমন দুটি দল, যাদের চোখ ছিল মূল ট্রফির ওপর। টুর্নামেন্ট শুরুর আগে ফ্রান্স ছিল হট ফেভারিট, অন্যদিকে ইংল্যান্ডের স্কোয়াডের গভীরতা আর মান দেখে মনে হচ্ছিল—এবার হয়তো তাদের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটবে।
ফাইনালে ওঠার গৌরব হয়তো এই ম্যাচে নেই, তবে একজনের জন্য এখনো অনেক কিছু পাওয়ার বাকি আছে। তিনি কিলিয়ান এমবাপে।
টুর্নামেন্টের শুরুর দিকে ফ্রান্সের এই অধিনায়ক জোর দিয়ে বলেছিলেন, ‘গোল্ডেন বুটের চেয়ে বিশ্বকাপ ট্রফিটাই আমার বেশি চাই।’ মূল ট্রফিটা হাতছাড়া হয়ে গেলেও গোল্ডেন বুট জেতার সুযোগ কিন্তু এখনো তার সামনে রয়েছে।
চলতি আসরে ৭ ম্যাচে ৮ গোল নিয়ে আর্জেন্টিনার অধিনায়ক লিওনেল মেসির সঙ্গে যৌথভাবে শীর্ষ গোলদাতার তালিকায় আছেন এমবাপে। তবে অ্যাসিস্টের দিক থেকে মেসি কিছুটা এগিয়ে আছেন (মেসির ৪টি, এমবাপের ৩টি)। সোমবার নিউ ইয়র্ক-নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে স্পেনের বিরুদ্ধে ফাইনালে মেসি তার এই সংখ্যা আরও বাড়িয়ে নেওয়ার সুযোগ পাবেন।
রবিবারের ম্যাচে আর একটি গোল করলেই এমবাপে অনন্য এক মাইলফলকের কাছাকাছি পৌঁছে যাবেন। বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত তাঁর গোলসংখ্যা ২০টি, যা মেসির সর্বকালের সর্বোচ্চ ২১ গোলের রেকর্ড থেকে মাত্র ১ গোল দূরে।
তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে দলের ওপর বাড়তি কোনো চাপ থাকে না। তাই ফ্রান্সের এই হতাশাজনক বিদায়ের মাঝেও এমবাপের সামনে সুযোগ থাকছে নিজের বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারে আরও একটি স্মরণীয় অধ্যায় যোগ করার।
ইতিমধ্যেই বিশ্ব ফুটবলের কিংবদন্তিদের কাতারে নাম লিখিয়েছেন ২৭ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড। তিনিই একমাত্র খেলোয়াড়, যিনি দুটি ভিন্ন বিশ্বকাপে অন্তত ৮টি করে গোল করেছেন। চার বছর আগে কাতারে এই ৮ গোল করেই তিনি মেসিকে পেছনে ফেলে নিজের প্রথম গোল্ডেন বুট জিতেছিলেন।
তবে সেই রাতের কোনো আনন্দের ছবি ভক্তদের মনে দাগ কাটেনি; সবার মনে গেঁথে আছে ফাইনালের সেই হৃদয়ভাঙা হারের পর গোল্ডেন বুট হাতে ট্রফির পাশ দিয়ে এমবাপের বিষণ্ণ মনে হেঁটে যাওয়ার দৃশ্যটি।
সেই ছবিটাই বুঝিয়ে দিয়েছিল তার কাছে কোনটির গুরুত্ব বেশি ছিল। আসল ট্রফিটাই যখন হাতছাড়া হয়ে যায়, তখন ব্যক্তিগত অর্জন তার কাছে অর্থহীন মনে হয়েছিল।
সেবার এমবাপে ও মেসি—দুজনেই নেমেছিলেন বিশ্বজয়ের স্বপ্ন নিয়ে। মেসির স্বপ্ন পূরণ হয়েছিল, আর এমবাপেকে পুড়তে হয়েছিল আফসোসে।
এবার প্রেক্ষাপট পুরোপুরি ভিন্ন। ফ্রান্সের শিরোপা জয়ের আশা শেষ, ট্রফি ধরে রাখার সেই চাপও আর নেই। এখন এমবাপে সম্পূর্ণ মনোযোগ দিতে পারেন নিজের ব্যক্তিগত অর্জনে—মেসিকে ছাড়িয়ে গোল্ডেন বুট নিজের করে নেওয়া এবং সম্ভবত বিশ্বকাপের সর্বকালের সেরা গোলদাতার তালিকায় শীর্ষস্থানে বসা। এর সঙ্গে ফ্রান্সকে তৃতীয় স্থান এনে দেওয়ার সুযোগ তো থাকছেই।
রবিবারের ম্যাচটি হতে যাচ্ছে ফ্রান্সের কোচ হিসেবে দিদিয়ের দেশমের শেষ ম্যাচ। মর্যাদার লড়াই ছাড়া এই ম্যাচে তেমন কিছু হারানোর নেই বলে ফ্রান্স ও ইংল্যান্ড—দুই দলই তাদের মূল একাদশে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
তারপরও, দেশম হয়তো এমবাপেকে শুরু থেকেই মাঠে নামাতে চাইবেন, যাতে তার অধিনায়ক আরও একটি গোল্ডেন বুট জয়ের লড়াইতে শেষ চেষ্টাটুকু করতে পারেন।

