হঠাৎ করেই যেন আবার বিশ্ব বড় বড় দেশগুলোর পক্ষ থেকে মহাকাশ অভিযানের হিড়িক পড়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর শীতল যুদ্ধ চলাকালে সোভিয়েত ইউনিয়ন-যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টাপাল্টি মহাকাশ অভিযানের সময়টাকেই যেন মনে করিয়ে দিচ্ছে সাম্প্রতিক সময়ের মহাকাশ অভিযানগুলো।
সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সফল আর্টেমিস অভিযানের পর এবার শুরু হয়েছে চীনের শেনঝৌ-২৩ অভিযান। তবে এই অভিযানেই চাঁদে নামবেন না তিন নভোচারী।
তারা পুরো এক বছর কক্ষপথে থেকে নানা গবেষণায় নিয়োজিত থাকবেন।
তাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ২০৩০ সাল নাগাদ চাঁদে মানুষ পাঠানোর স্বপ্ন দেখছে বেইজিং।
আজ রোববার এসব তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি।
আজ চীনের স্থানীয় সময় রাত ১১টা বেজে ৮ মিনিটে (বাংলাদেশ সময় রাত ৯টা ৮ মিনিট) দেশটির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের গোবি মরুভূমিতে অবস্থিত জিউকুয়ান লঞ্চ সেন্টার থেকে একটি লং মার্চ টু-এফ রকেট মহাকাশের দিকে উড়ে গেছে। রকেটে ছিলেন তিন নভোচারী।
তারা তিয়ানগং মহাকাশ স্টেশনে অবতরণ করবেন।
এবারই কোনো মহাকাশ অভিযানে প্রথমবারের মতো হংকং থেকে কোনো নভোচারী অংশ নিতে যাচ্ছেন।
হংকং পুলিশের সাবেক কর্মকর্তা লি জিয়াকিং (ক্যান্টনিজ ভাষায় লাই কা-ইং)-এর বয়স ৪৩। এবারের অভিযানে তার সঙ্গী হচ্ছেন ৩৯ বছর বয়সী মহাকাশ প্রকৌশলী ঝু ইয়াংঝু ও ৩৯ বছর বয়সী বিমানবাহিনীর সাবেক বৈমানিক ঝাং ঝিইউয়ান।
ঝু ও ঝাং দুইজনই চীনের নাগরিক।
তিন নভোচারী বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও প্রকল্পে অংশ নেবেন।
একজন ক্রু পুরো এক বছর কক্ষপথে থাকবেন। মানবদেহে দীর্ঘ সময় মাইক্রোগ্র্যাভিটিতে থাকার প্রভাব সংক্রান্ত গবেষণার অংশ হবেন তিনি।
তবে তিন জনের মধ্যে কে হবেন সেই ব্যক্তি, তা জানানো হয়নি।
ভবিষ্যৎ চন্দ্রাভিযান ও মঙ্গল গ্রহে মানুষ পাঠানোর বৃহত্তর উদ্যোগের অংশ হিসেবে এই পরীক্ষার আয়োজন করেছে চীন।
অস্ট্রেলিয়ার মাক্যুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রিচার্ড ডে গ্রিস জানান, এই পরীক্ষার মাধ্যমে পেশী ক্ষয়, হাড়ের ঘনত্ব কমে যাওয়া, বিকিরণ সহনশীলতা, ঘুম, আচার-ব্যবহার ও মানসিক অবস্থার ওপর দীর্ঘ সময় মহাকাশে থাকার প্রভাবসহ অন্যান্য সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে জানা যাবে।
তিনি আরও জানান, পৃথিবী থেকে যোজন যোজন দূরত্বে থেকে পানি, বিশুদ্ধ বাতাস ও চিকিৎসার মতো বিষয়গুলো ব্যবস্থাপনা করা যায় কী না, সেটাও এই পরীক্ষায় জানা যাবে।
ডে গ্রিস এএফপিকে বলেন, চীন ধারাবাহিকভাবে দীর্ঘ সময় ধরে মহাকাশে অবস্থানের সক্ষমতা তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছে।
ভবিষ্যতে চাঁদ ও অন্যান্য গ্রহে দীর্ঘ সময়ের অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে এই অভিজ্ঞতা খুবই প্রয়োজন।
তিয়ানজং মহাকাশ স্টেশনের বেশিরভাগ ক্রু অন্তত ছয় মাস মহাকাশে কাটিয়ে তারপর পৃথিবীতে ফিরেছেন। এভাবেই মূল্যবান অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করছে চীন।
২০৩০ সালের মধ্যে চাঁদে মানুষ পাঠানোর লক্ষ্য হাতে নিয়েছে চীন। ওই লক্ষ্যের অংশ হিসেবে শেনঝৌ-২৩ অভিযান আজ শুরু হতে যাচ্ছে।
এই ‘চন্দ্র দৌড়ে’ চীনের বড় প্রতিদ্বন্দ্বী যুক্তরাষ্ট্র।
চন্দ্র জয়ের লক্ষ্য পূরণে যেসব উপকরণ ও সরঞ্জাম প্রয়োজন, সেগুলো পরীক্ষা নিরীক্ষা চালাচ্ছে চীন।
এ বছরই নতুন মেংঝৌ মহাকাশযানের পরীক্ষামূলক অভিযান শুরু হবে।
পুরনো শেনঝৌ মহাকাশযানগুলোকে অবসরে পাঠাবে মেংঝৌ। মেংঝৌতে চেপেই চীনের নভোচারীরা চাঁদে অবতরণ করবেন বলে আশা করছে বেইজিং।
২০৩৫ সাল নাগাদ মহাকাশে একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণা কেন্দ্র নির্মাণ করবে চীন। এর নাম হবে আন্তর্জাতিক চন্দ্র গবেষণা স্টেশন (আইএলআরএস)।
চীনের অভিযানে প্রথম বিদেশী নভোচারী হিসেবে এক পাকিস্তানি নাগরিক এ বছরের শেষ নাগাদ তিয়ানগং স্টেশনে অবতরণ করবেন বলে জানা গেছে।
গত ৩০ বছরে মহাকাশ খাতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে চীন। নীরবে দেশটি যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও ইউরোপের দেশগুলোর কাছাকাছি সক্ষমতা অর্জন করেছে।
২০১৯ সালে প্রথমবারের মতো চাঁদের বিপরীত পৃষ্ঠে একটি মহাকাশযান অবতরণ করার সাফল্য অর্জন করে চীন।
২০২১ সালে মঙ্গল গ্রহে রোভার পাঠায় দেশটি।
২০১১ সালে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে (আইএসএস) চীনকে ব্রাত্য ঘোষণা করা হয়। সে সময় যুক্তরাষ্ট্র দেশটির মহাকাশ গবেষণা প্রতিষ্ঠান নাসাকে বেইজিং এর সঙ্গে কাজ না করার নির্দেশ দেয়।
এর পরই চীন তাদের নিজস্ব মহাকাশকেন্দ্র চালুর প্রকল্প হাতে নেয়।

